আজ-কালের মধ্যে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ
বঙ্গভবন ছাড়তেই হচ্ছে সাহাবুদ্দিনকে
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শেষ পর্যন্ত বঙ্গভবন ছাড়তেই হচ্ছে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে। শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণ দেখিয়ে দু-একদিনের মধ্যেই তিনি পদত্যাগ করতে পারেন। আজ-কালের মধ্যেই পদত্যাগ করে বঙ্গভবন ছাড়বেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বিষয়টি যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছে।
সূত্র বলছে, রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে হলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে হবে। সেই প্রক্রিয়াও প্রায় চূড়ান্ত করেছে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়। স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ চিকিৎসার জন্য বর্তমানে থাইল্যান্ড রয়েছেন। তার দেশে ফেরার কথা ছিল ২৬ জুলাই। তবে তিনি আজই (শুক্রবার) দেশে ফিরছেন। স্পিকার আসার পর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঙ্গভবনের একজন কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার বিকালে যুগান্তরকে জানান, রাষ্ট্রপতি মনোনীত বঙ্গভবনে কর্মরত কর্মকর্তা ইতোমধ্যে ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছেন। এমনকি দুদিন আগে রাষ্ট্রপতি নিজেই অধস্তন কর্মকর্তাদের বঙ্গভবন ছেড়ে যেতে মৌখিকভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন। পদত্যাগ করে তিনি গুলশানে নিজ বাসায় উঠবেন। মো. সাহাবুদ্দিন পরবর্তী সময়ে চিকিৎসা ও বিশ্রামের জন্য বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন বলেও ওই কর্মকর্তা জানান।
বঙ্গভবনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। পদত্যাগপত্র লেখা হয়েছে। যদিও তিনি এখনো (বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টা) স্বাক্ষর করেননি। স্পিকার দেশে না থাকায় পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি বিলম্বিত হচ্ছে।
বঙ্গভবনে দায়িত্ব পালনকারী আরেক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘স্যার দুদিন আগে জানিয়েছেন যে, ওরা আমাকে (রাষ্ট্রপতি) চলে যেতে বলেছে। হয়তো আমার চলে যেতে হবে। তোমরা চলতি মাসের মধ্যেই বঙ্গভবন ছেড়ে যার যার মতো করে চলে যাও।’ ‘ওরা’ বলতে কাকে বুঝিয়েছেন-এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
কী কারণে হঠাৎ করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগ করতে হচ্ছে? জানা যায়, চলতি বছরের মে মাসে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। গুঞ্জন রয়েছে, লন্ডনে অবস্থানকালে অতি গোপনীয়তা রক্ষা করে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন তিনি। ১৮ মে দেশে ফেরার পর একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এ তথ্য উদ্ঘাটনে মাঠে নামে। সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পেছনে মূলত দুটি বিষয় কাজ করতে পারে। একটি হচ্ছে, লন্ডনে উল্লিখিত গোপন আলাপ, অন্যটি এ বছরের ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়া। সব মিলিয়ে সরকারও মনে করছে রাষ্ট্রপতিকে এই পদে আর রাখা সমীচীন হবে না। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো অফিশিয়াল বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর কে হচ্ছেন দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি-তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে জোর আলোচনা। পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নতুন রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় সাহাবুদ্দিনের ‘শূন্য’ পদে কাকে বসানো হবে, তা নিয়ে বিএনপি ও সরকারের উচ্চপর্যায়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সেপ্টেম্বরে সংসদ অধিবেশ বসার কথা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই অধিবেশনে নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে গেছেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তবে তিনি সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুরোধে নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফিরে আসছেন। মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন স্পিকার।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে এই যখন অবস্থা, তখন সরকারের নজর এখন বঙ্গভবনের দিকে। ক্ষমতাসীন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিছুটা সময় নিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চান বলে জানা যায়। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে যোগ্য, দক্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে দেখতে চান সরকারপ্রধান। সে লক্ষ্যে বিএনপির দলীয় নেতাদের পাশাপাশি প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগ করতে চাইলে সে সুযোগ তার আছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের কোনো ‘পদক্ষেপ নেই’। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগ করতে চাইলে-স্বাস্থ্যগত কারণে বা যে কোনো কারণে, তার সে অপশন আছে। আমরা তো জানি না।’
গণমাধ্যমে একটা খবর এসেছে রাষ্ট্রপতি লন্ডনে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন, তখন ভারতে পলাতক শেখ হাসিনার সঙ্গে তিনি ফোনালাপ করেছিলেন-এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সেটা আমি জানি না। আমরা শুনি নাই।’
রাষ্ট্রপতি কি শারীরিক অবস্থার কারণে পদত্যাগের কথা জানিয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নে মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘না, এটা সরকারকে জানানোর কথা নয়। যদি মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্যগত বা যে কোনো কারণে পদত্যাগ করতে চান, সেই অপশন তো ওনার আছেই। এখানে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি। আমিও এগুলো পত্রিকায় শুনছি (দেখছি)। আর তিনি যদি পদত্যাগ করতে চান সাংবিধানিকভাবে, সেটা স্পিকার বরাবর পদত্যাগপত্র দিতে হয়। এটুকু জানি। এর বাইরে কিছু জানি না।’ পরে বিকালে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আবার রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা। জবাবে তিনি বলেন, ‘শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের মধ্যে ফোনালাপের কোনো তথ্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। এ রকম যদি কিছু হয়ে থাকে তাহলে তা তদন্ত করে দেখা হবে। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শারীরিকভাবে অসুস্থ। সম্প্রতি লন্ডন থেকে আসার পর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) সিটিস্ক্যান ও এমআরআই পরীক্ষায় তার স্নায়ুবিষয়ক জটিলতা ধরা পড়ে। এ কারণে পদত্যাগের পর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
এদিকে সরকারের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী ও বিএনপির সিনিয়র নেতা বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ইস্যুতে বিএনপি কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো চাপ নেই। কয়েক মাস আগে রাষ্ট্রপতি নিজে থেকেই চলে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, তখনও সরকার কোনো সিদ্ধান্তে যায়নি। এখন যদি তিনি অসুস্থজনিত কারণে পদত্যাগ করেন, তাহলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। যদিও এ বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান কোনো আলোচনা করেননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র একজন সদস্য যুগান্তরকে বলেন, ২০২৩ সালের এপ্রিলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সাংবিধানিক পদের মধ্যে তিনি এখনো বহাল আছেন। ওই সময় তিনি পদত্যাগ করলে দেশে সাংবিধানিক সংকট দেখা দিত।
একটি সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। এমতাবস্থায় শেখ হাসিনা সরকারের নিয়োগ দেওয়া রাষ্ট্রপতিকে বহাল রাখা ঝুঁকিপূর্ণ কিনা-সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
সম্ভাব্য আলোচনায় সিনিয়র তিন নেতা : বিএনপির সিনিয়র তিন নেতার আলোচনা জোরালো হচ্ছে। বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. আবদুল মঈন খানের নাম রয়েছে রাষ্ট্রপতির আলোচনায়। এছাড়া সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে চুক্তিভিত্তিক নিযুক্ত এক সিনিয়র সচিবের নামও আলোচনায় আছে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসাবে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে দল ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা আরও আলোচনা করবেন। নতুন রাষ্ট্রপতি পদে দল থেকে নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে ৪০ শতাংশ; আর ৬০ শতাংশ সম্ভাবনা দলের বাইরের কেউ রাষ্ট্রপতি নিয়োগ হতে পারেন। তবে দলের কয়েকজন নেতার দাবি, রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে দলের বাইরের কাউকে নিয়োগ দেওয়া ঠিক হবে না।
এদিকে সরকারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, রাষ্ট্রপতি পদে যাদের নাম আলোচনায় আসছে তা সবই অনুমাননির্ভর। বাস্তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়া এ বিষয়ে কেউই কিছু জানেন না।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য রাজনৈতিক চাপও সামলাতে হবে নতুন রাষ্ট্রপতিকে। সরকার, বিরোধী দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে তার।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন,‘রাষ্ট্রপতির বিষয়টি অনেক আগেই রাজনৈতিকভাবে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত ছিল। বিএনপিকে বারবার সতর্ক করা হলেও বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। সময়মতো উদ্যোগ নেওয়া হলে আজ এত আলোচনা-সমালোচনার অবকাশ থাকত না। অবশেষে অপসারণ হচ্ছে, এটা সুসংবাদ।’
২০২৩ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তিনি বলেছিলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে তিনি পদত্যাগ করতে চান। সে সময় তিনি আরও বলেন, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আচরণে তিনি অপমানিত বোধ করেছেন। এরপর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, সরকার চাইলে তিনি দায়িত্বে থাকবেন, অন্যথায় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন।
