বাংলাদেশ-তুরস্ক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক
প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী তুরস্ক
Advertisement
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকায় শুক্রবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান করমর্দন করছেন -সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
তুরস্ককে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহের কথা জানিয়েছে তুরস্ক। ঢাকায় সফররত তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে শুক্রবার যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও একান্ত বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে গঠনমূলক দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তোলার নীতিতে অগ্রসর হচ্ছে। দেশের বাইরে ‘বন্ধু ও অংশীদার আছে, তবে কোনো প্রভু নয়।’ আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও সহযোগিতা বাড়াতে তুরস্কের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা বাড়াতে তারা আগ্রহী। এদিকে, আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের বৈঠকের কথা রয়েছে।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ড. খলিলুর রহমান বলেন, তুরস্কের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে যথেষ্ট পরিমাণে বাড়ানোর সুযোগ নিয়েও আলোচনা করেছি। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণোদনা সম্পর্কে অবহিত করেছি। বাংলাদেশে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় তুরস্কের প্রতি আহ্বান জানিয়েছি। বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে চলা কূটনীতিতে বাংলাদেশ জোরালোভাবে বিশ্বাস করে। বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে গঠনমূলক দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ার বিষয়ে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সহযোগিতার বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে অভিন্ন স্বার্থ, আন্তর্জাতিক নিয়মের প্রতি সম্মান এবং অংশীদারত্ব ও বন্ধুত্বের চেতনা। আমরা আরও বিশ্বাস করি, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বহুপক্ষীয় সহযোগিতা অপরিহার্য। তিনি বলেন, শান্তি, স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অভিন্ন উন্নতি এবং পারস্পরিকভাবে মঙ্গলজনক সহযোগিতার প্রসারে তুরস্কের মতো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ কাজ করে যাবে।
ড. খলিলুর রহমান আরও বলেন, টেক্সটাইল ও অ্যাপারেলস, প্রতিরক্ষাসামগ্রী উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ, ফার্মাসিউটিক্যালস, অবকাঠামো, নবায়ণযোগ্য জ্বালানি, আইসিটি, স্মার্ট প্রযুক্তি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহণ খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছি। ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিকমানের হাসপাতাল এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট করার বিষয়ে তুরস্ককে প্রস্তাব দিয়েছি। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার বাংলাদেশি নাগরিক তুরস্কে বসবাস করছেন এবং তাদের বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। দুই দেশের মধ্যে শিক্ষার্থী বিনিময়সহ জনগণের মধ্যে যোগাযোগ উন্নত করার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য হাকান ফিদানকে সংস্কৃতি, পর্যটন, শিক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ জোরদার করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশ প্রথম নীতি’ অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে এর অর্থ বাংলাদেশ একা হয়ে যাওয়া নয়। বরং এর মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের কল্যাণে দৃঢ় অঙ্গীকার প্রকাশ পায়। তিনি আরও বলেন, এ নীতি এমন একটি অবস্থান নির্দেশ করে যেখানে বাংলাদেশ কোনো দেশের প্রভাবাধীন নয়, বরং সমমর্যাদার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা করবে।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি তুরস্কের মানবিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে এটা নিয়ে কাজ করায় তুরস্ককে ধন্যবাদ দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো-রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা করা। মানবিক জায়গা থেকে বিশাল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, আমরা সহমর্মিতা ও সমর্থন দিয়ে যাচ্ছি ঠিক। কিন্তু এ পরিস্থিতি অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে পারে না। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর তাদের নিজভূমি মিয়ানমারে দ্রুততার সঙ্গে নিরাপদ, স্বেচ্ছা, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসন আমাদের অগ্রাধিকার।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন যুগে প্রবেশ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় ড. খলিলুর রহমানকে তিনি অভিনন্দন জানান। বাংলাদেশে বাণিজ্যের পরিমাণ আরও বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করে হাকান ফিদান বলেন, আমাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১.৩ বিলিয়ন থেকে ২ বিলিয়ন করার জন্য যে কাজগুলো করা যেতে পারে তা আমরা আলোচনা করেছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে আমাদের সহযোগিতার বিকাশের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে স্থান দিয়ে বড় মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবতার পক্ষে এক ঐতিহাসিক ত্যাগ স্বীকার করছে। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও ন্যায্য সমাধান খুঁজে বের করতে আমরা সংশ্লিষ্ট প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করছি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, আঞ্চলিক সংঘাত আগের চেয়ে বেশি বৈশ্বিক গতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে।
এদিকে, দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় বিষয়ক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সাংস্কৃতিক সম্পদ রক্ষায় সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেন।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী : কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, শুক্রবার কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। এ সময় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে তিনি কথা বলেন এবং তাদের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। এর আগে দুপুরে ঢাকা থেকে বিমানে তিনি কক্সবাজারে পৌঁছান। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। উখিয়ার বালুখালী ৯ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তুরস্কের সহায়তায় পরিচালিত ফিল্ড হাসপাতালের কার্যক্রম তিনি পরিদর্শন করেন। এছাড়া তিনি ১৬ ও ১৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন।
