ভারত-চীনের সঙ্গে আলোচনা করেই কাজ করব: আসাদুল হাবিব দুলু
নিজস্ব অর্থায়নেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব: নজরুল ইসলাম হক্কানি
Advertisement
মাহবুব রহমান
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এবং তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহবুব রহমান
যুগান্তর : আপনি ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখন সরকারি দলের মন্ত্রী। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে কী ভাবছেন?
আসাদুল হাবিব দুলু : আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ আন্দোলন চলাকালে রংপুরে এসেছিলেন এবং সমাবেশে বলেছিলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। কাজের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনি যা বলেছেন তা অসত্য। কোনো কাজই করা হয়নি। শুধু একটি জরিপ রিপোর্ট আমরা সরকার গঠনের পর দেখলাম। আর কোনো কাজই তারা করেনি। আমি নির্বাচনের আগে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। লাখো মানুষ এই দাবির পক্ষে সমর্থন দিয়ে আন্দোলন করেছে। উত্তরের মানুষের এই দাবি বাস্তবায়নে আমিও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সরকারও বিষয়টি নিয়ে ভাবছে।
যুগান্তর : সরকার ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প একনেকে অনুমোদ করেছে। কিন্তু তিস্তা মহাপরিকল্পনার কোনো উদ্যোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে বৃহত্তর রংপুরের ৫ জেলার মানুষ উদ্বিগ্ন। কী বলবেন এ নিয়ে?
আসাদুল হাবিব দুলু : আমি মনে করি, সরকারের ভেতর থেকে কথা বলতে গেলে নিশ্চয়ই একা কোনো প্রকল্প নিয়ে কথা বলার সুযোগ নেই। সরকারপ্রধান, নীতিনির্ধারক মহলসহ সংশ্লিষ্টরা কী ভাবছেন-সবার সমন্বয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলা উচিত। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মনে রেখেছেন। তিনিও রংপুরের নির্বাচনি জনসভায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আমি সম্প্রতি সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করেছি। সংসদে সেটা নিয়ে কথা হয়েছে। সবাই সমর্থন করেছেন। আশা করি, বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে।
যুগান্তর : আপনি কি মনে করেন ভারতকে উপেক্ষা করে চীনের সহযোগিতায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব?
আসাদুল হাবিব দুলু : না, আমি তা মনে করি না। নিশ্চয়ই আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভৌগোলিক কারণে ভারত হয়তো চীনের একার সিদ্ধান্তে আপত্তি জানাবে। আমরা বিষয়টি নিয়ে ভারত-চীনের সঙ্গে কথা বলেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করব। প্রতিবেশী বৃহৎ কোনো দেশের সঙ্গে বৈরিতা সৃষ্টি করে এই প্রকল্প গ্রহণ করা সমীচীন হবে না বলে আমি মনে করি। প্রয়োজনে আমরা ত্রিপাক্ষিক বৈঠক করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে যাব।
যুগান্তর : তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে ভারত ও চীনের সঙ্গে বর্তমান সরকার কোনো আলোচনা করেছে কি?
আসাদুল হাবিব দুলু : প্রধানমন্ত্রী চীন সফরের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন। চীন সফরে বিষয়টি নিয়ে নিশ্চয়ই উভয় দেশের সরকারপ্রধানের আলোচনা হবে।
নিজস্ব অর্থায়নেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব: নজরুল ইসলাম হক্কানি
যুগান্তর : সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ না নিয়ে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এ নিয়ে কী বলবেন?
নজরুল ইসলাম হক্কানি : রংপুর অঞ্চলে প্রতিবছর অসময়ের বন্যায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। এতে কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। বছরে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। এ কারণে দীর্ঘদিন এ অঞ্চলের মানুষ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আন্দোলন করে আসছে। জনগণের সেই দাবিকে উপেক্ষা করে সরকার পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এটি রংপুর অঞ্চলের মানুষকে হতাশ করেছে। আমরা পদ্মা ব্যারাজের বিপক্ষে নই। কিন্তু সরকারের তিস্তা মহাপরিকল্পনা অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ছিল। আমরা আমাদের দাবি বাস্তবায়নে আন্দোলন চালিয়ে যাব।
যুগান্তর : আপনি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন আন্দোলনের সামনের সারির নেতা, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের অনুভূতি কী দেখছেন?
নজরুল ইসলাম হক্কানি : সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ ও হতাশ। তারা বলছেন, ‘আন্দোলন করি হামরা (আমরা) কী পাইলাম।’ আমি মনে করি, রাষ্ট্রের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের মানচিত্রে সব নদী সমান গুরুত্ব পায় না। সম্প্রতি সেই বৈষম্যের নতুন উদাহরণ হয়ে উঠেছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা।
যুগান্তর : আপনি কি মনে করেন বৈদেশিক অর্থায়ননির্ভরতার বেড়াজালে তিস্তা মহাপরিকল্পনা আটকে আছে?
নজরুল ইসলাম হক্কানি : যেখানে বহুলপ্রতীক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা এখনো একনেকে অনুমোদন পায়নি, সেখানে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের জন্য তিস্তার তুলনায় প্রায় চারগুণ অর্থ বরাদ্দের নীতিগত অনুমোদন এসেছে। তাও আবার নিজস্ব অর্থায়নে। এ বাস্তবতা উত্তরাঞ্চলের মানুষের মনে এক গভীর প্রশ্ন তুলেছে। তাহলে কি রাষ্ট্রের কাছে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, নদী ও মানুষ এখনো প্রান্তিকই রয়ে গেল? তিস্তাপারের মানুষের কণ্ঠে তাই আজ ক্ষোভ, হতাশা ও ব্যঙ্গ মিশে উচ্চারিত হচ্ছে-‘এত আন্দোলন করলাম, বুড়ো হইলাম; ওমরা আন্দোলন না করি, ৬ গুণ বেশি টাকার কাজের অনুমোদন পাইলো!’ এই কথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে উত্তরবঙ্গের দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস। আমি মনে করি, নিজস্ব অর্থায়নে সরকার এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে।
যুগান্তর : বর্তমান সরকারের আমলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে কী করবেন?
নজরুল ইসলাম হক্কানি : বর্তমান সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন। তিনি নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় গেলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। রংপুর জিলা স্কুল মাঠের জনসভায় বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তাই বর্তমান সরকার যদি এই প্রতিশ্রুতি পূরণ না করে, তাহলে আমরা আবারও রাজপথে আন্দোলনে নামব। দাবি আদায় করতে সরকারকে বাধ্য করব।
