শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, দুর্ভোগ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
তিন দফা দাবিতে মঙ্গলবার ব্যারিকেড ভেঙে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশের লাঠিপেটা -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে সারা দেশে চরম দুর্ভোগে পড়েন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। এরই মধ্যে চলছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে অনেক এলাকায় ঘর থেকেও বের হওয়া কঠিন ছিল। এমন বাস্তবতায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা সোমবারের পরীক্ষা পেছানোর দাবি করেছিলেন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় মন্ত্রণালয় তাদের দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এতে অনেক শিক্ষার্থী বিপাকে পড়ে। বৈরী আবহাওয়ায় এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা গ্রহণ এবং প্রশ্নপত্রের ত্রুটির অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবিতে মঙ্গলবার সকাল থেকে দিনভর ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। তারা মন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৮ দাবি জানায়। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে মন্ত্রীর পদত্যাগ এবং ‘অসংগতিপূর্ণ’ বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাওয়ার আলটিমেটাম দেয়। পরে মিছিলসহ জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় গিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। একপর্যায়ে তারা সংসদের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পালটা ধাওয়া হয়। পুলিশ লাঠিপেটা করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়। রাতে জাতীয় সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী। এদিকে মঙ্গলবার সকাল থেকে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলনের কারণে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। এতে করে চরম ভোগান্তিতে পড়েন অ্যাম্বুলেন্স ও বিদেশগামী যাত্রীসহ নগরবাসী। এমন পরিস্থিতিতে অনেককে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে।
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ঢুকে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা ইন্ধন দিয়ে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সংক্রান্ত কিছু ভিডিও ও পোস্টও ছড়িয়ে পড়ে।
তিন দফা দাবি আদায় না হলে আজ বুধবার পরীক্ষা শেষে ‘লং মার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচির পালনের ঘোষণা দেয় শিক্ষার্থীরা। রাত ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে প্রথম দিনের মতো অবরোধ কর্মসূচি সমাপ্তি শেষে সিটি কলেজের শিক্ষার্থী মিরাজ আন্দোলনকারীদের পক্ষে নতুন এই কর্মসূচির কথা জানান।
ঘটনা যেভাবে বিস্তার ঘটে : সরেজমিন দেখা গেছে, সকাল ১০টার পর রাজধানীর বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্সল্যাব মোড়ে জড়ো হতে শুরু করে। একইসময়ে উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে জড়ো হয় আশপাশের কলেজের শিক্ষার্থীরা। বেলা সাড়ে ১১টার পর তারা সায়েন্সল্যাব মোড় বন্ধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। ঢাকা সিটি কলেজ, ঢাকা আইডিয়াল কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, লালমাটিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বিএফ শাহীন কলেজসহ ১২-১৫টি কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করে। এ সময় তারা শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ দাবি করে। তারা ‘একদফা এক দাবি, মিলনের পদত্যাগ; আমি কে তুমি কে, ফার্মের মুরগি, ফার্মের মুরগি; এক দুই তিন চার, মিলন তুই গদি ছাড়, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’-এ ধরনের স্লোগান দেয়। দুপুরের দিকে শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যায়। দুপুর সোয়া ১টার দিকে ভিসি চত্বরের সামনে থেকে পুলিশ তাদের সরিয়ে দিতে চেষ্টা করলে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে তারা নীলক্ষেত থেকে টিএসসিগামী সড়কে গিয়ে অবস্থান নিয়ে নানা স্লোগান দেয়। সেখান থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে পলাশী হয়ে বকশিবাজারে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে গিয়ে অবস্থান নেয়। সেখানে তারা বিভিন্ন স্লোগান দেয়। কিছু শিক্ষার্থী শিক্ষা বোর্ডের ভেতরে ইট ছোড়ে ও গেটে ধাক্কাধাক্কি করে। তখন পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। বেলা সোয়া ৩টা পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করে ফের সায়েন্সল্যাবে এসে অবস্থান নেয়। বিকাল পৌনে ৪টা পর্যন্ত সায়েন্সল্যাবে অবস্থান শেষে জাতীয় সংসদ ভবনের দিকে রওয়ানা দেয়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে জাতীয় সংসদ অধিবেশন চলার সময় ভবনের সামনে অবস্থান নেয় তারা।
সরেজমিন দেখা যায়, প্রথমে পুলিশ শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের চেষ্টা করে। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাসে ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের প্রধান ফটক থেকে আসাদ গেট পর্যন্ত নিয়ে যায়।
যেভাবে সূত্রপাত : সোমবার ‘শিক্ষার্থী ঐক্য’ নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে আন্দোলনের ঘোষণা দেয় শিক্ষার্থীরা। এর অংশ হিসাবে মঙ্গলবার সকাল থেকে সায়েন্সল্যাব মোড়, শাহবাগ, উত্তরা ও মিরপুরসহ কয়েকটি স্থানে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয় ঢাকার বিভিন্ন কলেজের পরীক্ষার্থীরা। এ ছাড়া রাজশাহী, বরিশাল, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সামনে এবং সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, রংপুর জিলা স্কুলসহ সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
সায়েন্সল্যাবে আন্দোলনকারী বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল নোমান জানায়, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশ বাধা দিয়েছে ও হামলা করেছে। এতে অনেকে আহত হয়েছে। দাবি না মানলে আগামীকালও (আজ) আন্দোলন চলবে। শিক্ষার্থীরা আরও জানায়, তারা মোট আট দফা দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-শিক্ষামন্ত্রীকে নিজের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে; পরীক্ষা নিয়ে কোনো ধরনের ‘গবেষণা’ বন্ধ করতে হবে; দেশের পরিস্থিতি ও পরীক্ষা কেন্দ্র উপযোগী না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত রাখতে হবে। এছাড়া পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্রের প্রশ্নপত্রে ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুলের জন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের নম্বর দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে তারা। তাদের আট দফা দাবির মধ্যে প্রধান তিনটি দাবি হলো-শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং অসংগতিপূর্ণ কথাবার্তার জন্য ক্ষমা চাওয়া, ১৩ জুলাইর পদার্থ বিজ্ঞান পরীক্ষা পুনরায় নেওয়া এবং ১৫ জুলাইয়ের পরীক্ষা স্থগিত ও নতুন রুটিন প্রকাশ।
শিক্ষার্থীদের অবরোধে যানজটে স্থবির ঢাকা : রাজধানীতে সড়ক অবরোধের কারণে দিনের বেশির ভাগ সময় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে উত্তরা, বিমানবন্দর সড়ক, ইসিবি চত্বর, সায়েন্সল্যাব ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে। অনেক যাত্রীকে ব্যাগ-লাগেজ নিয়ে হেঁটে বিমানবন্দরের উদ্দেশে যেতে দেখা যায়। কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্সও দীর্ঘ সময় যানজটে আটকা পড়ে। এতে সাধারণ যাত্রী, রোগী ও বিদেশগামীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়।
অন্যদিকে দীর্ঘ সময় সড়ক অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভও দেখা যায়। অনেকেই বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবির যৌক্তিকতা থাকলেও সড়ক অবরোধের ফলে জরুরি সেবাসহ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। তাদের মতে, দাবি আদায়ে এমন কর্মসূচি নেওয়া উচিত, যাতে জনভোগান্তি কম হয়।
ট্রাফিক পুলিশের বক্তব্য : সার্বিক অবস্থা জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান রাত সোয়া ৯টার দিকে যুগান্তরকে জানান, দিনভর রাজধানীর অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। সড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বন্ধ করে আন্দোলন করায় তীব্র যানজট তৈরি হয়। এখনো উত্তরা, মানিক মিয়া এভিনিউতে শিক্ষার্থীরা অবস্থান করছে। তাদের রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার জন্য বোঝানো হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
‘লং মার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচি ঘোষণা : ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষার্থী মিরাজ গণমাধ্যম ও উপস্থিত সবার উদ্দেশে চূড়ান্ত আলটিমেটাম দিয়ে বলেন, ‘আজকে (মঙ্গলবার) রাতের মধ্যে যদি আমাদের পরীক্ষা স্থগিত করা না হয়, তাহলে কাল (আজ বুধবার) আমাদের ‘লং মার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে।’ তিনি আরও বলেন, বুধবারের পরীক্ষায় আমরা সবাই অংশ নেব। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বিকাল ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই ‘লং মার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। একই সঙ্গে তিনি সবাইকে বুধবারের এই কর্মসূচি সফল করতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। শেরে বাংলা নগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, শিক্ষার্থীরা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে সংসদ ভবন এলাকা ছেড়ে চলে যায়। পরে যান চলাচল পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে থাকে।
চার শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ : এদিকে এইচএসসি পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) বিষয়ের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। ওই দুটি প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে। মঙ্গলবার প্রশ্নপত্র মডারেশনের (পরিশোধন) দায়িত্বে থাকা চারজন শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এই শিক্ষকরা সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীন। সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াছমীন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।
চট্টগ্রামের ৫ জেলা ছাড়া সারা দেশে পরীক্ষা চলবে আজ : চট্টগ্রামের ৫ জেলা ছাড়া সারা দেশে পরীক্ষা চলবে বলে জানিয়েছেন আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। সোমবার সকাল ১০টায় সব শিক্ষা বোর্ড ও জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। বৈঠকে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রীও।
