নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ
খালি হাতে ফিরলেন ভ্যান্স, এখন কী করবেন ট্রাম্প
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে ইসলামাবাদের শান্তি আলোচনা। খালি হাতে দেশে ফিরে গেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। এই ব্যর্থতার ফলে ট্রাম্প প্রশাসন এখন দুটি অত্যন্ত কঠিন ও অজনপ্রিয় বিকল্পের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। হয় তাদের ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ ও জটিল এক আলোচনায় জড়াতে হবে; নয়তো এমন একটি যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে হবে যা এরই মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশেষ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা পরবর্তী পদক্ষেপ ঘোষণার ভার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন। তবে ট্রাম্প যে পথেই হাঁটুন না কেন, এর প্রতিটিতেই বড় ধরনের কৌশলগত ও রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে।
ইসলামাবাদের আলোচনা নিয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স বিস্তারিত কিছু না বললেও, তার কথা থেকে স্পষ্ট যে তিনি মূলত তেহরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি চিরতরে বন্ধ করার একটি ‘টেক ইট অর লিভ ইট’ (হয় মানো, নয়তো প্রত্যাখ্যান করো) প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা ইরান স্বভাবতই প্রত্যাখ্যান করেছে।
ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে জেনেভায় যে অচলাবস্থার কারণে ট্রাম্প ইরানে হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, এবারের চিত্রও তারচেয়ে খুব একটা ভিন্ন নয়। পেন্টাগনের তথ্যমতে, যুদ্ধের ৩৮ দিনে ইরানের ১৩ হাজারেরও বেশি সামরিক ও শিল্প স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। ট্রাম্পের বিশ্বাস ছিল, মার্কিন সামরিক শক্তির এই বিশাল প্রদর্শনী দেখলে ইরান নতজানু হতে বাধ্য হবে। কিন্তু ফল হয়েছে উলটো; ইরান প্রমাণ করতে মরিয়া যে, কোনো মার্কিন হামলাই তাদের টলাতে পারবে না।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কড়া ভাষায় জানিয়েছে, আমাদের মহান বয়োজ্যেষ্ঠ, প্রিয়জন এবং দেশবাসীর আত্মত্যাগ ইরানের জাতীয় স্বার্থ ও অধিকার আদায়ের লড়াইকে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে আরও সুদৃঢ় করেছে।
দীর্ঘ আলোচনার ঝুঁকি : ওবামা প্রশাসনের আমলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে শেষ বড় চুক্তিটি হয়েছিল, তা চূড়ান্ত করতে সময় লেগেছিল টানা ২ বছর। সেখানে অনেক ছাড় দেওয়ার বিষয় ছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এখন এ ধরনের দীর্ঘ ও জটিল কোনো আলোচনায় জড়াতে চরম অনাগ্রহী। ট্রাম্প মনে করেন, যুদ্ধে তিনি বিজয়ী হয়েছেন, তাই মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের ভাষায়-ইরানের উচিত এখন শুধু ‘আত্মসমর্পণ’ করা। কিন্তু মূল অচলাবস্থা রয়ে গেছে পারমাণবিক ইস্যুতেই। ইরান কয়েক বছরের জন্য তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম ‘স্থগিত’ রাখতে রাজি হলেও, নিজেদের মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা চিরতরে ছাড়তে নারাজ। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) স্বাক্ষরকারী দেশ হিসাবে একে নিজেদের অধিকার বলে মনে করে তেহরান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, ইরান সব সময়ই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একটি বিকল্প নিজেদের হাতে জমিয়ে রাখতে চায়।
যুদ্ধ শুরুর রাজনৈতিক ঝুঁকি : ২১ এপ্রিল শেষ হচ্ছে ২ সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ। এরপর ট্রাম্পের হাতে সবচেয়ে বড় ট্রাম্পকার্ড হলো পুনরায় বড় পরিসরে যুদ্ধ শুরু করার হুমকি দেওয়া। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি ট্রাম্পের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে এবং ইরানও তা খুব ভালো করেই জানে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার কারণে জ্বালানির দাম যখন আকাশ ছুঁয়েছিল, তখনই মূলত ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে বাধ্য হন। যুদ্ধ শুরু হলে সারের তীব্র সংকট এবং সেমিকন্ডাক্টর তৈরির অন্যতম উপাদান হিলিয়ামের ঘাটতি দেখা দেয়। যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হলেও, যুদ্ধ আবার শুরু হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে। মূল্যস্ফীতি-যা এরই মধ্যে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে-তা নিশ্চিতভাবেই আরও বাড়বে। তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা। ইরান তাদের আলোচনার তালিকায় বিষয়টিকে এক নম্বরে রেখেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রণালি বন্ধের বিষয়টি সেভাবে আলোচনায় ছিল না, কিন্তু যুদ্ধ শুরু হতেই ইরান তাদের এই মোক্ষম অর্থনৈতিক অস্ত্রটি ব্যবহার করে।
এখন ইরান প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং দুই দশকের বেশি সময় ধরে থাকা সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি একসঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিপূরণের দাবি সরাসরি নাকচ করেছে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ বলে জানিয়েছে। সব মিলিয়ে ইসলামাবাদ বৈঠক একটি বিষয় খুব স্পষ্ট করে দিয়েছে-উভয়পক্ষই নিজেদের প্রথম রাউন্ডের বিজয়ী বলে মনে করছে। যুক্তরাষ্ট্র ভাবছে তারা বিপুল পরিমাণ বোমা ফেলে জিতেছে, আর ইরান ভাবছে এই ভয়াবহ আক্রমণে টিকে থেকে তারা জিতেছে। ফলে কোনো পক্ষই এই মুহূর্তে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার মানসিকতায় নেই।
