সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
হাওড়ের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে সহযোগিতা দেওয়া হবে
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের জন্য মূল্যস্ফীতি বাড়বে না, বরং কমবে * চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সংসদ অধিবেশন চলাকালে অসুস্থ হয়ে পড়া বিরোধী দলের সংসদ-সদস্য হাফেজ রবিউল বাশারকে দেখতে গিয়ে শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান -পিআইডি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, হাওড়াঞ্চলে ভারি বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চিহ্নিত করে আগামী তিন মাস সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা দেওয়া হবে। বুধবার জাতীয় সংসদে হাওড়াঞ্চলের এক সংসদ-সদস্য কৃষকদের দুর্ভোগ তুলে ধরার পর এ কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ের নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পূরক প্রশ্নে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ-সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, প্রবল বর্ষণে সব হাওড় তলিয়ে যাচ্ছে। কৃষক ধান কাটতে মাঠে লড়াই করছেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, কৃষকদের বিষয়টি উদ্বেগের। তিন দিন আগে আবহাওয়া প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তিনি তিনটি জেলার স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন যেন পূর্বাভাস অনুযায়ী বৃষ্টিপাত হলে ব্যবস্থা নেন। তিনি বলেন, ‘আজ (বুধবার) সকালে অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে আমি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে এসেছি এবং নির্দেশনা দিয়েছি, এ তিন জেলাসহ ময়মনসিংহের কিছু এলাকা প্রবল বর্ষণে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। এসব এলাকার যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাদের ফসল নষ্ট হয়েছে, তাদের লোকেট (চিহ্নিত) করে আগামী তিন মাস সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করব।
এদিকে বুধবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হলে প্রশ্নোত্তরপর্বে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, পর্যায়ক্রমে দেশের চার কোটি মানুষকে ফ্যামিলি কার্ড ও পৌনে তিন কোটি কৃষককে কৃষি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, একই সঙ্গে একই ব্যক্তি সরকারের একাধিক সুবিধা যাতে না পায়, সেই পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এসব সুবিধার কারণে দেশে মূল্যস্ফীতি হবে না। আমরা টাকা ছাপিয়ে দেব না।
শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর জন্য ৪০ মিনিট নির্ধারিত ছিল। প্রধানমন্ত্রীর জন্য বুধবার ৮টি প্রশ্ন ছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদ-সদস্যদের ২টি প্রশ্ন ও সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
সংসদে সম্পূরক প্রশ্নে এনসিপির সংসদ-সদস্য আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ) বলেন, ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনতে হলে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা বার্ষিক খরচ হবে। প্রক্রিয়াকরণ খরচসহ ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। আবার ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়া হবে। সেখানে সাত হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। এটি দেশের অর্থনীতি কতটুকু স্বনির্ভর করবে? এই অর্থ কি বর্তমানে চলা সামাজিক সুরক্ষা থেকে কেটে এনে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে নাকি নতুন করে এ খাতে টাকা দেওয়া হচ্ছে। সেক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতি ঘটনার আশঙ্কা আছে কি না?
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ ফ্যামিলি কার্ড গ্রহণ করেছে। আমরা পর্যায়ক্রমে চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেব। একবারে এটা করা সম্ভব না। প্রথম পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে দেওয়া হবে। সে কারণে আমাদের হিসাবনিকাশ অনুযায়ী বাজেটের ওপর চাপ পড়ার তেমন কারণ নেই। তিনি বলেন, বর্তমানে যতগুলো সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প চালু আছে, তার সবকটির অর্থ সহযোগিতা যোগ করা হলে ফ্যামিলি কার্ডের সমপরিমাণ হবে না। আমরা গবেষণা করে দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রে একাধিক সুবিধা একজন ব্যক্তি পাচ্ছেন। সেগুলোকে আমরা কাটডাউন করব, সবকটিকে কাটডাউন করব না।
