Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যুতে উত্তাপ

সংকট নিরসনে সবার নজর সর্বদলীয় কমিটিতে

Advertisement

Icon

মনির হোসেন

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সংকট নিরসনে সবার নজর সর্বদলীয় কমিটিতে

Advertisement

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ইস্যুতে উত্তপ্ত সংসদ। সনদের বিষয়গুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সরকারি দল বিএনপি এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি কার্যত এখন মুখোমুখি। মোটা দাগে দুটি শব্দ নিয়ে বিতর্ক চলছে। সরকারি দল বলছে, বিশেষ কমিটি গঠন করে সংবিধান সংশোধন করা হবে। বিরোধী দল বলছে, ‘সংশোধন’ নয়, সংবিধান ‘সংস্কার’ করতে হবে। এ নিয়ে বুধবার সংসদে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। এছাড়াও সরকারি দল রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন করতে চায়। বিরোধীরা বলছে, গণভোটে যেভাবে ‘সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ পাশ হয়েছে, সেভাবেই হুবহু কার্যকর করতে হবে। এ অবস্থায় কার্যত প্রশ্ন উঠেছে-এ সংকটের সমাধান এখন কোন পথে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিকরা যুগান্তরের কাছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। 

এদিকে সৃষ্ট সংকট নিরসনে সংবিধান সংশোধনে সরকারি দলের পক্ষ থেকে রোববারের মধ্যে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হতে পারে। যেখানে উভয় দলের আইন বিষয়ে জানাশোনা সংসদ সদস্যদের সদস্য করা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কমিটির আলোচনার মধ্য দিয়ে বিষয়টির একটি রাজনৈতিক সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলকে ছাড় দিতে হবে। তবে শেষ পর্যন্ত সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যুতে সংসদের উত্তাপ কীভাবে সমাধানের পথে এগোবে, সেটি এখন দেখার বিষয়। 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বিদ্যমান সংকট সমাধানে গণভোটের মাধ্যমে মানুষ যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আইনুল ইসলাম মনে করেন, বর্তমান সমস্যাটি রাজনৈতিক। সংসদের বাইরে এটি রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, যে সমস্যাটির কথা বলা হচ্ছে, তা শুধু দুটি শব্দ নিয়ে। এক পক্ষ বলছে সংশোধন; কিন্তু অপর পক্ষ বলছে সংস্কার। এটি অহেতুক বিতর্ক। অপরদিকে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের মতে, সরকারি দল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি। ফলে এটি ওইদিনই বাতিল হয়ে গেছে।

প্রসঙ্গত, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ১৩ নভেম্বর আদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। ওই আদেশের ওপর ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। আদেশে বলা হয়, সংসদ অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এক্ষেত্রে নির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হবেন। সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই অধিবেশন ডাকা হয়নি। ফলে সংসদের বাইরেও রাজপথে কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে বিরোধী দল। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ। এর মধ্যে গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন। ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন। অর্থাৎ ৬৮ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোটে আদেশটি অনুমোদিত হয়। তবে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে অধিবেশন আহ্বান না করা হলে কী হবে, তা আদেশে বলা নেই। 

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, জুলাই সনদ ইস্যুতে সংকট তৈরি হয়েছে। এ সংকট সমাধানে মানুষ যে রায় দিয়েছে, তা মেনে নিতে হবে। জনগণ তার সার্বভৌম ক্ষমতা ব্যবহার করে রায় দিয়েছে। এটাই শেষ কথা হওয়া উচিত। এ রায় কোনো অংশে সংবিধানের চেয়ে কম নয়, বরং বেশি। তিনি বলেন, সংবিধান হলো জনগণের পরোক্ষ সম্মতি। অর্থাৎ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন হয়। কিন্তু গণভোট জনগণের সরাসরি অনুমোদন বা সম্মতি। ফলে এই অনুমোদনই হলো শেষ কথা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে নানা ধরনের কথা হচ্ছে। কিন্তু জুলাই সনদ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সেটি জুলাই আদেশেই বলা আছে। এই আদেশটিও জনগণ অনুমোদন দিয়েছে। অর্থাৎ জনগণ জুলাই সনদ ও আদেশ-দুটিই অনুমোদন দিয়েছে। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারও জনগণের সম্মতির সরকার। সেই সরকারই আদেশ জারি করেছে। গণভোটের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হলে এর পরিণতির ব্যাপারে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জনরায় বাস্তবায়ন না করার মানে হলো জনগণের সম্মতি উপেক্ষা করা। অর্থাৎ জুলাই আন্দোলনে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হলো না। ভবিষ্যতে এটি জনগণ কীভাবে নেবে, সেটি দেখার বিষয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, গণভোট হয়েছে। জনগণ রায় দিয়েছে। সে রায় বাস্তবায়ন হবে। রায় বাস্তবায়ন হবে না, সেটি কেউ বলেনি। কিন্তু যে সমস্যাটির কথা বলা হচ্ছে, তা শুধু দুটি শব্দ নিয়ে। এক পক্ষ বলছে সংশোধন; কিন্তু অপর পক্ষ বলছে সংস্কার। এটি নিয়ে বিরোধ চলছে। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে অহেতুক রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি করা হচ্ছে। তবে সংসদেই এর সমাধান হতে হবে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আইনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান সমস্যাটি রাজনৈতিক। এটি রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। এক্ষেত্রে সংসদের বাইরে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করতে হবে। তিনি বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে যখন আলোচনা হয়, তখনই সমস্যা তৈরি হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সমাধান করতে চেয়েছিল। কিন্তু সমাধান হয়নি। দলগুলো রাজনৈতিকভাবে কৌশল নিয়েছিল। নির্বাচনের পর আবার সমস্যা তৈরি হয়। তিনি বলেন, বর্তমানে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের বক্তব্যের যুক্তি রয়েছে। সংসদে তারা সেভাবে বক্তব্য দিচ্ছেন। বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসাবে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় যে জুলাই সনদ সই হয়েছে, তার সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের পার্থক্য আছে। সরকারি দল বিএনপি স্পষ্ট করে বলছে, দক্ষিণ প্লাজায় যে দলিল সই হয়েছে, সেটি আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই। আবার বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি বলছে, গণভোটে যা পাশ হয়েছে, সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে। ফলে এ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া বিকল্প পথ নেই। 

অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি আইনের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে। এটি নিয়ে রাজনীতি করা যাবে। হচ্ছেও তাই। ইতোমধ্যে সংসদে বিরোধী দল ওয়াকআউট করেছে। আবার সরকারি দল সংবিধান সংশোধনে আলাপ-আলোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করার কথা বলেছে। তিনি বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের একটি চাপ আছে। কিন্তু এর আর আইনি বৈধতা নেই। কারণ, সরকারি দল সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি। ফলে এটি ওইদিনই বাতিল হয়ে গেছে। তিনি বলেন, বিএনপি থেকে বলা হচ্ছে, সংবিধান সংশোধনের জন্য যা করণীয়, তা করা হবে। অন্য সংস্কারগুলোও তারা করবে। তবে এজন্য একটু সময় দিতে হবে। 

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে আরোপিত আদেশ একদিনে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ সময়ে তিনি ১৩ নভেম্বর জারি করা জুলাই সনদের বাস্তবায়ন আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। 

সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে তিনি বলেন, অস্তিত্বহীন একটি পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেওয়ার কোনো আইনি বিধান নেই। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই শপথের ফর্ম সংসদে পাঠানোর এখতিয়ার রাখেন না। তিনি সংবিধান সংরক্ষণের শপথ নিয়ে নিজেই তা ভঙ্গ করেছেন। বিএনপির দলীয় অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, সারা দেশে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে যে, বিএনপি সংস্কার চায় না। কিন্তু আমরা ঐতিহাসিকভাবে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও বাক্য ধারণ করি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতেই ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ যুগান্তরকে বলেন, কেউ কেউ বলছেন ৩০ দিনের মধ্যে সংসদে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকায় এই পরিষদ অবৈধ হয়েছে। কিন্তু তা ঠিক নয়। কারণ ৩০ দিন শেষ হওয়ার আগেই বিষয়টি বিরোধী দল সংসদে উত্থাপন করেছে, যা নিয়ে মঙ্গলবার থেকে সংসদ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, সরকারি দল বলছে, তারা জুলাই সনদ অনুসারে সংবিধান সংশোধন করবে। কিন্তু এটি সম্ভব নয়। কারণ, সংসদ সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে না। মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করতে হলে অবশ্যই গণভোট প্রয়োজন। জনগণ গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সেই রায় দিয়েছে। ফলে গণরায় বাস্তবায়নের বাইরে অন্য কোনো সমাধান নেই। 

সংবিধান সংশোধনে কমিটি : সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বুধবার সংসদে বলেন, সংবিধান সংশোধনে অচিরেই একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটিতে আনুপাতিক হারে সব দলের প্রতিনিধি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বতন্ত্র সদস্যদের মধ্য থেকেও সদস্য রাখা হবে। রোববারের মধ্যে এই কমিটি হতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে যারা আইন বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, তাদের রাখা হবে। অন্যান্য দল থেকে আইন বিশেষজ্ঞ না পাওয়া গেলেও প্রতিনিধি রাখা হবে। সবমিলিয়ে ১৫ থেকে ২০ সদস্যের কমিটি করা হতে পারে। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনকে এমন পর্যায়ে নেওয়া হবে, যাতে বারবার কাঁচি চালাতে না হয়। সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি করলে বিরোধী দল থাকবে না-এমন বক্তব্য প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, তাদের এ অবস্থান সঠিক হবে না। আজ বা কাল হোক সংবিধান সংশোধন করতেই হবে।

এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোটের অধ্যাদেশ এবং নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেওয়ার বৈধতা নিয়ে ৩ মার্চ রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এবং গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সংসদ সচিবালয় থেকে নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নিতে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে, তা কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না। একই সঙ্গে গণভোট অধ্যাদেশ কেন বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। আইন সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জাতীয় সংসদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব, নির্বাচন কমিশন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে চার সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী গাজী মো. মাহবুব আলম ও চৌধুরী মো. রেদওয়ান ই খোদা এই রিট দায়ের করেন।


Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম