Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

সংযোগ ফি দিয়ে অপেক্ষায় ৫৫০ শিল্পপ্রতিষ্ঠান

গ্যাসের নতুন সংযোগ বন্ধ বিপদে শিল্পমালিকরা

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গ্যাসের নতুন সংযোগ বন্ধ বিপদে শিল্পমালিকরা

Advertisement

হঠাৎ করে দেশের সব ধরনের শিল্পকারখানায় গ্যাসের নতুন সংযোগ বন্ধ করেছে সরকার। গত সপ্তাহে জ্বালানি বিভাগ থেকে চিঠি দিয়ে দেশের সব বিতরণ কোম্পানিকে এ ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে বলা হয়েছে, দেশের গ্যাস ফিল্ডগুলোতে উৎপাদন কমছে। অন্যদিকে, দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সীমাবদ্ধতা আছে। এসব কারণে শিল্পে নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে না বলে চিঠিতে বলা হয়। সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে চরম উৎকণ্ঠায় পড়েছেন শিল্পমালিকরা-বিশেষ করে যারা ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে গ্যাস সংযোগের জন্য অপেক্ষা করছেন।

জানা গেছে, উত্তরবঙ্গের দুটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান-কিএমএসএস এবং স্কয়ারের একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য গ্যাস সংযোগ দিতে জ্বালানি বিভাগের অনুমতি চেয়ে চিঠি দেয় পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস বিতরণ কোম্পানি। এর জবাবে ১৪ জুলাই জ্বালানি বিভাগের উপসচিব মুহাম্মদ নাজমুল হক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, দেশের নতুন শিল্প গ্রাহককে গ্যাস সংযোগ দেওয়া যাবে না। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এই নির্দেশনা শিল্পে গ্যাস সংযোগের জন্য প্রতিশ্রুত সব ধরনের আবেদনকারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ যারা ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে বসে আছেন তাদেরও আপাতত গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে না। যদিও জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মুনির হোসেন চৌধুরী রোববার যুগান্তরকে বলেছেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত সাময়িক। বিদেশ থেকে আরও বেশি করে এলএনজি আমদানি বা দেশে বড় কোনো ক্ষেত্র আবিষ্কার হলে শিল্পে আবার গ্যাস দেওয়া হবে।

বিনিয়োগকারী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়া জ্বালানি বিভাগের এ সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতি ও শিল্পায়নের জন্য বড় ধরনের আঘাত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, এ জাতীয় সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিকে ধংস করে ফেলবে। বিশেষ করে বর্তমান সরকার ৫ বছরে যেখানে ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণা দিয়েছে, সেখানে শিল্পে গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত দেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়ার শামিল।

দেশের ৬টি বিতরণ কোম্পানিতে নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন জমা হয়ে আছে ১ হাজার ৮৫৭টি। এর মধ্যে নতুন সংযোগের টাকা জমা দিয়ে বসে আছে ৫৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। শুধু তাই নয়, এই ৫৫০টি প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করে বিপাকে পড়েছেন শিল্পমালিকরা। তারা মাসে মাসে ব্যাংকের সুদ দিচ্ছেন। কিন্তু গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানা চালাতে পারছেন না।

চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আমিরুল হক রোববার যুগান্তরকে বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। সরকারের উচিত যারা ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়েছেন জরুরি ভিত্তিতে তাদের গ্যাস সংযোগ দেওয়া। কারণ তারা ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে শিল্পকারখানার অবকাঠামো বসিয়ে ফেলেছেন। এখন গ্যাস না পেলে তারা পথে বসে যাবেন। তিনি বলেন, ১০ টাকার গ্যাসের দাম সরকার ৩০ টাকা করেছে। তারপরও গ্যাস না পেলে দেশ এগোবে কীভাবে।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জালালাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানি এলাকায় ১৭টি শিল্পকারখানা এবং ক্যাপটিভ গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হয়। এটি ছিল শিল্পে সর্বশেষ গ্যাস সংযোগ। এ তালিকায় সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিনের পারিবারিক আকিজ গ্রুপের শিল্পপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। যদিও অন্য বড় শিল্প গ্রুপ এ সুবিধার আওতায় আসেনি তখন।

হবিগঞ্জ এলাকায় হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বছরের পর বছর অপেক্ষা করছে দেশের বৃহত্তর শিল্পপ্রতিষ্ঠান। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক জানিয়েছেন, ব্যাংকের ঋণ নিয়ে হবিগঞ্জে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। এখন গ্যাস সংযোগ না পেয়ে বাধ্য হয়ে দিনে ৩ লাখ টাকার এলপিজি কিনে ওই শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু রাখার চেষ্টা করছেন। এতে করে প্রতিদিন কোম্পানির লোকসানের বোঝা বাড়ছেই। তিনি বলেন, বিদেশি ক্রেতা ধরে রাখতে লোকসান দিয়ে ফ্যাক্টরি চালু রেখেছেন। গ্যাস সংযোগের জন্য কয়েক বছর আগে টাকা জমা দিয়েছেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এভাবে লোকসান দিয়ে কতদিন কারখানা চালানো যাবে জানি না। তার জিজ্ঞাসা-এ দেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠান করা কি অপরাধ? না হলে টাকা নিয়েও কেন গ্যাসের সংযোগ পাচ্ছি না। তিনি বলেন, গ্যাস সংযোগের নিশ্চয়তা পেয়ে ব্যাংকের ঋণ নিয়ে শিল্পকারখানা বসানো হয়েছে। এখন বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্যাস সংযোগ দিচ্ছে না। ব্যাংকের ঋণের কিস্তি কি সরকার দেবে?

মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল সম্প্রতি যুগান্তরকে বলেছেন, গ্যাসের অভাবে ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠান বসে আছে তার। অথচ ওই কারখানায় গ্যাস সংযোগ দিতে সরকারি বিতরণ কোম্পানিগুলোকে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। বিতরণ কোম্পানিগুলো নিশ্চিত করেছে তার ফ্যাক্টরিগুলোতে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উলটো।

একই অভিযোগ টিকে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দারের। তিনি বলেন, গ্যাসের অভাবে তার ৩ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে আছে। গ্যাসের জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান চালু করতে পারছেন না। এখন ব্যাংকের ঋণ নিয়ে বিপাকে আছেন। তিনি বলেন, শিল্পের গ্যাস সংযোগ না দিলে দেশের বড় ধরনের ক্ষতি হবে। নতুন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি কঠিন হয়ে যাবে।

ডুবছে পুরো শিল্প খাত, নজর নেই সরকারের : দেশে গ্যাসনির্ভর কমপক্ষে ৬ হাজারের বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতেই আছে ৫ হাজার ৬৭৩টি। জানা গেছে, দেশে গ্যাসের উৎপাদন এবং সরবরাহ দিন দিন কমছে। এ কারণে গ্যাস সংকটে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, টাঙ্গাইল, নরসিংদীসহ বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান অর্ধেক উৎপাদনে নেমেছে। কোনো কোনোটি একবারে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। গ্যাসের কারণে সবচেয়ে বড় বিপাকে আছে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। এমন একটি প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ এআরের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। ওই প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজার নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দেশের অন্যতম বৃহৎ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ। এই বৃহৎ ফ্যাক্টরি গ্যাসের অভাবে এখন ডুবতে বসেছে। গ্যাস না থাকায় ক্যাপটিভ এবং বয়েলার চালানো যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে ফ্যাক্টরি চালানোর জন্য দৈনিক ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার ডিজেল কিনতে হচ্ছে। এভাবে শুধু ডিজেল কিনে জুনেই স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ বিল দিয়েছে ৫ কোটি ২২ লাখ টাকা। এই একটি ফ্যাক্টরিতেই কাজ করেন ২৩ হাজার শ্রমিক। গ্যাসের অভাবে বাধ্য হয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অনেক কষ্টে ফ্যাক্টরি চালু রাখতে হচ্ছে। কত দিন এইভাবে চলবে-প্রশ্ন রাখেন নজরুল ইসলাম।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে গ্যাসের উৎপাদন প্রতিবছরই কমছে। গত বছর দৈনিক ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও এখন দেওয়া হচ্ছে ২৬০ কোটি ঘনফুট। এতে বিতরণের পাইপলাইনের শেষ প্রান্তের কারখানাগুলো দিন দিন গ্যাস শূন্য হয়ে পড়ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০২১ সালে শিল্পে গ্যাস দেওয়া হয় ৪ হাজার ৩৩০ মিলিয়ন কিউবিক মিটার। সেখানে ২০২৫ সালে দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৭৩৭ মিলিয়ন কিউবিক মিটার। ক্যাপটিভ জেনারেটরেও একইভাবে গ্যাসের সরবরাহ কমানো হয়েছে। অথচ ঢাকার বাইরে এখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে ডুবে থাকে। বিদ্যুতের কারণেও অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঠিকমতো উৎপাদন করতে পারে না।

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, আগামী বছরে গ্যাসের সরবরাহ ২৫৫ কোটিতে নেমে আসতে পারে। এর অন্যতম কারণ স্থানীয় ক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন প্রতিবছর কমে যাওয়া। পেট্রোবাংলার হিসাবে, প্রতিবছর দেড় কোটি ঘনফুট করে গ্যাসের উৎপাদন কমছে।

এদিকে, আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বসিয়ে গ্যাস আমদানির ব্যাপারে বর্তমান সরকার গত ৫ মাসেও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। দেশে এখন গ্যাসের চাহিদা আছে দৈনিক ৪০০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ দিচ্ছে চাহিদার অনেক কম ২৬০ কোটি ঘনফুট।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম