Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট হয়নি ২২ বছরেও

দুদক এখনো অসহায় বিচারযুদ্ধ অন্যের হাতে

Advertisement

মহিউদ্দিন খান রিফাত

মহিউদ্দিন খান রিফাত

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দুদক এখনো অসহায় বিচারযুদ্ধ অন্যের হাতে

Advertisement

দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান, তদন্ত, চার্জশিট দাখিল, সম্পদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ থেকে শুরু করে অর্থ পাচারের জটিল নথি বিশ্লেষণ-সবই করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কিন্তু আদালতে গিয়ে সেই মামলার পক্ষে লড়াইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি থাকে অন্যের হাতে। দুদক আইনে নিজস্ব স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিট গঠনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রতিষ্ঠার ২২ বছর পরও তা গড়ে তুলতে পারেনি সংস্থাটি। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো এখনো পরিচালিত হচ্ছে চুক্তিভিত্তিক প্যানেল আইনজীবীদের মাধ্যমে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দুদকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র আদালত। সেখানে নিজস্ব শক্তিশালী প্রসিকিউশন না থাকার ফলে তদন্তে চিহ্নিত ও প্রমাণিত দুর্নীতিবাজরা খালাস পেয়ে যায়।

দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ৩৩(১) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কমিশনের তদন্ত করা এবং স্পেশাল জজ আদালতে বিচারযোগ্য মামলাগুলো পরিচালনার জন্য কমিশনের অধীনে প্রয়োজনীয়সংখ্যক প্রসিকিউটর নিয়ে একটি স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিট থাকবে। একই ধারার ৩৩(৩) উপধারায় বলা হয়েছে, নিজস্ব প্রসিকিউটর নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত কমিশন অস্থায়ী ভিত্তিতে আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারবে। আইনে যেটিকে অন্তর্বর্তী বা সাময়িক ব্যবস্থা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেটিই গত দুই দশকে কার্যত স্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, দুদক অনুসন্ধান ও তদন্তে বিপুল জনবল এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আসার পর তথ্য সংগ্রহ, নথি বিশ্লেষণ, ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা, সম্পদের অনুসন্ধান, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং চার্জশিট দাখিল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু আদালতে মামলা পরিচালনার সময় সেই তদন্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়-এমন প্যানেলভুক্ত আইনজীবীদের ওপর নির্ভর করতে হয়।

দুদকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্নীতির মামলাগুলো সাধারণ ফৌজদারি মামলার মতো নয়। অর্থ পাচার, অবৈধ সম্পদ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ কিংবা ব্যাংক জালিয়াতির মতো অপরাধে আর্থিক নথি, হিসাব বিশ্লেষণ এবং জটিল তথ্যপ্রমাণ নিয়ে কাজ করতে হয়। এসব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা ছাড়া কার্যকর প্রসিকিউশন সম্ভব নয়। তাদের মতে, তদন্তকারী সংস্থা ও প্রসিকিউশনের মধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হওয়ায় আদালতে অনেক সময় মামলার শক্তি পুরোপুরি উপস্থাপিত হয় না।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দুদকের বর্তমান কাঠামোয় বিশেষ জজ আদালতগুলোয় ১০৩ সদস্যের এবং উচ্চ আদালতে ২৮ সদস্যের আইনজীবী প্যানেল রয়েছে। তারা চুক্তিভিত্তিকভাবে কমিশনের মামলা পরিচালনা করেন। ২০২৫ সালে বিশেষ জজ আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া ২৫৫টি দুদকের মামলার মধ্যে ১৩৪টিতে আসামিদের সাজা হয়েছে। সাজার হার প্রায় ৫২ শতাংশ। এছাড়াও গত কয়েক বছরের হিসাবে দেখা গেছে-দুদকের মামলায় সাজার হার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি নয়।

দুদকসংশ্লিষ্ট একাধিক সাবেক কর্মকর্তা জানান, অতীতে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্যানেল আইনজীবী নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্যানেল পুনর্গঠন কিংবা আইনজীবী পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটেছে। তাদের মতে, দুর্নীতি দমনের মতো সংবেদনশীল খাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার ও পূর্ণকালীন প্রসিকিউশনব্যবস্থা গড়ে না উঠলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের সাবেক এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, কিছু ক্ষেত্রে তদন্ত পর্যায়েই আসামিপক্ষের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে চার্জশিটে ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁকফোকর রাখা হয়। একইভাবে আদালতে মামলা পরিচালনার সময় প্রসিকিউশনের দায়িত্বে থাকা আইনজীবীর সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে মামলাকে দুর্বল করে ফেলা হয়। ফলে তদন্তে চিহ্নিত ও প্রমাণিত দুর্নীতিবাজরা শেষ পর্যন্ত খালাস পেয়ে যায়। তার ভাষায়, এটাই দুদকের অনেক মামলায় হেরে যাওয়ার গোপন রহস্য।

তিনি আরও বলেন, অনেকটা পাতানো ম্যাচের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। মামলা হেরে যাওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, তিনি তো চার্জশিট দিয়েছেন। আবার আইনজীবী বলেন, মামলায় জেতার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু চার্জশিটেই দুর্বলতা ছিল। এভাবে একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রই হারে আর জিতে যায় দুর্নীতিবাজরা।

৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসাবে দুদক সংস্কার কমিশনও গঠন করা হয়। কমিশনের সুপারিশে দুদকের স্বাধীনতা, জবাবদিহি এবং কার্যকারিতা বাড়ানোর নানা প্রস্তাব উঠে আসে। নতুন সরকার আসার পর নতুন সংসদে সংস্কার প্রস্তাবগুলো আর এগোয়নি। ফলে দুদকের বহু বছরের পুরোনো সমস্যাগুলোর মতো প্রসিকিউশন সংকটও রয়ে গেছে আগের অবস্থায়।

দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মঈদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, অস্থায়ী ব্যবস্থা বহাল থাকলে পছন্দের লোক নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ থাকে। নিয়োগে সেই প্রবণতাও দেখা যায়। অথচ দুদকের অনুসন্ধান, তদন্ত ও অভিযোগপত্র দাখিলের পুরো প্রক্রিয়ার সাফল্য শেষ পর্যন্ত প্রসিকিউশনের ওপর নির্ভর করে। আদালতে মামলাটি সঠিকভাবে উপস্থাপন করা, সাক্ষ্যপ্রমাণ যথাযথভাবে তুলে ধরা এবং বিচারককে আইনগতভাবে সন্তুষ্ট করা সম্ভব না হলে দীর্ঘ অনুসন্ধান ও তদন্তের সব শ্রমই ব্যর্থ হয়ে যাবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, দুদকের অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলা পরিচালনার পুরো প্রক্রিয়ার সাফল্য শেষ পর্যন্ত আদালতে প্রসিকিউশনের কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু কমিশনের জন্মলগ্ন থেকে কোনো কমিশনই এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেয়নি। ফলে দুদকে একটি স্থায়ী ও দক্ষ প্রসিকিউশন কাঠামো গড়ে ওঠেনি। তিনি বলেন, এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো কার্যকর, স্বাধীন ও সত্যিকারার্থে নিরপেক্ষ দুদক গড়ে তোলার মতো নেতৃত্বের অভাব।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমানে দুদকের কার্যক্রমে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তা জনমনে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে দুর্নীতিকে স্বাভাবিক বিষয় হিসাবে মেনে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দুর্নীতিবাজরাও এই বার্তা পেতে পারে যে তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। নতুন কমিশন গঠনের মাধ্যমে এ অবস্থার দ্রুত অবসান ঘটিয়ে দুদককে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। তিনি মনে করেন, দুদককে যতদিন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মুক্ত করা যাবে না, ততদিন প্রতিষ্ঠানটি কার্যত দুর্নীতি দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে না।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম