সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় অনুমোদন
৯ কোম্পানির জ্বালানি তেল আসবে কবে
Advertisement
শাহেদ সিদ্দকী
প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতীকী ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর ১১ দিনের মাথায় সরাসরি ক্রয়নীতিতে সরকার নয় কোম্পানির মাধ্যমে জ্বালানি তেল ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের মাধ্যমে ৯ লাখ ৮৫ হাজার টন তেল কেনার ৯টি প্রস্তাব ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন করা হয়। এরপর চলে গেছে ২৬ দিন। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে এক ছটাক তেলও দেশে আসেনি। সেই তেল ক্রয়ের একটি এলসিও খোলা হয়নি। এমনকি সেই এলসি খোলার ন্যূনতম শর্ত-জামানত বা পারফরম্যান্স গ্যারেন্টি দিতে পারেনি ৮টি কোম্পানি। একটি কোম্পানি যেটি দিয়েছে সেটিও অসম্পূর্ণ। ফলে বিশেষ ব্যবস্থায় তেল ক্রয়ের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার তার সুফল পায়নি বাংলাদেশ।
ইরানের ওপর মার্কিন হামলার মধ্য দিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হয়। ধীরে ধীরে এর প্রভাব পড়তে শুরু করে জ্বালানি খাতে। পরিস্থিতি বিবেচনায় যুদ্ধ শুরুর ১১ দিনের মাথায় ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে সরাসরি ক্রয়নীতির আওতা (ডিপিএম) নিয়ে পর্যালোচনা করে সরকার। পর্যালোচনার পর ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে ২ লাখ ২০ হাজার টন পরিশোধিত তেল আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ‘এ অ্যান্ড এ এনার্জি’ নামের প্রতিষ্ঠান থেকে ১ লাখ টন ডিজেল ক্রয়ের সিদ্ধান্ত হয়। বাকি তেল সরবরাহ দেওয়ার কথা ‘পেট্রোগ্যাস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের। পেট্রোগ্যাস দেওয়ার কথা ১ লাখ ২৫ হাজার টনের মধ্যে ১ লাখ টন ডিজেল ও ২৫ হাজার টন অকটেন।
এভাবে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে ৯টি প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় জরুরি ভিত্তিতে ৯ লাখ ৮৫ হাজার টন তেল কেনার ৯টি প্রস্তাব অনুমোদন করে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। প্রতিটি প্রস্তাবে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছিল এই তেল জরুরি ভিত্তিতে দরকার। বিশেষ করে মার্চ-এপ্রিলের সংকট কাটাতে তা নিতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেল আসা তো দূরের কথা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তেল বিক্রির ন্যূনতম শর্ত পূরণ করতে পারেনি কোনো কোম্পানি। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সরবরাহকারীর জন্য প্রথম শর্ত ছিল-তেল আমদানিতে এলসির ৫ শতাংশ জামানত বা পারফরম্যান্স গ্যারান্টি দিতে হবে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৯টি কোম্পানির মধ্যে কেবল পেট্রোগ্যাস নামের কোম্পানি ২৫ হাজার টন অকটেনের জামানত জমা দিয়েছে। আর কোনো কোম্পানির কাছ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। পেট্রোগ্যাস নামের কোম্পানির ওই জামানত বা পিজিও অসম্পূর্ণ। শর্ত অনুযায়ী সেই জামানত দিতে হয় ডলারে।
কিন্তু তারা জমা দিয়েছে টাকায়। যেটি বিপিসি গ্রহণ করেনি। এভাবে শুধুই সময়ক্ষেপণ হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরিধি এবং ভয়াবহতা এখনো বাড়ছে। এ কারণে বাড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম। অন্যদিকে বিপিসির ট্যাংকিতে ডিজেলের মজুতও বাড়ছে না। এ অবস্থায় ওই ৯টি প্রতিষ্ঠানের কাছে জরুরি ভিত্তিতে তেল কেনার প্রস্তাব অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের ঘটনা দেশের জন্য ক্ষতিকর এবং দেশকে বড় ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এর মাধ্যমে এটা স্পষ্ট যে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল সংগ্রহের দক্ষতা অনেক কম এবং দূরদর্শিতা নেই। তিনি বলেন, জ্বালানি সংগ্রহের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ে একটি উইং থাকা দরকার। যারা সরকারকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারবে।
এদিকে গত সোমবার জ্বালানি বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী সব কোম্পানিকে এক চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে, সস্তা তেল সরবরাহ করা যাবে না। কোনোভাবেই বাংলাদেশকে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞায় পড়তে হয়-এমন কোনো দেশের তেল বা কোনো ধরনের বাণিজিক লেনদেন করা যাবে না।
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, ওই ৯ প্রস্তাবের সবকটিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে কম দামে তেল দেওয়া হবে। কেউ কেউ প্রতি ব্যারেল ৭৫ ডলারে পরিশোধিত ডিজেল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বিশ্ববাজারে চলছে ২০০ ডলারের বেশি।
৯ কোম্পানি কারা : ১২ মার্চ অর্থমন্ত্রী অসুস্থ অবস্থায় বাসায় বসে জুমে সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় ডিপিএম অনুমোদন দেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ‘এ অ্যান্ড এ এনার্জি’ এবং ‘পেট্রোগ্যাস’ নামের দুটি কোম্পানি ২ লাখ ২৫ হাজার টনের তেল বিক্রির প্রস্তাব দেয়। এ অ্যান্ডি এ এনার্জি এলএলসি মূলত একটি ট্রেডিং কোম্পানি। তথ্য বলছে, ওই কোম্পানির নিজস্ব কোনো রিফাইনারি নেই। কোনো কোম্পানির সঙ্গে কোনো চুক্তিও নেই তেল সরবরাহ দেওয়ার। এমনকি তেল সরবরাহের কোনো অভিজ্ঞতাও নেই। এ অ্যান্ড এ এনার্জির কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, এই কোম্পানি মাত্র ৭৫ ডলারে পরিশোধিত ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। সেটিই অনুমোদন করেছে সরকার।
অথচ তখন (১২ মার্চ) তেলের বাজার ছিল ১৫০ ডলারের বেশি। যুগান্তরের পক্ষ থেকে এ অ্যান্ড এ এনার্জির স্থানীয় এজেন্ট মোস্তফা কামালকে ফোন করলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। ব্যস্ত আছি বলে ফোন কেটে দেন।
‘পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন’ আন্তর্জাতিকভাবে তেল ক্রয়-বিক্রয়ের প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান সৌদি প্রিন্স আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ। এ কোম্পানির তেল সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও কোন রিফাইনারি থেকে কখন তেল সরবরাহ দেবে তাদের প্রস্তাবে তথ্য ঘাটতি রয়েছে। এই কোম্পানির প্রস্তাব নিয়ে সচিবালয়ে তদবির করেন আনিসুজ্জামান নামে সাবেক এক আমলা। কোম্পানিটি এখন পর্যন্ত ২৫ হাজার টন অকটেনের জামানত জমা দিলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। বাকি ১ লাখ টন ডিজেলের জামানত এখনো দেয়নি। পেট্রোগ্যাস সিঙ্গাপুরের প্ল্যাটসের মূল্য ফর্মূলা এবং জাহাজ ভাড়াসহ অন্যান্য প্রিমিয়ামসহ প্রতি ব্যারেল ধরা হয় মাত্র ৪ দশমিক ৭২ ডলার। অথচ বিশ্ববাজারে চলছে ২০ থেকে ৩০ ডলার।
সুপারস্টার গ্রুপ নামে একটি কোম্পানি ২ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছে। এটি হংকংভিত্তিক একটি ট্রেডিং হাউজ। তবে তেল বেচাকেনার পরিচিত কোনো কোম্পানি নয়। সুপারস্টার ডিসকাউন্ট রেটে তেল দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এদের প্রস্তাব দেখে প্রশ্ন ওঠে, রাশিয়ান ডিসকাউন্ট তেল বা অন্য তেল সরবরাহ দেবে কিনা তা আরও যাচাই করা দরকার। বিপিসির মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানে আগে কখনো তেল সরবরাহ দেওয়ার অভিজ্ঞতা নেই তাদের।
