Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

৩০ পৌরসভায় পানি সরবরাহ প্রকল্প

যোগসাজশে লুটপাট চোরে খাচ্ছে মিটার

Advertisement

আরমান হেকিম

আরমান হেকিম

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

যোগসাজশে লুটপাট চোরে খাচ্ছে মিটার

Advertisement

কোথাও পাইপলাইন বসেছে, কিন্তু পানি আসেনি। কোথাও মিটার বসানোর পর তা চুরি হয়ে গেছে। আবার কোথাও কাজ শেষ না করেই ঠিকাদার পেয়েছেন কোটি কোটি টাকার বিল। অনুমোদিত নকশার বাইরে ব্যয়, পরিমাপ ছাড়াই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেও কোনো জরিমানা না করা এবং পরামর্শক নিয়োগে যোগসাজশের অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছে দেশের ৩০টি পৌরসভায় বাস্তবায়নাধীন পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন উন্নয়ন প্রকল্প।

অডিট, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ, অডিট প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ে সুবিধাভোগীদের বক্তব্যে এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রায় এক হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)।

আইএমইডির এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি শুরু থেকেই নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে বারবার সতর্ক করা হলেও কার্যত কোনো পরিবর্তন হয়নি। এজন্য প্রকল্প পরিচালকও বদলি করা হয়। প্রকল্পের যেসব অনিয়মের অভিযোগ এসেছে সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যার সমাধান না হলে নিরাপদ পানি সরবরাহের মূল লক্ষ্যও পুরোপুরি অর্জিত হবে না।

অডিট প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রকল্পের কাজ শেষ না করলেও ঠিকাদারকে দুই দফায় ২৫ লাখ ৯৮ হাজার ৪৫০ টাকা ও ১ কোটি ২৬ লাখ ৮৪ হাজার ৭০০ টাকা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা না দিলেও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে ৬ কোটি ৬০ লাখ ৬৭ হাজার ৪৯৯ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

অডিটে আরও বলা হয়েছে, যোগসাজশের মাধ্যমে পরামর্শককে ৫২ লাখ ৮০ হাজার টাকার অনিয়মিত কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। আবাসিক প্রকৌশলীর পারিশ্রমিক কম দেখিয়ে ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও পাওয়া গেছে। সয়েল টেস্টের সুপারিশ ছাড়াই স্যান্ড কম্প্যাকশন পাইল স্থাপন দেখিয়ে সরকারের ২৪ লাখ ২৬ হাজার টাকার ক্ষতি করা হয়েছে। বিভিন্ন কাজে অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে ৭৩ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। কাজের পরিমাণপত্র অনুযায়ী প্রধান আইটেম ছাড়া শৌচাগার স্থাপনে অপচয় হয়েছে আরও ৭২ লাখ ৮২ হাজার টাকা। এছাড়া কোনো যৌক্তিকতা ছাড়াই ৬ কোটি ৯৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা অতিরিক্ত মূল্যে চুক্তি সম্পন্ন করার অভিযোগও তুলেছে অডিট।

এতেই শেষ নয়। ঠিকাদারের কাছ থেকে ২ কোটি ৩৩ লাখ ১ হাজার ২৫৪ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায়ের কথা থাকলেও তা করা হয়নি। ক্রয় সীমা লঙ্ঘন করে ৩২ লাখ ৭৮ হাজার ২৪৬ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জন্য অফিস সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র বিল পরিশোধের মাধ্যমে প্রকল্পের আরও ৭ লাখ ৪১ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে।

প্রকল্পের বিভিন্ন নির্মাণকাজে পরিমাপ ছাড়াই বিল পরিশোধের ঘটনাও ধরা পড়েছে। কাজ বুঝে না নিয়েই ৩৯ লাখ ৮০ হাজার ১৩২ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। পূর্ব-পরিমাপ ছাড়াই ভূমি ভরাটের জন্য দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৫৩ লাখ ৬২ হাজার ২৪১ টাকা। অনুমোদিত নকশা ছাড়াই এবং নন-টেন্ডার আইটেম হওয়া সত্ত্বেও মাটি ভরাটের জন্য ব্যয় করা হয়েছে আরও ১ কোটি ৩১ লাখ ৫৫ হাজার ৬০০ টাকা।

ক্রয় প্রক্রিয়াতেও রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। নন-রেসপনসিভ দরদাতাকে ১৮ কোটি ৮৩ লাখ ৫১ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি না করেই সিঙ্গেল সোর্স সিলেকশন পদ্ধতিতে উচ্চ দরে পরামর্শক নিয়োগের কারণে প্রকল্পের ৪৮ লাখ ৪০ হাজার ৪২৮ টাকার ক্ষতি হয়েছে। কাজের পরিধি কমিয়ে বেশি দামে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করায় ক্ষতি ১ কোটি ৯২ লাখ ৬৬ হাজার টাকার বেশি।

পিপিআর-২০০৮ অনুসারে ঠিকাদারের বিল থেকে জামানত কর্তন করার বিধান থাকলেও দুই দফায় মোট প্রায় ৪২ লাখ টাকা জামানত কাটা হয়নি। আবার ব্যাংক গ্যারান্টির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ১ কোটি ৬০ লাখ ৪ হাজার টাকার অগ্রিম সমন্বয় বা আদায় করা হয়নি। অনুমোদিত পরিমাণপত্র, ড্রয়িং ও ডিজাইনের বাইরে বিভিন্ন আইটেমে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও রয়েছে। শুধু ট্রান্সমিশন পাইপলাইনের ক্ষেত্রেই নকশার বাইরে ব্যয় হয়েছে ৫৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের চিত্রও সুখকর নয়। আইএমইডির নিবিড় পরিবীক্ষণে দেখা গেছে, অনেক পৌরসভায় পাইপলাইন ও মিটার বসানো হলেও এখনো পানি সরবরাহ শুরু হয়নি। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর পৌরসভার সুবিধাভোগীরা জানিয়েছেন, মিটার ও পাইপলাইন স্থাপন শেষ হলেও সংযোগ চালু হয়নি। ফলে তারা এখনো নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। টিউবওয়েল অচল হয়ে যাওয়ার পর বিকল্প উৎসও নেই অনেক এলাকায়।

কুমিল্লার হোমনা পৌরসভার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দিনে তিনবার পানি সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে দুবার বা তারও কম পানি দেওয়া হচ্ছে। মাঝে-মধ্যে পানি সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অনেক গ্রাহক নিয়মিত বিল দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন। প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, বহু এলাকায় পানির মিটার চুরি হয়ে গেছে। মিটার না থাকায় ব্যবহারভিত্তিক বিল নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পৌরসভাগুলো নির্দিষ্ট হারে বিল আদায় করছে। এতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

প্রকল্পের শক্তিশালী দিক হিসাবে উচ্চ জলাধার, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, পাইপলাইন এবং গভীর নলকূপ নির্মাণের কথা উল্লেখ করা হলেও দুর্বলতার তালিকাও দীর্ঘ। অনেক এলাকায় গেট ভালভ মানসম্মত নয়, মিটার সুরক্ষিত নয়, টুইন-পিট ল্যাট্রিনের নকশা অনুসরণ করা হয়নি এবং ফেকাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। এতে পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, পানি সরবরাহ এখনো শতভাগ কভারেজে পৌঁছায়নি। হাউজ কানেকশন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম। দক্ষ জনবল ও টেকনিশিয়ানের ঘাটতি রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম দুর্বল। অনেক এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।

স্থানীয় কর্মশালাগুলোতেও সুবিধাভোগীরা পানি সরবরাহের অনিয়ম, ঘোলা পানি, বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে পাম্প বন্ধ থাকা এবং সংযোগ বিলম্ব নিয়ে অভিযোগ করেছেন। নারায়ণগঞ্জের তারাব পৌরসভার একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, কয়েক বছর ধরে সংযোগ থাকলেও সম্প্রতি পানি সংকট তীব্র হয়েছে। কোথাও কয়েক দিন ধরে একেবারেই পানি পাওয়া যাচ্ছে না।

অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক সোহরাব উদ্দিনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে এসএমএস করলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম