Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

সাক্ষাৎকার: পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি

বাজেটে মানুষের চাহিদার প্রতিফলন থাকবে

প্রকল্প পরিচালনায় চালু হচ্ছে পিডি পুল * অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে অকার্যকর প্রকল্পগুলো বাতিল বা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া চলছে

Icon

আরমান হেকিম

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেটে মানুষের চাহিদার প্রতিফলন থাকবে

জোনায়েদ সাকি। ফাইল ছবি

আসন্ন জাতীয় বাজেট সামনে রেখে সাধারণ মানুষের স্বস্তি, প্রকল্প বাস্তবায়নে শৃঙ্খলা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত পরিবর্তন-এই চারটি বিষয় কেন্দ্র করেই সরকারের প্রস্তুতি এগোচ্ছে। উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা, সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি রোধ এবং তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রশ্নে নতুন করে জোর দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিস্তার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অগ্রাধিকার এবং প্রোগ্রামভিত্তিক উন্নয়ন মডেলে যাওয়ার পরিকল্পনাও সামনে আসছে। এসব বিষয় নিয়ে যুগান্তরের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার আরমান হেকিম।

যুগান্তর : সাধারণ মানুষের জন্য আসন্ন বাজেটে কী ধরনের স্বস্তির বার্তা থাকছে এবং সরকার কোন খাতগুলো অগ্রাধিকার দিচ্ছে?

জোনায়েদ সাকি : সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কমাতে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড এবং ধর্মীয় স্থাপনা সংশ্লিষ্ট খাতে আলাদা বরাদ্দ রয়েছে। এসব সহায়তা বিতরণের ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি বা অনিয়ম না ঘটে, সেজন্য প্রশাসনকে সক্রিয় রাখা হয়েছে। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি নজরদারির মধ্যে আনা হচ্ছে। সরকার চায় এই অর্থ যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায় এবং কোনোভাবেই অপচয় না হয়। একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে এডিপিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কারণ মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

যুগান্তর : প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি দীর্ঘদিনের সমস্যা। এটি নিয়ে সরকারের বর্তমান অবস্থান কী?

জোনায়েদ সাকি : প্রকল্পের সময় বৃদ্ধি মানেই এক ধরনের ব্যয় বৃদ্ধি। এটি সরাসরি অর্থ আত্মসাৎ না হলেও অপচয়ের মাধ্যমে দুর্নীতিতে রূপ নেয়। বারবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো আমাদের বড় একটি কাঠামোগত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন এই সময় ও ব্যয় বাড়ছে, সেটি খতিয়ে দেখতে এনইসি বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন। আইএমইডিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা একটি বিশদ প্রতিবেদন তৈরির কাজ করছি, যেখানে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপের সমস্যা চিহ্নিত করা হবে এবং সমাধানের বাস্তবসম্মত পথ নির্ধারণ করা হবে। নতুন অর্থবছর শুরুর আগেই এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।

যুগান্তর : প্রকল্প পরিচালনায় কাঠামোগত দুর্বলতা, বিশেষ করে পিডি নিয়োগ নিয়ে যে প্রশ্ন আছে, সেটি কীভাবে সমাধান করা হবে?

জোনায়েদ সাকি : বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে একজন প্রকল্প পরিচালক একাধিক প্রকল্পের দায়িত্ব পালন করেন, যা কার্যকরভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এই সমস্যার সমাধানে একটি পিডি পুল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে দক্ষ কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করা হবে। আমরা চাই পিডি নিয়োগটি যেন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে না হয়ে পূর্ণকালীন হয়। প্রকল্পের প্রস্তাবনার শুরু থেকেই পিডি নিয়োগ দেওয়া গেলে তারা প্রকল্প সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করতে পারবেন এবং মাঝপথে বদলির প্রবণতা কমবে। এজন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরির কাজও চলছে।

যুগান্তর : মূল্যস্ফীতি ও পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, সেটি নিয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?

জোনায়েদ সাকি : অতীতে কিছু ক্ষেত্রে তথ্য প্রকাশে বিলম্ব বা নিয়ন্ত্রণ ছিল, যা স্বচ্ছতার প্রশ্ন তৈরি করেছে। এখন আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। আগের ডেটাগুলোর ফরেনসিক পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে কোথায় কী ধরনের অসামঞ্জস্য ছিল তা বোঝা যায়। একই সঙ্গে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি উন্নত করা হচ্ছে, যাতে বাস্তবতার সঙ্গে পরিসংখ্যানের সামঞ্জস্য থাকে এবং নীতিনির্ধারণে সঠিক তথ্য ব্যবহার করা যায়।

যুগান্তর : অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও জ্বালানি খাতে সরকারের কৌশল কী?

জোনায়েদ সাকি : আমরা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও লালফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে একটি কার্যকর সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করছি, যাতে বিনিয়োগকারীরা সহজে সেবা পান। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। জ্বালানি খাতকে আমরা অত্যন্ত অগ্রাধিকার দিচ্ছি, কারণ নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ ছাড়া বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি সম্ভব নয়। এজন্য একটি আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি নীতি প্রণয়নের কাজ চলছে।

যুগান্তর : উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে?

জোনায়েদ সাকি : আমরা একক প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন মডেল থেকে সরে এসে প্রোগ্রামভিত্তিক কাঠামোর দিকে যেতে চাই। একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের অধীনে একাধিক প্রকল্প সমন্বিতভাবে বাস্তবায়িত হবে, যাতে ওভারল্যাপিং কমে এবং সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হয়। বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৩৩৩টি প্রকল্প চলমান রয়েছে, যার মধ্যে ১ হাজার ১৫০টি আগামী এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নতুন প্রস্তাবিত প্রকল্প থেকে বাছাই করে সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে, যাতে অগ্রাধিকারভিত্তিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়। যেসব প্রকল্পের অগ্রগতি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের বেশি, সেগুলো বিশেষ পর্যালোচনায় রাখা হয়েছে এবং অকার্যকর প্রকল্প বাতিল বা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।

যুগান্তর : সংস্কার কার্যক্রম ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?

জোনায়েদ সাকি : আমরা দুর্নীতি, অপচয় এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর ওপর জোর দিচ্ছি। প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে একটি ড্যাশবোর্ড তৈরি করা হচ্ছে, যাতে অগ্রগতি সহজে পর্যবেক্ষণ করা যায়। ই-জিপি ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সম্মানি সংস্কৃতির কারণে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ছে, সেটিও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে। পরিকল্পনা প্রণয়নে অতীতে যে আনুষ্ঠানিকতা ছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর পরিকল্পনা তৈরির দিকে আমরা এগোচ্ছি। গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আরও সক্রিয়ভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম