Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিরোধ দিবস’ আজ

আন্দোলনের মোড় ঘোরায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

রক্তাক্ত জুলাই

Advertisement

হুমায়ুন কবির

হুমায়ুন কবির

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আন্দোলনের মোড় ঘোরায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

ফাইল ছবি

Advertisement

জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো খালি করে দেওয়ার পর যখন আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়, তখনই ঢাকার রাজপথ দখলে নিয়ে আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেন তারা। গুলি, টিয়ারশেল, হামলা ও গণমামলা উপেক্ষা করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই সাহসী অংশগ্রহণই মূলত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে একটি সর্বজনীন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ দেয়। ঐতিহাসিক সেই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আজ ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হচ্ছে।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক আব্দুল হান্নান চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তারা রাজপথে নেমে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন। তাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আন্দোলনকে আরও বেগবান ও অর্থবহ করে তুলেছিল।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইতিহাসে কোনো আন্দোলনের শক্তি কেবল নেতৃত্ব দিয়ে নয়। সংকট মুহূর্তে কে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল-সেই প্রশ্ন দিয়েও বিচার করা হয়। জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী যে সাহস, ত্যাগ ও প্রতিরোধের নজির স্থাপন করেছিল, তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের শুরুতে সরকারি চাকরিতে যৌক্তিক কোটা সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলনের সূচনা হয়, সেটি প্রথম দিকে মূলত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দি ক ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সরকারি চাকরির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত না হলেও তারা আন্দোলনে যুক্ত হন ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও সহপাঠীদের প্রতি সংহতির জায়গা থেকে। আন্দোলনের এই নৈতিক অবস্থানই তাদের অংশগ্রহণকে ব্যতিক্রমী করে তোলে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ব্যক্তিগতভাবে অনেক শিক্ষার্থী আগেই আন্দোলনে যুক্ত হলেও ১০ জুলাই রাজধানীর রামপুরায় প্রথমবারের মতো সম্মিলিতভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যানারে বড় কর্মসূচি পালন করা হয়। এরপর ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৪ জুলাই ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়। এর পরদিন ১৫ জুলাই ছিল রাজধানীজুড়ে তাদের শক্ত অবস্থান। এদিন সকাল থেকেই ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ), ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্স (ইউআইটিএস), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি) ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা রাজধানীর নতুন বাজার, রামপুরা ও যমুনা ফিউচার পার্ক এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ে। পরে আশপাশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দেন।

১৬ জুলাই নতুন বাজার এলাকায় ইউআইইউগামী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র পরীক্ষা করে হেনস্তা ও মারধরের অভিযোগও সামনে আসে। কিন্তু হামলার মুখেও আন্দোলন থেমে থাকেনি। নতুন বাজার, রামপুরা, যমুনা ফিউচার পার্ক এলাকা, ধানমন্ডি ও উত্তরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা অবস্থান ধরে রাখেন। উত্তরায় নর্দান ইউনিভার্সিটি, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি, উত্তরা ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যোগ দেন। ধানমন্ডিতে ইউল্যাবসহ একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৭ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হল খালি করে দেওয়া হলে সরকার মনে করেছিল আন্দোলনের কেন্দ ভেঙে পড়েছে। কিন্তু ১৮ জুলাইয়ের সকালেই সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা, বনশ্রী, উত্তরা, নতুন বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজারো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসেন। দিনভর বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। রামপুরায় ইস্ট ওয়েস্ট ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংঘর্ষ সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করে। বহু শিক্ষার্থী এ সময় আহত হন।

১৯ জুলাই ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর একটি। জুমার নামাজের পর রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হেলিকপ্টার থেকেও গুলি চালানো হয়। ওই দিনের ঘটনায় বহু হতাহত হওয়ার দাবি ওঠে। এই পরিস্থিতি রাজধানীর মেরাদিয়া, বনশ্রী ও আশপাশের এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে আন্দোলন আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্থানীয় বাসিন্দারাও বিভিন্ন স্থানে তাদের সঙ্গে যোগ দেন। রাজধানীর বাড্ডা, গুলশান ও ভাটারাসহ বিভিন্ন থানায় হাজার হাজার অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করা হয়। এসব এলাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ মামলার মুখে পড়েন। অনেককে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। গণ-অভ্যুত্থানের পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদান নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চললেও তাদের প্রত্যাশিত মূল্যায়ন হয়নি-এমন অভিযোগ ছিল আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকের। পরে সরকারের পক্ষ থেকে ১৮ জুলাইকে ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিরোধ দিবস’ হিসাবে পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসিবুল হোসেন শান্ত বলেন, জুলাই গণ-আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট। শুরুতে এটি কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামার পর আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আন্দোলন একটি সর্বজনীন গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তাদের অবদান অবশ্যই যথাযথভাবে মূল্যায়িত হবে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম