Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

রাজধানীতে বিপাকে চালকরা রান্নায়ও বিড়ম্বনা

আসাদুল্লা লায়ন

আসাদুল্লা লায়ন

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীতে বিপাকে চালকরা রান্নায়ও বিড়ম্বনা

কয়েকদিন ধরে রাজধানীতে তীব্র গ্যাস সংকট থাকায় রান্নাবান্নায় ব্যাপক দুর্ভোগে পড়েন গৃহিণীরা। অনেক পরিবারে রান্না হচ্ছে মাটির চুলায়। শুক্রবার মোহাম্মদপুর থেকে তোলা -যুগান্তর

শুক্রবার বিকাল ৪টা। রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার সিটি ওভারসিজ সিএনজি লিমিটেডের ফিলিং স্টেশন। গ্যাস নিতে আসা ব্যক্তিগত গাড়ির অন্তত আধা কিলোমিটার দীর্ঘ সারি। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ি নিয়ে চালক ৩ ঘণ্টা ধরে লাইনে অপেক্ষার পর ফুয়েল ডিসপেনসারে পৌঁছান। তখন মিটারে গ্যাসের চাপ ১০০-তে আটকে ছিল। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর মাত্র ৪০০ টাকার গ্যাস পান তিনি। চালক সাইফুল আলম বলেন, স্বাভাবিক সময়ে এই চাপ ২৫০ এর বেশি থাকে। তখন এর দ্বিগুণ গ্যাস নেওয়া যেত। কিন্তু কয়েক দিন হলো দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছি না।

একই সারিতে অপেক্ষমাণ আরেক চালক জামাল মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সকাল ৭টায় বিমানবন্দরের সামনের পাম্পে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে জানতে পারি গ্যাসের চাপ নেই। পরে আসতে হবে। পরে এই পাম্পে এসেও দেখছি চাপ কম। এই সমস্যা তো আপনি আমি পোহাচ্ছি। সরকারের যেন কিছু যায় আসে না। ওই পাম্পে অপেক্ষারত একাধিক সিএনজিচালক বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, এখন দেড়-দুইশ টাকার বেশি গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অল্প গ্যাস নিয়ে বেশিক্ষণ চালানো যাচ্ছে না। বারবার এসে লাইনে অপেক্ষা করে দিন পার হয়ে যাচ্ছে।

পাম্পটির সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার ইবনুল মোবারক শান্ত যুগান্তরকে বলেন, সকাল থেকে বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত গ্যাস বন্ধ থাকার পর চাপ ৩-পিএসআই পাওয়া যাচ্ছে। যা স্বাভাবিক সময়ে ১৪ থেকে ১৫ থাকে। ফলে যেসব প্রাইভেটকার ৮০০ টাকা পর্যন্ত গ্যাস পেত তাদের এখন ১৫০ থেকে ২০০ টাকার নিতে হচ্ছে। আবার চাপ না থাকায় এই অল্প গ্যাসও দ্বিগুণ সময় ধরে নিতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের ৮টি নজেলের ৬টিই বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় ঘোষণা ছাড়াই লাইন বন্ধ রাখা হচ্ছে। ফলে গাড়িগুলোকে দীর্ঘ সময় লাইনে সময় নষ্ট করতে হচ্ছে।

রাজধানীর মিরপুর যাত্রাবাড়ী ও শ্যামপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ভোগান্তির একইরকম ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে। ছুটির দিনেও এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছেন সিএনজিচালিত পরিবহণগুলো। অনেকেই বৃহস্পতিবার রাত থেকে লাইনে অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়েছেন। আবার পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় অনেক ফিলিং স্টেশন কার্যত বন্ধ রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজি চালকরা বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন। এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তারা বলেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। অতীতেও জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে সংকট দেখিয়ে মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছিল।

এদিকে, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রান্না নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা। মিরপুর ও মোহাম্মদপুরসহ অনেক এলাকার বাসাবাড়িতে বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাসের চাপ একেবারেই কম থাকছে। ছুটির দিনেও রান্না করতে না পেরে ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা। অনেক পরিবার বিকল্প হিসাবে বৈদ্যুতিক চুলা, এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার বা গভীর রাতে রান্নার চেষ্টা করছে। কেউ হোটেলে খেয়ে দিন পার করছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

জানা গেছে, মাতারবাড়ীতে একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড-পরবর্তী যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই সমস্যার কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। তবে কবে নাগাদ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে তা নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু জানা যায়নি।

মিরপুর : কালশী, কল্যাণপুর ও গাবতলীসহ আশপাশের এলাকার সিএনজি স্টেশনে গাড়ির লম্বা সারি ছিল দিনভর। চালকদের অভিযোগ, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় নষ্ট হলেও মিলছে না পর্যাপ্ত গ্যাস। কালশী শতক ফুয়েল স্টেশনে সিএনজিচালক রাজু বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে এসে গ্যাস পাইনি। আজ (শুক্রবার) সকাল থেকে দুইবার লাইনে দাঁড়িয়েছি। সিরিয়ালে তিন থেকে ৪ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মাত্র ৭০ টাকার গ্যাস পেয়েছি। অল্প কিছুদূর চলেই আবার পাম্পে ফিরে আসতে হচ্ছে। নিজের আয় তো দূরের কথা, মালিকের জমা তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।

যাত্রাবাড়ী : শুক্রবার সকাল থেকে এই এলাকার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। গ্যাসের জন্য অন্তত ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। তবুও পর্যাপ্ত গ্যাস মেলেনি। মাতুয়াইল এলাকার আসমা আলী সিএনজি স্টেশনে অপেক্ষমাণ চালক মনির হোসেন বলেন, দুপুর ১২টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ৩টায় মাত্র ১৪০ টাকার গ্যাস পেয়েছি। এতটুকু দিয়ে কতক্ষণইবা চালানো যাবে।

এদিকে চুলায়ও গ্যাস না থাকায় শনিরআখড়াসহ আশপাশের এলাকায় হাহাকার পরিস্থিতি। বাসাবাড়িতে খাবারের সংকট। অনেকে শুকনা খাবার খাচ্ছেন, কেউ হোটেলে খাচ্ছেন। যাত্রবাড়ীর স্মৃতিধারা এলাকার আসলাম বলেন, আমাদের এলাকায় গত এক বছর ধরেই গ্যাস সংকট রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েক দিন ধরে মোটেও গ্যাস নেই। হোটেলে খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছি।

শ্যামপুর : অন্যান্য এলাকার মতো শ্যামপুরেও ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন ছিল। প্রধান সড়কের একটি বড় অংশ দখল হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা। চালকরা জানান, ৫ ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষার পরও গ্যাস পাননি। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট ও আর্থিক ক্ষতির হচ্ছে।

সবুজবাগ : সবুজবাগ, মুগদা, খিলগাঁওসহ আশপাশের এলাকায় ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্যাস না থাকায় রান্না করতে পারেননি বাসিন্দারা। অন্যদিকে বিকাল পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাননি বহু চালক। এতে দৈনিক জমা, কিস্তি ও সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে তাদের। চালক মো. ইয়াসিন বলেন, গ্যাস না পেলেও মালিককে প্রতিদিন এক হাজার ২০০ টাকা জমা দিতে হয়। এনজিওর কিস্তি পরিবারের খরচ সামলাতে পারছি না।

এনএস সিএনজি ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিসিং সেন্টার লিমিটেডের পরিচালক মো. নাজমুল হক নান্নু বলেন, এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে ফিলিং স্টেশন পরিচালনা, কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন যুগান্তরের মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, সবুজবাগ ও শ্যামপুর প্রতিনিধি)

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .