বাজেটে অর্থনৈতিক সংস্কার হবে না: নাহিদ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন ও চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি বলেছেন, বিএনপি সরকারের ঘোষিত প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার হবে না। বাজেটের ৬ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা মূলত বাস্তবতাবিবর্জিত। শুক্রবার চট্টগ্রামে তিনি এমন মন্তব্য করেন। এদিকে একই দিন ঢাকায় এনসিপির আনুষ্ঠানিক বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়-প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু ভালো দিক থাকলেও এটি সার্বিকভাবে প্রতারণার।
বিকালে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ৬ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এটা মূলত বাস্তবতাবিবর্জিত। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনোই এত রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান যে কর বা রাজস্ব আদায়ের কাঠামো রয়েছে সেটার মধ্য দিয়ে এ বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এটি একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট। আমরা আশা করেছিলাম-এ বাজেটের মাধ্যমে অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার আসবে; কিন্তু বর্তমান বাজেটের যে রূপরেখা, তাতে কোনো অর্থনৈতিক সংস্কার সম্ভব হবে না।
বাজেটের কিছু ইতিবাচক দিক উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, তারা কিছু সৃজনশীল জায়গা দেখিয়েছেন। কিছু পণ্যের কর কমানো হয়েছে; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও শেষ পর্যন্ত তা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য হবে দেখার বিষয়। বাজেটে সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতির ঝুঁকির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাজেটে কীভাবে দুর্নীতি বন্ধ করবেন তার কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। বড় বাজেট মানেই তা নিয়ে বড় ধরনের দুর্নীতি করারও সুযোগ তৈরি হওয়া। তিনি বলেন, এস আলমসহ বড় বড় মাফিয়া অলিগার্ক ফ্যাসিবাদে পুষ্ট হয়ে জনগণের টাকা লুট করে বিদেশে আছেন। তাদের বিচারের আওতায় আনার কোনো বক্তব্য আমরা পাইনি। বরং আমরা দেখতে পাচ্ছি-ইসলামী ব্যাংককে আবার এস আলমের হাতে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জায়গা থেকে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ করা হয়েছে। তবে হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত ও বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জায়গা থেকে জামায়াত বা ১১ দলকে এক ধরনের কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, বিভিন্ন কার্ড বিতরণ বা খাল খনন কর্মসূচিতে ক্ষমতাসীন দলের এমপিরা বরাদ্দ পাচ্ছেন। কিন্তু বিরোধীদলীয় এমপিরা পাচ্ছেন না। এটি কীভাবে করছেন? অর্থাৎ কোথাও কোনো জবাবদিহি নেই। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোকে নজিরবিহীন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এত কম সময়ের ব্যবধানে আগে কখনো এভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি। অনুষ্ঠানে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইবসহ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে বিকালে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ছায়াবাজেট কমিটির প্রধান ড. আতিক মুজাহিদ প্রস্তাবিত বাজেট সম্পর্কে দলীয় প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, বাজেটে কিছু ভালো দিক থাকলেও সার্বিকভাবে এটি প্রতারণার। তিনি বলেন, বাজেটে ৬ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা আয় করার যে লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে-তা অর্জন সম্ভব হবে না। কারণ সর্বোচ্চ ৪ লাখ কোটি টাকা বা তার কিছু বেশি আয় আসতে পারে। বাজেটে কালোটাকা সাদা করার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই-উল্লেখ করে তিনি বলেন, এনসিপি মনে করছে-কালোটাকা দেশের বাইরে নিয়ে সাদা করা হতে পারে। অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলো করের আওতায় আনার বিষয়েও সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই। ঋণনির্ভর অর্থনীতিতে এত বড় ঘাটতি বাজেটের অর্থায়ন নিয়ে সরকার কোনো উপায় বা দিকনির্দেশনা তুলে ধরেনি। এতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। তিনি বলেন, একটা কথা আছে-যত বড় বাজেট, তত ভারী নেতাকর্মীদের পকেট। এটিই হচ্ছে কিনা, সেটি প্রশ্ন।
ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, এত বড় বাজেটের টাকা কোথা থেকে আয় করবেন, তা তো পরিষ্কারভাবে বলতে হবে। আপনি হয়তো এনবিআরকে একটি লক্ষ্যমাত্রা দিলেন-আমাদের এত টাকা দেবেন। কিন্তু এনবিআরের যে সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে সেটিতে বড় বাধা দেওয়া হয়েছে এবং আপনারা বড় দল হিসাবে কোনো কথা বলেননি। ফলে এখনকার যে লক্ষ্যমাত্রা-এটি কোনোভাবেই আদায় করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, চলতি বাজেটে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা আহরণে যে সিস্টেমের কথা বলা হয়েছে-তাতে আমাদের হিসাবে সর্বোচ্চ চার লাখ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। এর মানে এখানে আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে।
আতিক মুজাহিদ বলেন, বাজেট ঘাটতির সঙ্গে ব্যাংক ঋণের একটি ইস্যু আছে। ১০ লাখের অধিক বৈদেশিক ঋণ আছে। স্থানীয়ভাবে ৮ লাখ কোটি টাকা ঋণ ব্যাংকিং খাত থেকে সরকার নিয়েছে। আবার যদি এক লাখ বাড়ে, এভাবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকের থেকে ঋণ নিতে থাকলে ব্যাংকের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে! তিনি বলেন, আমাদের অনেক ব্যাংক ডেথ। এখান থেকে ঋণ না পেলে বিকল্প হিসাবে টাকা ছাপাতে হবে। ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। এটি জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।
আতিক মুজাহিদ বলেন, নতুন নিয়ম করা হয়েছে-ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলে টিন সার্টিফিকেট লাগবে। ফলে মানুষ ফরমাল চ্যানেলে যে টাকা লেনদেন করবে সেটা করতেও ভয় পাবে। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিু আয়ের অনেকে করের ভয়ে তা করবে না। ফলে ইনফর্মাল ইকোনমি বেশি হলে-এটা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আরেকটি বিষয় হলো-বিভিন্ন গবেষণায় আমরা দেখেছি-ঢাকা শহরে বসবাস করতে অন্তত ৩৬ হাজার টাকা লাগে। এ কারণে আমরা বলেছিলাম-করমুক্ত আয়সীমা যেন ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা রাখা হয়। কিন্তু ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার করা হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি ধরে করলেও তো ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা হয়। ফলে ৩১ হাজার টাকার মতো আয় করলেও করের আওতায় আসবে। এ সময় দলের যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ, জয়নাল আবেদীন শিশিরসহ একাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন।
