সিলেটে আরও ৫ টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা
বড় বিনিয়োগ প্রস্তাব শেভরনের
Advertisement
শাহেদ সিদ্দিকী
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সিলেটে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন করে কাঠামোগত চুক্তি (ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট) করার প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন কোম্পানি শেভরন। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা চুক্তির (এমওইউ) আওতায় শেভরনের প্রেসিডেন্ট এরিক এম ওয়াকার ১৬ জুলাই জ্বালানিমন্ত্রী এবং জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীকে এ প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সিলেট এলাকায় আরও ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এজন্য তারা প্রাথমিকভাবে আড়াই হাজার কোটি টাকা (২০ কোটি ডলার) বিনিয়োগে আগ্রহী। তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে চুক্তির অংশীদার রাখতে চেয়েছে। তবে নতুন করে গ্যাস আবিষ্কারের জন্য সিলেটের ৬ হাজার ২২৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা বরাদ্দ, গ্যাসের দাম বৃদ্ধিসহ ৪টি শর্ত দিয়েছে। কয়েক দশক ধরে শেভরন বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে কাজ করছে।
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি বিভাগ থেকে ১৯ জুলাই পেট্রোবাংলাকে চিঠি দিয়ে শেভরনের প্রস্তাবের ব্যাপারে মতামত দিতে বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে মন্তব্য জানতে বারবার চেষ্টা করেও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
প্রসঙ্গত, শেভরন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের ২০২৩ সাল থেকে গ্যাস খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়ে আসছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও তারা এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু জ্বালানি খাত নিয়ে তখন বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো এমওইউ ছিল না। ১৪ মে ওয়াশিংটনে জ্বালানি খাত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এমওইউ হয়। এতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। এর আগে ১৪ এপ্রিল শেভরন করপোরেশনের ইমাজিং কান্ট্রিসের প্রেসিডেন্ট জেভিয়ার লা রাজা ঢাকা সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বড় বিনিয়োগের আশ্বাস দেন। জ্বালানি বিভাগের একজন শীর্ষ নীতিনির্ধারক যুগান্তরকে বলেছেন, ওই বৈঠকের পর সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শেভরনের সঙ্গে কথা বলতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শেভরনের প্রস্তাবে কী আছে : শেভরন বাংলাদেশে উৎপাদিত ৬০ শতাংশ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, গ্যাস খাতে বড় বিনিয়োগ না থাকায় গ্যাসের সরবরাহ দিনদিন কমছে। শেভরন জানিয়েছে, এলএনজি আমদানি করে এখন বাংলাদেশ বছরে বিল দিচ্ছে ৩৮০ কোটি ডলার। ২০৩৫ সালে এই বিল বেড়ে দাঁড়াবে ৫৭০ কোটি ডলারে। শেভরন নতুন করে ১১ ও ১২ নম্বর ব্লকে (বৃহত্তর সিলেট) কাজ করার সুযোগ পেলে সম্ভাবনাময় বিভিন্ন গ্যাস কাঠামোতে কূপ খনন করবে। এতে আগামী কয়েক বছরে আরও ৫ টিসিএফ গ্যাস আবিষ্কার সম্ভব। ওই গ্যাস আবিষ্কার হলে ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি ব্যয় কমবে ১৮০ কোটি ডলার।
৪টি শর্তে কী আছে : কাঠামোগত চুক্তি করতে শেভরন চারটি শর্ত দিয়েছে। এর প্রথমটি হচ্ছে ডব্লিউপিপিএফ (শ্রমিকদের লভ্যাংশ তহবিল) নিয়ে। এ ব্যাপারে শেভরনের বক্তব্য হচ্ছে-ডিব্লিউপিপিএফ-এর টাকা আগে শেভরন দিয়েছে। মামলা থাকায় এখন বকেয়া থাকছে। আগামী দিনে নতুন পিএসসির (উৎপাদন বণ্টন চুক্তি) আওতায় শ্রমিকদের টাকা কস্ট রিকভারি (বিনিয়োগ উসুল) অর্থাৎ প্রতিবছরের পরিচালন ব্যয় থেকে উভয়পক্ষ (সরকার ও শেভরন) দেবে। জানা যায়, ডব্লিউপিপিএফ বা শ্রমিকদের তহবিল নিয়ে বাংলাদেশের শ্রম আদালতে শেভরনের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা রয়েছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শেভরনের হেড অফিসের কর্মকর্তারা।
দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে প্রতিযোগিতামূলক গ্যাসের দাম নির্ধারণ বা গ্যাসের দাম বৃদ্ধি। শেভরন বলছে, বিবিয়ানা গ্যাস ক্ষেত্র এলাকা ১২ নম্বর ব্লকের পিএসসি সই হয়েছে ১৯৯৫ সালে। সেই পিএসসির ১৪.৭.৪ অনুচ্ছেদে গ্যাসের দাম নির্ধারণের কথা উল্লেখ রয়েছে। ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এইচএফও-এর দাম সর্বোচ্চ ১৪০ ডলার প্রতি টন ধরে বিবিয়ানার গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এই দাম নব্বইয়ের দশকের। এখন সেই দাম ৪০০ ডলারের বেশি। তাই নতুন চুক্তি হলে গ্যাসের দাম অনশোরের মডেল পিএসসির আলোকে নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে শেভরন। সরকারি কর্মকর্তারা জানান, শেভরনের প্রস্তাব অনুযায়ী তাদের কাছ থেকে গ্যাসের ক্রয়মূল্য দ্বিগুণ হতে পারে।
তৃতীয় শর্ত হচ্ছে বিবিয়ানা ফিল্ডের চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি : ২০৩৩ সালে বিবিয়ানা ক্ষেত্রের চুক্তির মেয়াদ (১২ নম্বর ব্লক) শেষ হয়ে যাবে। এর মধ্যে বিবিয়ানার উৎপাদন ২০৩০-২০৩২ সালে সর্বনিু পর্যায়ে নেমে আসতে পারে। কিন্তু নতুন বিনিয়োগ করে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলে এই খাতের সম্ভাবনা আছে। তাই তারা ১২ নম্বর ব্লক বা বিবিয়ানা ক্ষেত্রের চুক্তির মেয়াদ ২০৩৪ থেকে ১৫ বছর বাড়িয়ে ২০৪৯ সাল পর্যন্ত করার প্রস্তাব করেছে। প্রসঙ্গত, দেশের ২২টি ক্ষেত্রের মধ্যে বিবিয়ানা গ্যাস ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গ্যাস উৎপাদন হয়। স্থানীয়ভাবে দৈনিক ১৫০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে শেভরন একাই করে ৭ কোটি ৫৩ লাখ ঘনফুট গ্যাস।
চতুর্থ শর্ত হচ্ছে ১১ ও ১২ নম্বর ব্লকের বিভিন্ন এলাকা বরাদ্দ : প্রস্তাবে সিলেটের বিভিন্ন এলাকার নাম উল্লেখ করে বলেছে, বৃহত্তর সিলেটের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় শেভরন কাজ করতে আগ্রহী। এজন্য নতুন করে পিএসসি করে তাদের ৬ হাজার ২২৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা বরাদ্দ দিতে হবে। সঙ্গে একটি মানচিত্র যুক্ত করা হয়েছে। সেই মানচিত্রে সুনেত্র, ছাতক, ছোট মোহন, বালারামপুর, নিকলী, বিবিয়ানার আশপাশের এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকা উল্লেখ রয়েছে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, সুনেত্র, ছাতকসহ সম্ভাবনাময় কয়েকটি কাঠামো বাপেক্সের জন্য বরাদ্দের চিন্তা করছে সরকার। তবে এজন্য শেভরন ২০২৬ সালের মডেল পিএসসি (অনশোর) অনুযায়ী চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে।
এমওইউ-এর আওতায় চুক্তি করতে চায় শেভরন : দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত এমওইউ-এর আওতায় কাঠামোগত চুক্তি করতে আগ্রহী শেভরন। শেভরন অনশোর বিডিং-এর মাধ্যমে নয়, মার্কিন সরকারের সঙ্গে এমওইউ-এর ভিত্তিতে চুক্তি করতে চায়। প্রস্তাবে এমওইউ-এর ৪ নম্বর সেকশনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেই ৪ নম্বর সেকশনে আছে, মার্কিন জ্বালানি বিভাগ এবং বাংলাদেশের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ দুই দেশ জ্বালানিসম্পদ এবং এই খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাজ করবে। শেভরন বলছে, এই সেকশনের আলোকে তাদের সঙ্গে কাঠামোগত চুক্তি করা যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এই প্রস্তাব দিয়েছিল শেভরন। পরে সাবেক সচিব মোহাম্মদ মহসিন এবং সাবেক সচিব আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহসহ কয়েকজনকে নিয়ে একটি কমিটি করা হয়। ওই কমিটি বলেছিল, দরপত্র ছাড়া শেভরনকে নতুন এলাকা বরাদ্দ দেওয়া যাবে না। পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা জানান, আগের প্রস্তাব এবং এবারের প্রস্তাবের মধ্যে বেশ পার্থক্য আছে। কারণ, আগে কোনো চুক্তি ছিল না বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের। শেভরন বাংলাদেশের মুখপাত্র শেখ জাহিদুর রহমান সোমবার যুগান্তরকে বলেছেন, এটি নীতিগত ব্যাপার। এ ব্যাপারে শেভরন কোনো মন্তব্য করতে চায় না।
