Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

পাহাড়ি ঢল নয়, এবার জলাবদ্ধতা

হাওড়ে কৃষকের কান্না

ফসল বাঁচাতে নিজেদের বাঁধই কাটছেন কৃষক * ইতোমধ্যে ২৬টি ফসল রক্ষা বাঁধ কেটে ফেলা হয়েছে-পানি উন্নয়ন বোর্ড * পাওয়ার পাম্প স্থাপন করেও রাতভর পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা

Advertisement

নেসারুল হক খোকন

নেসারুল হক খোকন

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

হাওড়ে কৃষকের কান্না

আকস্মিক বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে হাওড় এলাকার হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি। তাই সেচপাম্প দিয়ে পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে। এদিকে উপায় না দেখে পশু খাদ্যের জন্য কাঁচা ধান কাটছেন হতাশাগ্রস্ত কৃষক। বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে -যুগান্তর

Advertisement

হাওড়ের কৃষকদের চোখে এখন শুধুই জল। ঘামে ফলানো সোনালি ধান চোখের সামনেই পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ি ঢল আসার আগেই সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অতিবৃষ্টি। বৃষ্টির পানি আটকে হাওড়গুলো যেন ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। ১৪০ কোটি টাকায় বানানো বাঁধই এখন কৃষকের গলার কাঁটা।

পানি সরানোর কোনো পথ নেই। দিশেহারা কৃষকই তাই রাতের আঁধারে নিজেদের রক্ষাকবচ বাঁধ কেটে দিচ্ছেন। বুকভরা হাহাকার নিয়ে আধা পাকা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। ইতোমধ্যে কাটা পড়েছে ২৬টি বাঁধ। এখন পাহাড়ি ঢল নামলে সব শেষ হয়ে যাবে। এমন নিষ্ঠুর অনিশ্চয়তার মুখে নির্ঘুম রাত কাটছে হাওড়ের ৯ লাখ অসহায় কৃষকের। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, হাওড়াঞ্চলের ছোট-বড় ৯৫টি হাওড়ে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এ থেকে ১৪ লাখ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। এর বাজারমূল্য প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা।

হাওড়ের কৃষকরা জানিয়েছেন, ধান পাকার এখনই সময়। কিন্তু এ সময়েই আকস্মিক বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর জমি। পানি নিষ্কাশনে পাওয়ার পাম্প স্থাপন করেও কূলকিনারা হচ্ছে না। কোনো উপায়ান্তর না দেখে অনেক হাওড়ে পশুখাদ্যের জন্য কাঁচা ধান কাটতে শুরু করেছেন কৃষক। তারা বলছেন, এভাবে জলাবদ্ধতা অব্যাহত থাকলে এবার হাওড়াঞ্চলে দুর্যোগ দেখা দেবে। পানি সরাতে স্থানীয়রা ফসল রক্ষা বাঁধও কেটে ফেলছে। এতে পাহাড়ি ঢলের পানি ঢুকে ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. কাইছার আলম বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, সিলেটে আমি নতুন। হাওড়ের ফসল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণের ধরন পালটাতে হবে। এখানে আগাম বন্যার পাশাপাশি অতিবৃষ্টির জলাবদ্ধতা আরও বড় সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। বিভিন্ন হাওড় ঘুরে জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। আগামী মৌসুমের আগেই পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রেখে বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থানীয় কৃষক ফসল রক্ষা বাঁধ কেটে ফেলার চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরে ২৯ মার্চ মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। সেখানে তিনি ওই সময় পর্যন্ত বাঁধ না কাটার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কিছু চিত্র তুলে ধরেন। তবে কীভাবে পানি নিষ্কাশন করে ফসল রক্ষা করা যায়, তা নিয়ে কোনো পরামর্শ ছিল না। অথচ প্রতিদিনই বৃষ্টির পানিতে আরও ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে হাওড়গুলোয়।

জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের ইছবপুর গ্রামের পার্শ্ববর্তী জোয়ালভাঙ্গা হাওড়ে জিরানের ভাঙা নামক স্থানে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে। ২৯ মার্চ সকালে সেই বাঁধ স্থানীয় লোকজন কেটে ফেলছে বলে খবর পাওয়া যায়। এ কারণে সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। পরে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী বাঁধটি সরেজমিন পরিদর্শন করেন।

এ সময় দেখা যায়, স্থানীয় ১৫০-২০০ লোক সংঘবদ্ধভাবে কোদাল, শাবল, ঝুড়ি প্রভৃতি সরঞ্জাম নিয়ে বাঁধ কাটছে। তৎক্ষণাৎ তাদের বাধা দেওয়া হয়। কিন্তু নিষেধ উপেক্ষা করেই লোকজন বাঁধ কাটা অব্যাহত রাখে এবং মারমুখী আচরণ শুরু করে। এতে কর্মকর্তারা স্থান ত্যাগে বাধ্য হন। লোকজন বাঁধটি পুরোপুরি কেটে ফেলে। এতে নদীর পানি হাওড়ে ঢুকে প্রায় ১ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমির ধান নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এ অবস্থায় আইন অমান্য করে হাওড়ের ফসল রক্ষা বাঁধ কাটায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি অভিযোগ করা হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসক এ পদক্ষেপ নেওয়ার পর অন্তত আরও ২৫টি বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে স্থানীয় কৃষক।

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, হাওড়ে জমে থাকা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। চতুর্দিকে হাওড়। কোন হাওড়ের পানি কোন হাওড়ে ফেলব, কোনো জায়গা নেই। পরিকল্পিত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না রাখা হলে বৃষ্টির পানি সরানো যাবে না। তারপরও কিছু কিছু হাওড়ে সেচ পাম্প লাগিয়ে পানি সারোনোর একটা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখন কোনো বৃষ্টি যদি না হয়, তাহলেই রক্ষা।

জানা যায়, প্রায় সব হাওড়েই জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। কোথাও কম আবার কোথাও বেশি। ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে তাহিরপুরের নজরখালি হাওড়। এছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে-দিরাই-শাল্লা, তাহিরপুর, মধ্যনগর, ধর্মপাশা জামালগঞ্জ, ছাতক, দোয়ারাবাজার, সুনামগঞ্জ সদর ও জগন্নাথপুরের কিছু এলাকা। এর মধ্যে পাখিমারা হাওড়, দেখার হাওড়, করচার হাওড়, কানলার হাওড়, খাই হাওড়, শাল্লার ছায়ার হাওড়, জামালগঞ্জের হালির হাওড়, পাগনার হাওড়, তাহিরপুরের শনির হাওড়, মাটিয়ান হাওড়সহ অন্তত অর্ধশত হাওড়ে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। দিরাই উপজেলার বৃহৎ হাওড় কালিকোটা, টাংনি, হুরামন্দিরা, বরাম ও চাপতির হাওড়ের জমি পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ২৬টি বাঁধ কেটে ফেলেছেন স্থানীয় কৃষকরা। এর মধ্যে রয়েছে ধর্মপাশার সোনামোড়ল হাওড়ে ১টি, মধ্যনগরের কাইণ্যানী হাওড়ে ১টি, সুনামগঞ্জ সদরে জোয়ালভাঙ্গা হাওড়ে ২টি, জামালগঞ্জের মিনি পাগনার হাওড়ে ১টি, দিরাই উপজেলার চাপটির হাওড়ে ১টি, একই উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওড়ে ১টি, ছাতক উপজেলার চাউলির হাওড়ে ৪টি, শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওড়ে ১টি, একই উপজেলার কাউয়াজুরি হাওড়ে ৩টি, খাই হাওড়ে ১টি, জামখোলা হাওড়ে ১টি, শাল্লার ভান্ডাবিল হাওড়ে ২টি, একই উপজেলার ছায়ার হাওড়ে ৩টি, ভেড়ারডহর হাওড়ে ১টি।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শান্তিগঞ্জে কেটে দেওয়া ৭টি স্থানের মধ্যে ২টি মেরামত করা হয়েছে। দিরাইয়ে কেটে দেওয়া ৩টির মধ্যে ১টি মেরামত করা হয়। শাল্লা উপজেলায় কেটে দেওয়া ৬টি স্থানের মধ্যে ২টি মেরামত করা হয়েছে। তবে ছাতকের ৪টি স্থানের মধ্যে কোনোটিই মেরামত করতে পারেনি।

দিরাই উপজেলার রাধানগর গ্রামের আমিনুল ইসলাম বলেন, কত কষ্ট করে একজন কৃষক জমিতে ধান লাগান। মাসের পর মাস পরিচর্যা করেন। এরপর যদি আকস্মিকভাবে সেই সোনালী ফসল তলিয়ে যায়, তাহলে এই কষ্ট কীভাবে সহ্য করব। এই ফসলই তো আমাদের সারা বছরের সম্বল।

টাঙ্গুয়ার হাওড়পারের রংচি গ্রামের কৃষক মুক্তার আলম বলেন, আমি ক্ষুদ্র কৃষক। আমার ৮ কেয়ার জমির পুরোটাই পানিতে চলে গেছে। এখন কীভাবে চলব, বুঝতে পারছি না।

টগার হাওড়পারের কৃষক মঞ্জিল হক বলেন, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় টগার হাওড়ের অর্ধেকেরও বেশি ফসল তলিয়ে গেছে। আমার ১২ কেয়ার জমি ডুবে গেছে। আমার মতো শত শত কৃষক এখন সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে অপরিকল্পিত বাঁধ বাদ দেওয়া না হলে আমরা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হব।

বরাম হাওড়পারের কৃষক ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি আমির উদ্দিন বলেন, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রতিনিধি এসে দেখে যাক মানুষের কী পরিমাণ আশা-ভরসা এই ফসলকে ঘিরে। চোখে না দেখে বোঝা যাবে না মানুষের চাপা কান্নার অনুভূতি।

দেখার হাওড়ের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, বন্যা বলেন আর জলবদ্ধতা, ক্ষতি দেখতে একইরকম। বন্যায় যেমন পানিতে তলিয়ে যায়, তেমনই জলাবদ্ধতায়ও পানিতেই ভেসে যায় সোনালি ফসল। সরকার ফসল রক্ষায় শত শত কোটি টাকা খরচ করে ঠিকই, তবে পরিকল্পনাহীনভাবে। তাই দুর্যোগে কৃষকের কোনো উপকারে আসে না।

শাল্লা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা শুভজিত রায় বলেন, এ উপজেলায় ২১ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছে। লাগাতার বৃষ্টির কারণে, ছায়ার হাওড়, ভান্ডা, উদগল ও কালিকোটা হাওড়ের বেশির ভাগ জমিতে পানি জমে আছে।

দিরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনোরঞ্জন অধিকারি বলেন, উপজেলার নয়টি হাওড়ে ৩০ হাজার ১৭৮ হেক্টর বোরো জমি রয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে ২৭০ হেক্টর জমি জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে।

সনামগঞ্জ-১ (ধর্মপাশা-জামালগঞ্জ-তাহিরপুর) আসনের সংসদ-সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দে কৃষকের মুখে থাকবে এখন হাসি। সেখানে জলাবদ্ধতার কারণে কান্নার রোল। মানুষের এই কান্না সহ্য করতে না পেরে পাওয়ার পাম্প দিয়ে পানি নিষ্কশনের চেষ্টা করছি।

সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের সংসদ-সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, আমার এলাকার কৃষক প্রতিদিন ফোনে কল করে নতুন নতুন এলাকায় জলবদ্ধতার তথ্য দিচ্ছেন। দেশের মানবিক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অনুরোধ করব ফসল রক্ষায় তিনি যেন যথাযথ ব্যবস্থা নেন।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম