ছাত্রদল-শিবির দ্বন্দ্বে উত্তপ্ত ক্যাম্পাস
ঢাবি প্রশাসনের দুই তদন্ত কমিটি
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জ্বালানি সংকটসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে সরকার ও বিরোধী দল। রাজনৈতিক দলগুলোর এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সহনশীল অবস্থান প্রশংসা কুড়ালেও মুখোমুখি অবস্থানে চলে যাচ্ছে তাদের ছাত্র সংগঠনগুলো। বেশ কিছুদিন ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ (ঢাবি) দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে। ঘটছে সংঘর্ষের ঘটনাও। এতে করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ফের অস্থিরতা তৈরির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও দুই ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতারাই বলছেন, তারাও সহিংসতা বন্ধ চান। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও জানিয়েছেন তারা।
বুধবার জাতীয় সংসদে জ্বালানি সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। পরদিন বৃহস্পতিবার সরকারি ও বিরোধী দলের পাঁচ সদস্য করে ১০ সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়। তবে একইদিন আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ নামের এক শিবির নেতার নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একটি আপত্তিকর পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) দুই নেতার ওপর হামলা হয়। এছাড়া এতে অন্তত ১০ জন সংবাদকর্মীও আহত হন। তবে আবদুল্লাহ আল মাহমুদ দাবি করেছেন, বিতর্কিত ওই পোস্টটি তিনি করেননি।
এর আগে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কলেজ ক্যাম্পাসের একটি দেওয়ালে গ্রাফিতির নিচে ‘ছাত্র’ মুছে ‘গুপ্ত’ লেখাকে কেন্দ্র করে এই সংঘর্ষের পরে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে পড়ে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। এছাড়া বৃহস্পতিবার পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ককটেল বিস্ফোরণ ও ছাত্রদলের কার্যালয়ও ভাঙচুর হয়। শুধু ঢাকা, চট্টগ্রাম বা পাবনার ঈশ্বরদী নয়, সম্প্রতি আরও বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবশালী নেতারাও পালটাপালটি বক্তব্য দিচ্ছেন। শুক্রবার চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যারা দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে, তারা যে-ই হোক ছাড় দেওয়া হবে না। একই দিন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের নিয়ে নামে-বেনামে, নিজ বা ভিন্ন পরিচয়ে, ধারাবাহিকভাবে আপত্তিকর শব্দচয়ন এক ধরনের গুপ্ত স্বৈরাচারী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। তিনি আরও লিখেন, গঠনমূলক রাজনীতির স্বার্থে এখন প্রয়োজন সংযত ভাষা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং ইতিবাচক আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
অন্যদিকে শুক্রবার দুপুরে ঝিনাইদহে এক অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সংসদে সমঝোতার কথা বলবেন, আর সেইদিন সন্ধ্যায় ডাকসু নেতাদের হামলা করবেন, এ দ্বিচারিতা জনগণ মেনে নেবে না।
এদিকে সম্প্রতি বিভিন্ন ক্যাম্পাসের এসব সংঘর্ষ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরও বলছে তারাও সহিংসতা বন্ধ করতে চায়। এ লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ও ক্যাম্পাসগুলোতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিরসনে শুক্রবার ঢাবির ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ায় জরুরি আলোচনা সভা করে ছাত্রদল। সভায় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল, ঢাবি শাখার সুপার সেভেন ও ২০ ইউনিটের সুপার ফাইভসহ ২১টি ইউনিটের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব যুগান্তরকে বলেন, আমরা সভা করে সবাইকে সহনশীল রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখতে বলেছি। কারও পাতা ফাঁদে পা না দিতে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও মহানগরে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমরা আমাদের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেব, তারা (ছাত্রশিবির) তাদের মতো ব্যবস্থা নেবে।
রাজনীতির মাঠে উত্তেজনা বন্ধ চায় ইসলামী ছাত্রশিবিরও। ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম জানিয়েছেন তারাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, অনেক আগে থেকেই ছাত্রদলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। ক্যাম্পাসে সুন্দর পরিবেশ রাখতে চাই। উত্তপ্ত পরিস্থিতি সবার জন্য ক্ষতিকর। আমরা চাই ক্যাম্পাসে একটা সুন্দর অবস্থান থাকুক। তিনি আরও বলেন, ছাত্র রাজনীতি উত্তপ্ত হলে সবার জন্য ক্ষতি হবে এবং ছাত্রলীগ পুনর্বাসিত হবে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলায় দুঃখ প্রকাশ ছাত্রদলের, তদন্ত কমিটি : শাহবাগ থানায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির। তিনি বলেন, ছাত্রদল সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আমরা আশা করছি, ভবিষ্যতে আর কোনো সাংবাদিক যাতে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হয়রানির শিকার না হন।
এদিকে শাহবাগ থানায় সাংবাদিকদের সঙ্গে সংঘর্ষের অভিযোগ তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ছাত্রদল। কমিটির নেতৃত্বে আছেন সহসভাপতি জহির রায়হান আহমেদ, এ বি এম ইজাজুল কবির রুয়েল, ঢাবি শাখার সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক এবং সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন শাওন। তাদের পাঁচ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
ঢাবি প্রশাসনের দুই তদন্ত কমিটি : উদ্ভূত পরিস্থিতি তদন্তে সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুব কায়সারকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ঢাবি প্রশাসন। কমিটিকে আগামী তিন কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া সলিমুল্লাহ মুসলিম হল কর্তৃপক্ষও তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
ভুয়া স্ক্রিনশট ছড়িয়ে অপপ্রচারের অভিযোগ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জায়মা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভুয়া ও বিকৃত স্ক্রিনশট ছড়িয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানোর অভিযোগ করেছে অভিযুক্ত ঢাবি শিক্ষার্থী ও শিবির নেতা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। বিগত ডাকসু নির্বাচনে তিনি ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের সদস্য প্রার্থী ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদ জানান, তিনি বিতর্কিত পোস্টটি করেননি। বিষয়টি স্পষ্ট করতে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ব্যাখ্যা দিয়ে একটি পোস্টও করেন। এরপরও তার বিরুদ্ধে লাগাতার হুমকি আসতে থাকে। এমনকি তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে আত্মীয়দের শনাক্ত করে তাদেরও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রকাশ্যে আসতে শিবিরকে আহ্বান ছাত্র অধিকার পরিষদের : ছাত্রদলকে সহিংস রাজনীতি পরিহার এবং ছাত্রশিবিরকে গুপ্ত রাজনীতি ছেড়ে প্রকাশ্যে গণতান্ত্রিক ধারায় আসার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ। শুক্রবার মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি নাজমুল হাসান বলেন, শেখ হাসিনার পতনের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী রাজনীতির অবসান হবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির এখন আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাতে জড়াচ্ছে।
