ট্রাইব্যুনালে আ.লীগের বিচার দাবি সংসদে
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি জানিয়েছেন বিরোধী দলের সংসদ-সদস্যরা। সেই সঙ্গে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করারও দাবি জানানো হয়েছে। তাদের এই দাবির প্রেক্ষিতে সরকারি দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আত্মসমর্পণের সুযোগ পাবেন না। সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করে আইনের মুখোমুখি করা হবে। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও গণহত্যার বিচার’ প্রসঙ্গে এ আলোচনা হয়। এনসিপির সংসদ-সদস্য আখতার হোসেন জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি ৬৮ বিধি অনুসারে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য নোটিশ দেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে আমরা তাকে (শেখ হাসিনা) ফেরত চাই। আমরা চাই তিনি ফেরত আসুন এবং বিচারের মুখোমুখি হোন। আইনমন্ত্রী বলেছেন, তিনি এলে অ্যারেস্ট করা হবে এবং এজন্য যে তিনি কনভিক্টেড। সুতরাং তার আত্মসমর্পণের সুযোগ নেই। তিনি এলেই তাকে গ্রেফতার করা হবে, রায় কার্যকর করা হবে। যদি আপিলের কোনো সুযোগ থাকে সেটা অন্য কথা।
বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, আপনারা বলেছেন গণভোটের গণরায়কে শ্রদ্ধা করা দরকার। গণভোটের গণরায়কে শ্রদ্ধা জানাতে হলে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আপনাদের আসতে হবে। সেখানে আলোচনা করতে হবে। কিন্তু আপনারা ওয়াকআউট করলেন। সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে থাকতে চাইলেন না। সেটা ইতিহাস হয়ে থাকল। আমরা এ সংবিধান সংশোধন করতে চাই। সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংস্কার করতে চাই। আমরা রাষ্ট্র কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কার করতে চাই। ভবিষ্যতে যাতে এই দেশে কোনোদিন ফ্যাসিবাদের উৎপত্তি না হয় সেজন্য সংবিধান সংশোধন করতে চাই। তিনি বলেন, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর ৫ আগস্ট খুলে দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী সেটা উদ্বোধন করবেন। আহত জুলাই যোদ্ধাদের যদি বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন হয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সে ব্যবস্থা করা হবে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ইস্যুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কী হবে সেটা সরকারের একক কোনো দায়িত্ব নয়। আমরা সংসদে সংবিধান সংশোধন করে পররাষ্ট্রনীতি সংশোধন করে ঠিক করতে পারি। প্রতিবেশীকে কখনো পাল্টানো যায় না। কথায় আছে যে, আপনি আপনার স্ত্রী পাল্টাতে পারবেন। কিন্তু প্রতিবেশী তো আপনি পাল্টাতে পারবেন না। সুতরাং প্রতিবেশীর সঙ্গে কী সম্পর্ক হবে? দ্বিপাক্ষিক কি সম্পর্ক হবে? বাণিজ্যের কি সম্পর্ক হবে? আগেই বলেছি সবার আগে বাংলাদেশ-এই নীতিতেই আমরা আছি।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, জুলাই চেতনায় বিশ্বাসীদের মধ্যে বিভেদের সুর দেখে দিল্লিতে বসে হুংকার দেওয়া হচ্ছে। বিভেদের সুর দেখে দিল্লিতে বসে বলছে, আত্মসমর্পণ করবেন। যারা আত্মসমর্পণ করার হুংকার দিচ্ছেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে তাদের আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ থাকবে না। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বাংলাদেশের সীমানায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার হবেন। এটা সরকারের অঙ্গীকার। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৬টি তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তার মধ্যে ১২টি তদন্ত রিপোর্ট জমা হয়েছে। ইতোমধ্যে চারটি চার্জ ফ্রেম হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনটি মামলার রায় হয়েছে। ইতোমধ্যেই শাপলা চত্বরের সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের তদন্ত শুরু হয়েছে। সংগঠন হিসাবে আওয়ামী লীগের তদন্ত শুরু হয়েছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডে জেলায় জেলায় তদন্ত কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই ছিল ফলাফলের সময়। কিন্তু তার ক্ষেত্র তো সাড়ে ১৬ বছর। এই সময়ে যারা গুম, খুন, পঙ্গু হয়েছেন তাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না। এটা নিজের আত্মার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে। জুলাই যোদ্ধাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের দাবি জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, বিচারের ব্যাপারে কোনো গড়িমসি জাতি সহ্য করবে না। এই ক্ষমা বহন করার শক্তি জাতির নেই। বিচার হতেই হবে, তবে বিচারটা যেন ন্যায় বিচার হয়। তিনি বলেন, গণভোটে জনগণ ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছিল। কী হয়ে গেল আমরা ঠিক বুঝতে পারিনি। বারবার বলা হচ্ছে এখানে প্রতারণা করা হয়েছে। কে করল?
বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, ‘সবাই নয়, তবে বেশির ভাগ মিডিয়া স্বৈরাচারকে ভয়ংকর স্বৈরাচার হতে সাহায্য করেছে। তাদের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে সেটা তিনি বুঝতে পারছেন না। তারা এখন আবার পানি ঘোলা করার জন্য ময়দানে নেমে পড়েছে। সরকার এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে না। তিনি বলেন, কোন শক্তির বলে তারা এটা করে আমরা জানতে চাই সরকারের কাছে। তাদের ব্যাপারে দুর্বলতাটা কোথায়?’
আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, যেই দল ইতিহাসে দুই দুইবার সুযোগ পেয়ে এ দেশে গণহত্যা করেছে, গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে এবং সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে, লুটপাট করেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত-তার বিচার করতে হবে। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, আজ দুঃখ লাগে যখন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আমাদের শরিক প্রধান স্টেকহোল্ডার সরকারদলীয় কিছু কিছু সদস্য গণ-অভুত্থানের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। সরকারদলীয় এক এমপির টকশোতে দেওয়া বক্তব্যের প্রতি উদ্দেশ করে তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা মারা গিয়েছেন এবং তাদের সঙ্গে পুলিশি হত্যাকাণ্ডের তুলনা করা হয়। এই বয়ানটা আওয়ামী লীগের বয়ান। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্যাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউরকে সরিয়ে দেওয়ার কথা তুলে ধরে নাহিদ বলেন, নতুন করে কোনো মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া বর্তমান প্রসিকিউশন এগিয়ে নিতে পারেননি। প্রসিকিউশন টিমে দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ এবং ট্রাইবুনাল বাড়ানো নিয়ে সরকারের কী পরিকল্পনা তা তিনি জানতে চান।
জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যা নির্যাতনের কথা তুলে ধরে আখতার হোসেন বলেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে। আওয়ামী লীগ যতই অস্বীকার করার চেষ্টা করুক না কেন তারা এটা মিথ্যা প্রমাণিত করতে পারবে না। তিনি বলেন, এই সংসদেও এমন দুই একজন সরকারি দলের সংসদ-সদস্য আছেন যারা আওয়ামী লীগের বয়ানে বক্তব্য দেয়। তিনি বলেন, জুলাইয়ে যাদের হত্যা করা হয়েছিল, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছিল তাদের শাস্তি এখনো কার্যকর হয়নি। এখনো পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে এসে বিচারের রায় কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। তিনি অবিলম্বে শেখ হাসিনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি কার্যকর করার দাবি জানান। অবিলম্বে দল হিসাবে আওয়ামী লীগেরর বিচার কার্যকর করার সব ধরনের পদক্ষেপ সরকারকে গ্রহণ করতে হবে।
গণঅধিকার পরিষদের সংসদ-সদস্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য কীভাবে বিতর্কিত একটি নির্বাচন করেছিল ওয়ান ইলেভেনের সরকার। প্রধানমন্ত্রীসহ সবার কাছে অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিচার নিষ্পত্তির প্রশ্নে ঐকমত্য হতে হবে। ভবিষ্যতে যেন কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তি ক্ষমতায় না আসতে পারে, গণবিরোধী অবস্থান নিয়ে গুন-খুন হত্যাযজ্ঞ না চালাতে পারে, তার জন্য রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিচার করতে হবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের প্রশ্নে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কী হবে এই বিষয়ে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের একটি নীতিগত সমঝোতা রাষ্ট্রের স্বার্থে প্রয়োজন। অন্যদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ-সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম ও রোকেয়া বেগম আলোচনায় অংশ নেন।
