Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

হুংকারের বক্তব্যে খবরের শিরোনাম হতেন বেনজীর

Advertisement

Icon

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

হুংকারের বক্তব্যে খবরের শিরোনাম হতেন বেনজীর

Advertisement

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ছিলেন বেপরোয়া। ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন তিনি। গোপালগঞ্জে বাড়ি হওয়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। শেখ হাসিনাকে কখনো বলতেন আপা। কখনো নেত্রী। র‌্যাবের মহাপরিচালক, ডিএমডির কমিশনার ও পুলিশ বাহিনীর প্রধান-একাধারে এ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ তার মতো কেউ হাতিয়ে নিতে পারেনি। ক্ষমতা আর অর্থবিত্তের দম্ভে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কথা বলতেন ভয়ংকর আক্রমণাÍক ভঙ্গিতে। সম্মানবোধ দেখাতেন না কাউকে। দেশের আলেম সমাজকে বিনাশ করতে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ঐতিহাসিক সমাবেশে যত নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরেছে, যত আলেমের লাশ পড়েছে তার পেছনে ছিলেন এই বেনজীর। তিনি ‘শাপলা সাফ’ বলেও তিরস্কার করেছিলেন। দুবাইয়ে গ্রেফতার হওয়ার পর তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার প্রক্রিয়া চলছে।

এরই মধ্যে বেনজীরের হুংকার দেওয়া বেপরোয়া বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবার ভাইরাল। হেফাজতের আন্দোলন এবং বিরোধী দলের কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে এক বক্তৃতায় তিনি হুংকার দিয়ে বলেছিলেন, পুলিশের দিকে হাত বাড়ালে সেই হাত ভেঙে দেওয়া হবে, চোখ উপড়ে ফেলা হবে। এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, যারা সরকারের উন্নয়ন দেখতে পায় না, তাদের চোখের ডাক্তার দেখানো উচিত। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারির পর বেনজীর আহমেদ বলেছিলেন, অনেকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে লবিস্ট নিয়োগের মাধ্যমে এই নিষেধাজ্ঞা এনেছে। এগুলো লবিস্টদের খেলা। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই জাতিসংঘের এক সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখান থেকে ফিরে এসে দাম্ভিকতার সুরে বলেছিলেন, ‘অনেকে ভেবেছিল আমি যেতে পারব না। কিন্তু আমি গিয়েছি এবং ঘুরে এসেছি।’

বেনজীর আহমেদের বক্তব্যের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য দেখা গেছে দুর্নীতি নিয়ে তার দেওয়া তত্ত্বগুলোতে। আইজিপি থাকাকালীন তিনি পুলিশ বাহিনীকে দুর্নীতিমুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, পুলিশে কোনো দূষিত রক্ত রাখা হবে না। যারা দুর্নীতি করবে, তাদের বাহিনী ছেড়ে চলে যেতে হবে। অথচ পর্দার আড়ালে তিনি নিজেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে গড়ে তুলেছিলেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। অবসরে যাওয়ার পর বিভিন্ন টকশো এবং সাক্ষাৎকারে নিজেকে সৎ দাবি করে তিনি বলেছিলেন, ‘চাকরি জীবনে এক পয়সাও অন্যায়ভাবে উপার্জন করিনি।’ পরবর্তীতে জব্দ হওয়া তার শত শত বিঘা জমি, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও রিসোর্ট তার সেই বক্তব্যকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে।

২০২০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় এক সরকারি কর্মকর্তাদের সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, স্বাধীনতা, সংবিধান, রাষ্ট্র ও জাতিরজনক-নোবডি ক্যান টাচ দেম! (কেউ তাদের স্পর্শ করতে পারবে না)। আইজিপি থাকাকালীন বেনজীর আহমেদ বলেছিলেন, ‘নেভার আন্ডারস্টিমেট পাওয়ার অফ দি গভমেন্ট অ্যান্ড পাওয়ার অফ দি পিপল। জনগণের ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা যারা অবজ্ঞা করার দুঃসাহস দেখায় তারা আহাম্মক। রাষ্ট্রের কাছে ও জনগণের কাছে এই সমস্ত অপশক্তি কিছুই না। যে হাজার দুই এক লোক আস্ফালন দেখাচ্ছে, টোকায়ে নিয়ে আসব। আমরা বাড়িতে বাড়ি থেকে টোকা নিয়ে আসব। মাটির তলে ঢুকলে সেখান থেকে বের করে নিয়ে আসব।’

র‌্যাবের মহাপরিচালক থাকাকালীন বাংলাদেশে তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’ আলোচনা তুঙ্গে ওঠে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তীব্র আপত্তির মুখেও বেনজীর আহমেদ অত্যন্ত উগ্র ভাষায় এর জবাব দিতেন। র‌্যাব প্রধান হিসাবে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে দাবি করতেন, বাংলাদেশে কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয় না। তিনি বলতেন, ‘উই ডোন্ট কিল, উই জাস্ট রিটার্ন ফায়ার (আমরা হত্যা করি না, আমরা পাল্টা গুলি চালাই)।’ পরবর্তীতে বেরিয়ে এসেছে, কথিত এনকাউন্টারগুলোর বেশিরভাগই ছিল ভিন্নমত দমন এবং কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজির হাতিয়ার। ২০১৪ সালে ডিএমপি কমিশনার থাকাকালীন এক সংবাদ সম্মেলনে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি তাচ্ছিল্যের সুরে বলেছিলেন, ‘অপরাধীরা যখন অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করে, তখন পুলিশ কি পৈতা পরে বসে থাকবে? পুলিশ কি রসগোল্লা খাবে?’

২০২০ সালে আইজিপির দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশে কোনো দূষিত রক্ত রাখা হবে না বলে তিনি নবীন পুলিশদের সততার জিহাদ গড়ার ছবক দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে তিনি নিজের ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে গোপালগঞ্জে এক হাজার ৪০০ একরের ‘সাভানা ইকো রিসোর্ট’, সেন্ট মার্টিনে জোরপূর্বক জমি দখল, রাজধানীর গুলশানে আট হাজার ৬০০ বর্গফুটের আলিশান ফ্ল্যাট এবং দুবাই-সিঙ্গাপুরে স্বর্ণ ও হোটেলের সাম্রাজ্য গড়ে তুলছিলেন। এমনকি সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন করে নিজের আইডেন্টিটি লুকিয়ে সাধারণ ‘বেসরকারি চাকরিজীবী’ পরিচয়ে জালিয়াতি করে পাসপোর্ট তৈরি করেছিলেন।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পুলিশ বাহিনীর জন্য বিছানার চাদর ও বালিশের কভারের ডাইং (রং) পরিদর্শনের নামে তার জার্মানি সফরের সরকারি আদেশ (জিও) জারি হলে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা হয়। সে সময় নেটিজেনদের ক্ষোভের মুখে সফর বাতিল করতে বাধ্য হলেও তিনি গণমাধ্যমকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলেন।

২০২৪ সালে দেশ থেকে পালিয়ে যান বেনজীর। এরপরও তার দাম্ভিকতা কমেনি। তিনি নিজের দুর্নীতি ঢাকতে ফেসবুকে লাইভে এসে দাবি করেন, ‘আমার পরিবার ২০১৪ সাল থেকে মাছের খামার ও কৃষি কাজ করে এই সম্পদ বানিয়েছে, আমাদের কোনো অবৈধ টাকা নেই।’

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম