Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

থামছে না সর্বনাশা মাদক-পর্ব ১

মূলহোতারা সব সময় অধরা

Advertisement

আরমান ভূঁইয়া

আরমান ভূঁইয়া

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মূলহোতারা সব সময় অধরা

ফাইল ছবি

Advertisement

রাজধানীর পল্লবী থানার দেওয়াল ঘেঁষে গড়ে ওঠা বস্তি ও ক্যাম্পগুলোতে দিনের আলোতেই চলছে মাদকের রমরমা বাণিজ্য। বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটায় প্রতিবেদক ক্রেতা সেজে সেখানে প্রবেশ করেন।

থানা থেকে মাত্র ১০০ গজ দক্ষিণে বৈদ্যুতিক দ্বিতীয় খুঁটি ধরে বস্তির ভেতরে কয়েকটি সরু গলি পেরিয়ে মাদকের খোঁজ করলে কয়েকজন যুবক একটি আধাপাকা ঘরের জানালার দিকে নির্দেশ করেন। সেখানে গিয়ে কয়েকবার ডাক দিতেই ভেতর থেকে জানতে চাওয়া হয়, ‘ইয়াবা নাকি গাঁজা?’ পরে ১০০ টাকার বিনিময়ে এক পুরিয়া গাঁজা ক্রয় করেন প্রতিবেদক। পরবর্তীতে তা পল্লবী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এভাবেই রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় চলছে মাদকের রমরমা বাণিজ্য। টাকা দিলেই অনায়াসে মিলছে গাঁজা বা ইয়াবার মতো মাদক। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতার সুযোগে সর্বনাশা মাদক যেন মহামারি আকার ধারণ করেছে।

দেশে বর্তমানে প্রায় ৮৩ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত; যার বড় অংশই তরুণ। গত পাঁচ বছরে সাড়ে চার লাখ মামলা এবং লাখো কারবারি গ্রেফতার হলেও মূলহোতা ও অর্থদাতারা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে এত অভিযান এবং বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দের পরও কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না এর আগ্রাসন। এমন অবস্থায় আজ আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস পালিত হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীতেই রয়েছে ৬ শতাধিক মাদকের স্পট। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অন্তত ২০ হাজার ব্যক্তি এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক প্রায় দেড় হাজার সন্ত্রাসী ও প্রভাবশালী। আর সারা দেশে মাদক কারবারে জড়িত প্রায় লক্ষাধিক মানুষ এবং প্রায় ১০ হাজারের বেশি লোক এতে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে।

স্থানীয়দের দাবি, মাদক কারবারিদের পেছনে রয়েছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী চক্র। ফলে কেউ প্রতিবাদ করলেই হামলা, ভয়ভীতি কিংবা মামলার শিকার হন। এ কারণে সবকিছু দেখেও তারা নীরব থাকতে বাধ্য হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসে উদ্বেগ : আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য-‘বিশ্ব মাদক সমস্যা : বিদ্যমান সংকট, নতুন চ্যালেঞ্জ ও উদ্ভাবনী প্রতিক্রিয়া।’ দিবসটি উপলক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কর্মসূচি থাকলেও বাস্তবতা হলো, দেশে মাদকের বিস্তার কমার পরিবর্তে আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে ইয়াবা, আইস, এলএসডিসহ বিভিন্ন সিনথেটিক মাদকের বিস্তার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক এখন আর কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।

অভিযান চললেও থামছে না মাদক : চলতি বছরের ১ মে থেকে সরকার দেশব্যাপী মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করে। গত এক মাসেই ঢাকাসহ সারা দেশে ৯ হাজার ৪৩ জন মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ৬ হাজার ৪৩৪টি। উদ্ধার হয়েছে গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য।

এর আগে ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্তও মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছিল। সে সময় কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ এবং ব্যাপক অভিযানের মাধ্যমে বহু গ্রেফতার হলেও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের নাম সামনে আসার পর অভিযানটি ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সেই সময় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তাদের অনেকেই এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

মাদকসেবী ৮৩ লাখ, সিংহভাগই তরুণ : মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ৮৩ লাখ। এদের বড় অংশই তরুণ ও যুবসমাজ। ৬১ শতাংশ মাদকসেবী গাঁজা ও ইয়াবায় আসক্ত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিপুলসংখ্যক মাদকসেবীই মাদক ব্যবসার সবচেয়ে বড় বাজার তৈরি করেছে। চাহিদা থাকায় সরবরাহও বাড়ছে। ফলে সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চালান দেশে প্রবেশ করছে। তাদের মতে, শুধু কারবারিদের গ্রেফতার করলেই হবে না; মাদকের চাহিদা কমানোর জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

পাঁচ বছরে মামলা সাড়ে চার লাখ : ডিএনসি, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪৭টি মাদক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৪৩৯ জনকে। শুধু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরই (ডিএনসি) এই সময়ে ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৬২টি মামলা করেছে এবং ১ লাখ ৩৩ হাজার ১৭৪ জনকে আসামি করেছে।

একই সময়ে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ২০ কোটি ৮৩ লাখ ৪০ হাজার ১৫ পিস ইয়াবা, ২ হাজার ১৪৯ কেজির বেশি হেরোইন, ১৬৩ কেজির বেশি কোকেন, ৫ লাখ ২৪ হাজার কেজির বেশি গাঁজা, ২৬ লাখের বেশি বোতল ফেনসিডিল এবং বিপুল পরিমাণ আইস, এলএসডি ও কেটামিন। তবুও বাজারে মাদকের সহজলভ্যতা কমেনি; বরং নতুন নতুন মাদকের বিস্তার বেড়েছে।

ডিএনসির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন : মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের জনবল, প্রযুক্তি ও লজিস্টিক সংকট রয়েছে। ডিএনসির প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক (অপারেশনস) মুকুল জ্যোতি চাকমা বলেন, মাদক সমস্যা কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি, তাই এর সমাধানও একমাত্র অভিযান দিয়ে সম্ভব নয়।

ভৌগোলিক অবস্থান, জনসচেতনতার ঘাটতি, বেকারত্ব, অতিরিক্ত নগরায়ণ, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং মাদকের ক্রমবর্ধমান চাহিদাসহ নানা বিষয় এ সংকটকে জটিল করে তুলেছে। তার মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, সচেতনতা বৃদ্ধি ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেই এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

সমাধান কোথায় : বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, বিমানবন্দর ও কুরিয়ার ব্যবস্থার কঠোর তদারকি, গডফাদার ও অর্থদাতাদের বিরুদ্ধে অভিযান, দ্রুত বিচার ও মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, মাদক ব্যবসার চাহিদা থাকায় এটি পুরোপুরি নির্মূল করা যাচ্ছে না। তার মতে, দুই-চার পুরিয়া গাঁজা বিক্রেতাকে গ্রেফতার করে সমস্যার সমাধান হবে না; বরং যারা আড়াল থেকে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে, অর্থায়ন করে এবং পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, তাদের আইনের আওতায় আনতে না পারাই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, মাদকের মহামারি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। বিশেষ করে খুচরা মাদক কারবারিদের চেয়ে এর পৃষ্ঠপোষণকারী, অর্থদাতা ও রাজনৈতিক সহকারীদের তালিকা করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম