Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

নতুন উচ্চতায় ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক

বাবার পথে হাঁটছেন প্রধানমন্ত্রী

Advertisement

Icon

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাবার পথে হাঁটছেন প্রধানমন্ত্রী

Advertisement

বিশ্বের উদীয়মান পরাশক্তি চীনের সঙ্গে বর্তমানে বাংলাদেশের সম্পর্ক যে কোনো সময়ের চেয়ে উচ্চতায় অবস্থান করছে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১৮ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া বাংলাদেশের শিল্প, অবকাঠামো এবং সেবা খাতে দেশটির বড় বিনিয়োগ রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এখন চীন সফরে রয়েছেন বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নির্বাচনের পর এটি প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় কোনো দেশ সফর। চার দিনের এই সফরে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করতে বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই চীনের সঙ্গে বিশ্বস্ত ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের শুরু হয়। আর বাবার পথ ধরেই হাঁটছেন পুত্র তারেক রহমান। তাদের মতে, কয়েকটি কারণে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জরুরি। প্রথমত, চীন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী। দ্বিতীয়ত, চীনের পররাষ্ট্রনীতি আধিপত্যবাদী নয়। তারা অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে না। তৃতীয়ত, সামরিক কৌশলগত কারণেও চীন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো দেশ বিরাগভাজন হলেও তাকে গুরুত্ব দেওয়া যাবে না।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ বুধবার যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে চীন বিশ্বে উদীয়মান শক্তি। অর্থনীতিতে প্রতিনিয়ত যেভাবে দেশটি শক্তিশালী হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে এই শতাব্দীতে তারা বিশ্বের শীর্ষ নেতৃত্বে অবস্থান করবে। এ ধরনের একটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত যৌক্তিক। দ্বিতীয়ত, চীনের পররাষ্ট্রনীতি আধিপত্যবাদী নয়। দেশটি কখনোই অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। তারা সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপন করে। তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে আমাদের বিদ্যমান সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী। বাংলাদেশের শিল্প, অবকাঠামো এবং সেবা খাতে তাদের বিনিয়োগ আছে। তারা বিশাল বাণিজ্য অংশীদার। ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, মনে রাখা দরকার গত এক বছরে বিশ্বের ২৬টি দেশের রাষ্ট্র অথবা সরকারপ্রধানরা চীন সফরে এসেছেন। এর মানে হলো বিশ্বের দেশগুলোর কাছে চীনের নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। এই ধরনের একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়ন জরুরি। তৃতীয়ত, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্কের উন্নয়ন না হলে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা কঠিন হবে। তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চীনকে অগ্রাধিকার দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করেছিলেন। ওই সময় দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমানের দুরদর্শী কৌশলে তা মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে। আগামীতেও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়লে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করা সহজ হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়লে তৃতীয় কোনো দেশ বিরাগভাজন হলেও এটিকে গুরুত্ব দেওয়া যাবে না। দেখতে হবে তাদের বিরাগভাজন হওয়ার কারণটা যৌক্তিক কিনা। আমরা আমাদের দেশের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেব। সেখানে কে কী মনে করল তাতে কিছুই আসে যায় না।

১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট চীন স্বাধীন বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। ওই বছরের ৪ অক্টোবর চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী এবং বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। অবকাঠামো, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সামরিক খাতে সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে। ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চীন সফর করেন, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত করে। প্রায় পাঁচ দশক আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে যে সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তা সময়ের পরিক্রমায় আরও গভীর ও বিস্তৃত হয়েছে। এখন সেই সম্পর্ক নতুন উচ্চতায়। জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি। তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের নীতি গ্রহণ করেন। চীনের সঙ্গে সম্পর্কও সেই বাস্তববাদী নীতির অংশ ছিল। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানিতে চীন বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর অধীনে বাংলাদেশে পদ্মা সেতু, রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মহাসড়ক নির্মাণসহ বড় বড় অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল। দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সফর অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় চীন সফর করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে সম্পর্কের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো বাণিজ্য ঘাটতি। চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানির উৎস। শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও মধ্যবর্তী পণ্যের বড় অংশ আসে চীন থেকে। অন্যদিকে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো সীমিত কয়েকটি পণ্যের মধ্যে আবদ্ধ। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, চীন বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থনীতি। দেশটির সঙ্গে আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর সময়োপযোগী এবং সঠিক সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আগেই আরও উন্নত করা উচিত ছিল। কিন্তু গত ১৫ বছর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ছিল একমুখী এবং এককেন্দ্রিক। ফলে আমরা দরকষাকষিতে অনেক পিছিয়ে ছিলাম। এ সময়ে বাংলাদেশ ভালো সুবিধা পায়নি। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, চীন ছাড়া আমাদের প্রকল্পগুলোতে ম্যাসিভ (ব্যাপকভাবে) আকারে অর্থায়ন কে করবে? অন্য কোনো দেশ অর্থায়ন করলেও দু-একটি প্রকল্পে করতে পারে। কিন্তু একাধিক প্রকল্পে অর্থায়ন মিলবে না। এসব বিবেচনায় চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বাড়াতেই হবে। তার মতে, চীন রপ্তানিতে ইতোমধ্যে আমাদের অনেক সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু আমরা তা কাজে লাগাতে পারিনি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চীনের বাজারে ঢুকতে হবে। আবু আহমেদ বলেন, চীনকে গুরুত্ব দিয়ে পলিসি তৈরি করার সময় এসেছে। কারণ এটি বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশ। ফলে এই বাজারকে আমাদের ধরতে হবে।

বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বুধবার যুগান্তরকে বলেন, অনেকে রাজনৈতিকভাবে অনেক কিছু বিবেচনা করেন। অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনা করলে এই মুহূর্তে আমাদের জন্য চীনের কোনো বিকল্প নেই। কারণ তারা যেসব পণ্য ও টেকনোলজি তৈরি করছে, যা মানুষের কাজে লাগে। তিনি বলেন, আমেরিকাও প্রযুক্তি তৈরি করছে। কিন্তু সেই প্রযুক্তি হয়তো যুদ্ধের কাজে বেশি ব্যবহৃত হয়। তারা যুদ্ধজাহাজ বানায়। বিপরীতে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার হয়, এমন সব ধরনের পণ্য বানায় চীন। বর্তমানে সারা পৃথিবী তাদের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি ভারতও তাদের কাছ থেকে পণ্য কিনছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ তার নিজেদের স্বার্থে যেখানে সুবিধা পাবে, তাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে; এটাই পররাষ্ট্রনীতির কৌশল হওয়া উচিত। দুঃখের বিষয় হলো কয়েক বছর আগে চীন বাংলাদেশের শতভাগ পণ্যে শুল্ক সুবিধা দিয়ে রেখেছে। কিন্তু সেই সুবিধা কাজে লাগাতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তার মতে, এখনো সময় আছে। তাই চীনের বাজার সুবিধা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম