সাক্ষাৎকার: ইউজিসি চেয়ারম্যান
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবধান কমাতে হবে
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটলেও গুণগত মান, গবেষণা, কর্মসংস্থান উপযোগী দক্ষতা ও নৈতিকতাসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরির ক্ষেত্রে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এই সংকট মোকাবিলায় চাকরির বাজারের সঙ্গে শিক্ষার ব্যবধান কমানো, যুগোপযোগী কারিকুলাম সংস্কার ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আরও বেশি সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে একান্ত সাক্ষাৎকারে ইউজিসির নতুন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এসব কথা বলেন। তিনি দেশের উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা, মানহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, উপাচার্য নিয়োগে নৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্ব এবং ইউজিসিকে একটি শক্তিশালী ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন’-এ রূপান্তরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ নানা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যুগান্তরের স্টাফ রিপোর্টার হুমায়ুন কবির
যুগান্তর : উচ্চশিক্ষায় গুণগতমান ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য কী কী চ্যালেঞ্জ দেখছেন?
ড. মামুন আহমেদ : দেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটলেও কাঙ্ক্ষিত গুণগত মান নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চশিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ ও প্রত্যাশা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শিক্ষার্থীরা উন্নত শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে জীবনমানের পরিবর্তন চায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার মান এবং চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে এখনো বড় ধরনের ব্যবধান রয়ে গেছে। উচ্চশিক্ষার প্রধান সংকটগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার মান, কর্মসংস্থানযোগ্যতা ও শিল্প খাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্বল সংযোগ।
যুগান্তর : দেশে গ্র্যাজুয়েটদের চাকরির সুযোগ তৈরি করতে আপনার ভাবনা কী?
ড. মামুন আহমেদ : বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া অনেক গ্র্যাজুয়েট চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে শিক্ষা ও কর্মজীবনের মধ্যে একটি বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে তারা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক-উভয় শ্রমবাজারেই প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারে। কেবল দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা, দায়বদ্ধতা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চর্চাও নিশ্চিত করতে হবে। একজন শিক্ষার্থীকে শুধু চাকরির জন্য নয়, একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসাবেও গড়ে তুলতে হবে। উচ্চশিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য সেখানেই।
যুগান্তর : মানহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেবেন?
ড. মামুন আহমেদ : কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যদি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করে, তাহলে তাকে উৎসাহিত করা হবে। কিন্তু যদি কোনো প্রতিষ্ঠান কেবল সনদনির্ভর শিক্ষা বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত এবং সমস্যার ধরন অনুযায়ী সমাধানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পৃথক কমিটি গঠন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অনুমোদনহীন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবৈধ ব্রাঞ্চ ক্যাম্পাসের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
যুগান্তর : উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ও বরাদ্দ বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ আছে?
ড. মামুন আহমেদ : গবেষণার অর্থায়নের তিনটি প্রধান উৎস হলো সরকারি বরাদ্দ, আন্তর্জাতিক যৌথ গবেষণা এবং শিল্প খাতের সহায়তা। গত বছর গবেষণা খাতে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, যা চলতি বছরে বেড়ে ২২৬ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এ বরাদ্দ এখনো সীমিত। এক্ষেত্রে আরও বেশি জোর দেব।
যুগান্তর : শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে কী ভাবছেন?
ড. মামুন আহমেদ : উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক একাডেমিক সংস্কৃতির মধ্যে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দেব। আমরা চাই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা শুধু ক্লাসে সীমাবদ্ধ না থেকে গবেষণা, সহশিক্ষা কার্যক্রম, সামাজিক উদ্যোগ এবং জ্ঞানচর্চার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকুক।
যুগান্তর : বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র্যাংকিং বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ আছে কিনা?
ড. মামুন আহমেদ : হ্যাঁ, আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। আর গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা খাতে সরকারি সহায়তা আগের তুলনায় বেড়েছে। এখন প্রয়োজন সেই সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার। গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী উন্নয়ন ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য বরাদ্দের অর্থ যথাসময়ে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যয় হচ্ছে কিনা, সেটি নিশ্চিত করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাংকিং উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে।
যুগান্তর : বিদ্যমান পাঠ্যক্রম চাকরির বাজার উপযোগী কিনা?
ড. মামুন আহমেদ : বিদ্যমান পাঠ্যক্রম চাকরির বাজার ও বাস্তব জীবনের চাহিদার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নির্ধারিত সিলেবাস যথাযথভাবে অনুসরণ করছে কিনা, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে কারিকুলামে পরিবর্তন আনা হবে।
যুগান্তর : হল সংসদ নির্বাচন ও উপাচার্য নিয়োগ বিষয়ে কী ভাবনা?
ড. মামুন আহমেদ : হল সংসদ সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন ও বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হওয়ার বিষয়। এ ক্ষেত্রে ইউজিসির কোনো সরাসরি ভূমিকা নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকতে হবে। সেটি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে চর্চা করতে হবে।
যুগান্তর : উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের পক্ষে আপনার মতামত কী?
ড. মামুন আহমেদ : ভবিষ্যতে ইউজিসিকে আরও শক্তিশালী ও ক্ষমতাসম্পন্ন করে উচ্চশিক্ষা কমিশনে রূপান্তর করা গেলে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করা সম্ভব হবে। আমাদের উদ্দেশ্য অতীতের সীমাবদ্ধতা নিয়ে পড়ে থাকা নয়; বরং উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন, গবেষণা সম্প্রসারণ, কর্মমুখী শিক্ষা এবং মূল্যবোধসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