ওমানভিত্তিক মেক্সওয়েল কোম্পানিকে ১ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব অনুমোদন হয়। তারা তেল ক্রয়-বিক্রয় এবং মজুতের ব্যবসা করলেও কী ধরনের কোম্পানির সঙ্গে লেনদেন করেছে বা তাদের শিপিং কোম্পানি ও বড় তেল ক্রেতার সঙ্গে চুক্তির ব্যাপারে তথ্য প্রকাশ করেনি। সংশ্লিষ্টরা জানান, মেক্সওয়েলের কাছে তাদের শিপিং ডকুমেন্ট, তাদের সরবরাহ করা তেলের উৎপাদনকারীর নামসহ বিভিন্ন তথ্য থাকা দরকার ছিল।
এপি এনার্জি নামের কোম্পানিকে ১ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব অনুমোদন হয়। তবে এই কোম্পানির বড় কোনো রিফাইনারি নেই। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী তেল উৎপাদনের প্রমাণ, পণ্যের সহজলভ্যতার নোটিশ, ব্যাংকের কাগজপত্রসহ বিভিন্ন ডকুমেন্ট এখনো জমা দিতে পারেনি। কোম্পানিটি এখনো বিপিসিকে কোনো জামানত জমা দেয়নি। এর বাইরে ডিবিএস নামের কোম্পানি ১ লাখ টন, বিএসপি ৬০ হাজার টন ডিজেল, এক্সন মোবিল কাজাকিস্তান ৭৫ ডলারে ১ লাখ টন পরিশোধিত ডিজেল এবং আবির ট্রেডিং অ্যান্ডি গ্লোবাল নামে কোম্পানিকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল সরবরাহ দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন হয়। এর মধ্যে ডিবিএস এবং আবির ট্রেডিং গ্লোবালের তেল সরবরাহে কতটুকু সক্ষমতা আছে তা খতিয়ে দেখছেন সরকারি কর্মকর্তারা। আবির ট্রেডিং জানিয়েছে, তারা অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করবে। যাতে করে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা যায়।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে ২ মার্চ থেকে সৌদি আরবের ১ লাখ টন অপিরশোধিত তেল বোঝাই করে নরডিক পুলেক্স নামে একটি জাহাজ আটকে আছে। আবিরের তেলও এখনো পাওয়া যায়নি। কখন পাওয়া যাবে তার কোনো তথ্য দেয়নি বিপিসিকে।
বিএসপির ৬০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে প্রশ্ন আছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী জ্বালানি তেলে সালফারের পরিমাণ থাকতে পারে সর্বোচ্চ ৫০ পিপিএম। কিন্তু বিএসপির তেলে থাকবে ২৫০০ হাজারের বেশি। তাই এই দূষিত তেল কী করবে তা নিয়ে চিন্তা করছে বিপিসি। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিএসপি আন্তর্জাতিক এবং বিপিসির নিয়মিত সরবরাহকারী কোম্পানি হিসাবে তালিকাভুক্ত। ফলে তারা হয়তো ওই ৬০ হাজার টন তেল দিতে পারবে।
এক্স মোবিল নামের কোম্পানির ১ লাখ টন তেল (পরিশোধিত ডিজেল) মাত্র ৭৫ ডলারে কীভাবে দেওয়া হবে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারণ বিশ্ববাজারে এখন পরিশোধিত ডিজেলের দাম ২০০ ডলারের অনেক বেশি। সরকারের এক কর্মকর্তা জানান, এত কম দামে কেন প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে তদন্ত দরকার। সরকারি কর্মকর্তাদের সন্দেহ, সরকারকে কোনোভাবে সংকটে ফেলে এলসি করাতে পারলে এবং সেই এলসি ১ মাস আটকে রাখতে পারলে সংশ্লিষ্টদের লাভ। কারণ প্রতিটা এলসির মূল্য ৩০ থেকে ৪০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। এর এক মাসের সুদ অনেক টাকা।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, আগের চুক্তি অনুযায়ী এপ্রিলে ১৭টি জাহাজ আসার কথা। এর মধ্যে ৭টি ডিজেলবাহী জাহাজ এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করেছে। সবকটি জাহাজ তেল নিয়ে দেশে না এলে বিপাকে পড়তে পারে বাংলাদেশ।