এসব সুবিধার কারণে দেশে মূল্যস্ফীতি হবে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া ব্যক্তিদের কেউ বলছেন জামাকাপড় কিনবে, কেউ বলছে বাচ্চাদের জন্য বই কিনবে। যে মানুষগুলো পাচ্ছে তারা ব্র্যান্ডের জিনিস ব্যবহার করে না। তারা প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহার করে। তাদের ব্যবহার করা জিনিসপত্র দেশীয় কারখানায় তৈরি। ফ্যামিলি কার্ডের টাকা খরচ হলে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হবে। স্থানীয় দোকানেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি হবে এটা (ফ্যামিলি কার্ড) রাষ্ট্রের একটা বিনিয়োগ। আমাদের হিসাব হচ্ছে মূল্যস্ফীতি বাড়বে না, বরং কমবে। ফ্যামিলি কার্ড ছিল বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি। প্রথম পর্যায়ে ৩৭ হাজার পরিবারকে কার্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষককে ১০ ধরনের সুবিধা দিতে বিএনপি চালু করেছে কৃষক কার্ড। কৃষকদের পাশাপাশি মৎস্যচাষি ও দুগ্ধ খামারিরাও এ কার্ডের সুবিধা পাবেন।
‘ক্লিন ও গ্রিন সিটি’ করতে ১২ দফা কর্মপরিকল্পনা : ঢাকা-৯ আসনের সংসদ-সদস্য আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘রাজধানী ঢাকাকে ‘ক্লিন ও গ্রিন’ সিটিরূপে গড়ে তুলতে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে নানাবিধ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘কোরিয়াভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলকে সমন্বিত সার্কুলার ইকোনমিভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রে রূপান্তর করার মাধ্যমে সব বর্জ্যকে জিরো বর্জ্যতে রূপান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করি, এসব কার্যক্রম ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকা শহর গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’
চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনের নির্দেশ : চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ-সদস্য সাঈদ আল নোমান পয়েন্ট অব অর্ডারের পরিপ্রেক্ষিতে তারেক রহমান বলেন, ‘অনেক বড় ওয়াটার লগ হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবে একটু সময় লাগবে। এই কষ্টের জন্য আমি আমার অবস্থান থেকে চট্টগ্রাম শহরে বসবাসকারী সব নাগরিকের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। আমরা চেষ্টা করছি যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যা থেকে মানুষকে বের করে নিয়ে আসা যায়।’ পয়েন্ট অব অর্ডারে সাঈদ আল নোমান বলেন, চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। এ মুহূর্তে চট্টগ্রামের মানুষ পানিতে ভাসছে। সাধারণ মানুষ, যাদের বাসা ছিল না, তারা আক্ষরিক অর্থে পানিতে ভাসছে। চট্টচগ্রামজুড়ে গলা পর্যন্ত পানি। তার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনিও সংবাদমাধ্যমে দেখেছেন চট্টগ্রাম শহরের একটি বড় অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে এবং মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। এই সমস্যাটি শুধু চট্টগ্রামে নয়, বলা যায় সারা দেশে ছড়িয়ে আছে। ঢাকা শহরেও অনেক জায়গায় বৃষ্টিতে পানি জমে যাচ্ছে। এটি অনেকদিনের সমস্যা। বর্তমান সরকার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। কাজও শুরু হয়েছে।
অধিবেশন চলাকালে হঠাৎ অসুস্থ জামায়াত এমপি রবিউল-খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী : জাতীয় সংসদ অধিবেশন চলাকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন জামায়াতে ইসলামীর সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ-সদস্য (এমপি) রবিউল বাশার। পরে অন্য সদস্য ও সংসদ সচিবালয়ের কর্মীদের সহায়তায় তাকে অধিবেশন কক্ষ থেকে সংসদ লবিতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পরে জোহরের নামাজের বিরতির সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদ লবিতে গিয়ে অসুস্থ বিরোধীদলীয় সংসদ-সদস্যের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তার বিষয়ে নির্দেশনা দেন। এ সময় জাতীয় সংসদের চিফ হুইপসহ হুইপরা উপস্থিত ছিলেন। বুধবার সংসদে দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে রবিউল বাশার অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর বক্তব্য দিচ্ছিলেন বিএনপির বগুড়া-৫ আসনের সংসদ-সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ। তার বক্তব্য থামিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রবিউল বাশারের খোঁজখবর নেন এবং জাতীয় সংসদের চিকিৎসককে তাকে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার নির্দেশনা দেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপান সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছে জাপানের কৃষিমন্ত্রী এবং দেশটির সরকারের বিশেষ দূত সুজুকি নরিকাজুর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের এক প্রতিনিধিদল। বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করায় তারেক রহমানকে বৈঠকে জাপান সরকারের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানান দেশটির কৃষিমন্ত্রী। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার আশা ব্যক্ত করেন তিনি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও জাপান দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু। প্রধানমন্ত্রী জাপানে বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবগুলো ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
