Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

গ্যাস সংকটে বাড়ছে উদ্বেগ

ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে চীনা কোম্পানির নজর

Icon

শাহেদ সিদ্দিকী

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে চীনা কোম্পানির নজর

দেশের দুটি ভাসমান টার্মিনালের (এফএসআরইউ) মধ্যে একটিতে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সারা দেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে। এ সংকটের মধ্যেই তৃতীয় একটি ভাসমান টার্মিনাল নিয়ে তৎপর জ্বালানি বিভাগসহ দেশি-বিদেশি কয়েকটি পক্ষ। এর মধ্যে রয়েছে চীনের একটি প্রতিষ্ঠান এবং দেশের আলোচিত-সমালোচিত সামিট গ্রুপ। তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বসাতে আগ্রহ দেখিয়ে চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিএনইই) তাদের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় পাঠিয়েছে। দলটি চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশে তৃতীয় এফএসআরইউ বসানোর ব্যাপারে জ্বালানি বিভাগের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করবে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে সামিট গ্রুপও সরকারের সঙ্গে সমঝোতার জন্য জোড়জোড় শুরু করেছে। সূত্র বলছে, প্রচলিত নিয়মের বাইরে এফএসআরইউ বসানোয় বিলিয়ন ডলারের এই কাজ পেতে দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোর দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। বাতিল হওয়া তৃতীয় এফএসআরইউ-এর ব্যাপারে সমঝোতা করতে সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছে সামিট গ্রুপ। তারা বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকার তৃতীয় এফএসআরইউ বসানোর জন্য সামিটের চুক্তি বাতিল করে দেয়। এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলা করেছে সামিট। মামলার শুনানি এখনো চলমান। সামিটের পক্ষে যারা তৃতীয় টার্মিনাল বসানোর কাজ পেতে চেষ্টা করছে, তারা মনে করে, বিএনপি সরকার চাইলে আদালতের বাইরে এ ব্যাপারে সমঝোতা হতে পারে। তবে সামিটের প্রস্তাবের ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখায়নি জ্বালানি বিভাগ।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, দেশের গ্যাস সংকট দ্রুত সমাধানে চার বছর ধরে সরকার তৃতীয় একটি টার্মিনাল বসানোর কাজ করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সামিটের চুক্তি ও সৌদি সরকারের প্রতিষ্ঠান আরামকোর সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা বাতিলের ঘটনাও ঘটেছে। এর মধ্যে চলতি জুলাইয়ে সরকার টু সরকার (জি-টু-জি) নীতির আলোকে ১২টি দেশ এবং প্রতিষ্ঠানকে আরএফপি (রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল) পাঠানো হয়। এপরর হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই সেই প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব ঘটনার মাঝেই চীনের সিএনইই-এর প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর এবং সামিটের সমাঝোতার প্রস্তাবটি সামনে এলো।

জানা যায়, চীনের সিএমসি গ্রুপ মূলত সিএনইইকে বাংলাদেশে নিয়ে আসে। তাদের ব্যাপারে সরকারের এক শীর্ষ নীতিনির্ধারক বেশ আগ্রহী। সিএনইই আজ-কালের মধ্যে জ্বালানি বিভাগের কাছে তৃতীয় ভাসমান টার্মিনাল বসানোর ব্যাপারে পেপার উপস্থাপন করতে পারে। সেখানে জ্বালানি বিভাগের নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত থাকবেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, চীনের এই প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবের পর জানা যাবে তারা আসলে কীভাবে টার্মিনাল বসানোর কাজটি পেতে চায়। তবে একটি প্রক্রিয়া হঠাৎ বাতিল করে কেন তারা এত আগ্রহী হলো, তা নিয়েও অনেকের প্রশ্ন।

কী আছে সামিটের সমঝোতার প্রস্তাবে : চলতি মাসে সামিট গ্রুপের সামিট এলএনজি টার্মিনাল কোম্পানি পেট্রোবাংলাকে চিঠি দিয়ে তৃতীয় টার্মিনাল বসানোর ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়ে বলেছে, তারা এজন্য সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করতে আগ্রহী। বাতিল হওয়া চুক্তি তাদের ফিরিয়ে দিলে ১৮ মাসে সামিট দেশে আরও একটি টার্মিনাল বসিয়ে দেবে। সরকারের সঙ্গে সমঝোতা হলে তারা হাইকোর্ট থেকে মামলাও প্রত্যাহার করে নেবে। ২০২৪ সালের ৩০ মার্চ বিশেষ আইনে সামিটকে তৃতীয় ভাসমান টার্মিনাল বসানোর কাজ দিতে চুক্তি করে আওয়ামী লীগ সরকার। সেই চুক্তি অনুযায়ী ২০২৬ সালের নভেম্বরে তৃতীয় টার্মিনাল চালু হওয়ার কথা ছিল। তবে বিভিন্ন দুর্নীতি এবং অনিয়মের অভিযোগে আওয়ামী সরকারের সঙ্গে করা সামিটের চুক্তি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর বাতিল করে পেট্রোবাংলা। বিষয়টি আদালতে নিয়ে যায় সামিট গ্রুপ।

১৩ জুলাই সামিটের মামলার শুনানি ছিল হাইকোর্টে। সামিট পেট্রোবাংলার সঙ্গে সমঝোতার আদেশ চেয়ে আবেদন করে আদালতে। কিন্তু আদালত সেটি গ্রহণ করেননি। আগস্টের মাঝামাঝি এ মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ রয়েছে।

এদিকে মামলা চলাকালে সমঝোতার এ প্রস্তাব দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন সামিট এলএনজি কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সায়েদুল আলম। তিনি যুগান্তরকে বলেন, মামলার বাইরে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর জন্য মামলার কোনো সমস্যা হবে না। সামিট প্রকল্পটি করতে চায়। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, সামিটের প্রস্তাবের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে জ্বালানি বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জ্বালানি বিভাগ এ ব্যাপারে এখনো কিছু জানায়নি।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সরকারি কর্মকর্তা জানান, সামিট গ্রুপ জ্বালানি খাতের বড় মাফিয়া। পতিত শেখ হাসিনা সরকারের অন্যতম ঘনিষ্ঠ ছিল। অনেকে মনে করেন, সামিটের একটি ফান্ড হাসিনা পরিবারের কাছে আছে। তাই তাদের বিশেষ আইনে অসংখ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানো থেকে শুরু করে অনেক সুবিধা দিয়েছে। ওই কর্মকর্তারা জানান, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে লাভবান ছিল সামিট গ্রুপ। ওই সময়ে সামিটের প্রধান অফিস সিঙ্গাপুরে নিয়ে যায়। অথচ ব্যবসা বাংলাদেশে। তাই তাদের প্রস্তাবের ব্যাপারে আগ্রহ কম বিএনপি সরকারের।

বর্তমান সরকারের টার্মিনাল বসানোর তৎপরতা : অন্তর্বর্তী সরকার গত জানুয়ারির শেষে সৌদি আরামকোকে টার্মিনাল বসানোর চুক্তি করার প্রস্তাব দেয়। জাতীয় নির্বাচনের কারণে ওই চুক্তি করতে অস্বীকৃতি জানায় তারা। আরামকোও বিএনপি সরকারের সঙ্গে এফএসআরইউ নিয়ে চুক্তি করতে আগ্রহী। এ ব্যাপারে সমঝোতাসহ অন্যান্য বিষয় দেখতে বুয়েটের উপাচার্যের নেতৃত্বে একটি কমিটি করা হয়। সেই কমিটির রিপোর্টে বলা হয়, আরামকো এফএসআরইউতে বিনিয়োগের (প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার) জন্য কঠিন শর্ত দিয়েছে। যেমন: ১৮ মাসে এফএসআরইউ বসানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন তারা জানায়, ১৮ মাস নয়, এফএসআরইউ বসাতে ৩০ মাস লাগবে। তাই আরামকোর সঙ্গে সমঝোতা বাতিল করে নতুন করে জি-টু-জির মাধ্যমে অন্য কোম্পানিকে নির্বাচিত করার সুপারিশ করা হয়।

জি-টু-জির আওতায় তৃতীয় এফএসআরইউ বাসানোর জন্য গত মাসে ১২টি কোম্পানির কাছে আরএফপির (রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল) ডকুমেন্ট এবং ঢাকায় মার্কিন ও চীনসহ বিভিন্ন দূতাবাসে চিঠি দিয়েছিল জ্বালানি বিভাগ। ওই ১২টি কোম্পানি হচ্ছে-ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড, সৌদি আরবের আরামকো, আজারবাইজানের সকার ট্রেডিং, যুক্তরাষ্ট্রের গানবোর ইউএসএ, যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি, আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর, ইউএই-এর আইআরএইচ গ্লোবাল, চীনের সিএমসি, চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি, কাজাগ গ্যাস প্রসেসিং প্ল্যান্ট, ইউএইএ-এর গ্রুপ অব কোম্পানিজ অব শেখ আহমেদ ফায়সাল আল কাশেমী এবং বিজি ইনার এক্স লিমিটেড। সেই প্রক্রিয়া বাতিল করে এখন চীনের কোম্পানির প্রস্তাব নিয়ে ব্যস্ত জ্বালানি বিভাগ।

দেশে বর্তমানে দৈনিক ৪০০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাসের চাহিদা আছে। সরবরাহ করা হয় দৈনিক ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দুটি এফএসআরইউ দিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে ১১০ কোটি ঘনফুট। গ্যাসের নতুন সংযোগের জন্য সরকারের কাছে আবেদন জমা আছে ১৮৫৭টি। এই আবেদনের মধ্যে ৫৫০টি প্রতিষ্ঠান ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে ৪ বছরেও গ্যাস পাচ্ছে না।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম