Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

আলিফদের স্বপ্ন দেখা মানা

Advertisement

জাহিদ হাসান

জাহিদ হাসান

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আলিফদের স্বপ্ন দেখা মানা

এনসিপির ছাত্র সংগঠন ‘জাতীয় ছাত্র শক্তি’র কর্মী কলেজছাত্র আলিফ চৌধুরীকে পর্যবেক্ষণ করছেন চিকিৎসকরা। বৃহস্পতিবার রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে -যুগান্তর

Advertisement

রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার ৬২৭ নম্বর ক্যাবিন। শয্যায় নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে আছেন ১৮ বছরের এক তরুণ। হাতে ক্যানুলা, বাম চোখে সাদা গজের মোটা ব্যান্ডেজ। মাঝেমধ্যে ডান চোখ খুলে চারপাশে তাকানোর চেষ্টা করছেন। সেই চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। তার নাম আলিফ চৌধুরী। হবিগঞ্জের একটি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। অসুস্থ বাবা, মানসিক রোগে ভোগা মা আর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বড় ভাইয়ের সংসারে সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে ওঠার স্বপ্ন ছিল যার, তার সামনেই এখন চিরস্থায়ী অন্ধকার। অন্য দশজনের মতো পৃথিবীকে দুই চোখে দেখার সাধ আর কোনোদিন পূরণ হবে না তার।

মঙ্গলবার হবিগঞ্জে এনসিপির সমাবেশে হামলায় দলটির ছাত্র সংগঠন ‘জাতীয় ছাত্র শক্তি’র কর্মী আলিফ চোখে গুরুতর আঘাত পান। স্থানীয় চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে ঢাকায় পাঠান। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে পৌঁছানোর পরই তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। এর আগে একটি সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করতে হয়। সেখানে স্পষ্ট লেখা ছিল-বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। পাশে তখন তার মা-বাবা কেউ নেই। নিজের অভিভাবক হয়ে নিজেকেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। সঙ্গে থাকা এক সহযোদ্ধা যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা ভয় পাচ্ছিলাম, যদি ওকে বলে দেওয়া হয় যে, চোখ নাও ফিরতে পারে, তাহলে ও ভেঙে পড়বে। কিন্তু আইনগত কারণে জানাতেই হলো। সব শুনে আলিফ শুধু বলেছিল, ‘কোথায় সই করতে হবে? দেন।’

অপারেশনের পর চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আলিফের বাম চোখে আর দৃষ্টি ফিরবে না। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ডিউটি চিকিৎসক ডা. সামিয়া নুজহাত জানান, ইট বা পাথরের আঘাতে আলিফের বাম চোখের আইবল ও আইলিড ফেটে গেছে। চোখের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাইরে বেরিয়ে এসেছে।

নেত্রনালিসহ প্রায় সব স্বাভাবিক গঠন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অপারেশন করে চোখটি কসমেটিকভাবে পুনর্গঠন করা হয়েছে, যাতে বাহ্যিক বিকৃতি কম থাকে। তবে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা কার্যত নেই। চিকিৎসকদের ভাষায়, যখন একটি চোখের সব গুরুত্বপূর্ণ গঠন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানেরও করার মতো খুব বেশি কিছু থাকে না।

এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্য সচিব ডা. আবদুল আহাদ যুগান্তরকে বলেন, আলিফকে সহযোগী অধ্যাপক ডা. এনামুল হকের অধীনে ভর্তি করা হয়েছে। পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করে তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অস্ত্রোপচার করা হয়। সংক্রমণ যাতে মস্তিষ্ক বা অন্য চোখে ছড়িয়ে না পড়ে, সেটিও ছিল বড় বিবেচনা। তিনি বলেন, বাম চোখটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। ডান চোখে সাময়িক ঝাপসা দেখলেও সেটি সেরে ওঠার আশা রয়েছে। জানা যায়, আলিফের বাবা দীর্ঘদিন অসুস্থ। পায়ের গুরুতর আঘাত থেকে এখনো পুরোপুরি সেরে উঠতে পারেননি। ছেলের এ দুর্ঘটনার পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। মা দীর্ঘদিন মানসিক রোগে ভুগছেন। ছেলের চোখ হারানোর খবর শুনে তিনি প্রায় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। বড় ভাইও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। হাসপাতালে আলিফকে দেখতে আসা কয়েকজন জানান, আলিফ ছিল তার পরিবারের বাতিঘর। তার এক চোখ নিভে গেল। এ দায় বর্তমান অসুস্থ রাজনীতির। গণ-অভ্যুত্থানের পর ধারণা করা হচ্ছিল, রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে। কিন্তু কোনো কিছুই বদলায়নি। সব আগের মতোই রয়ে গেছে। 

আলিফের পাশে থাকা এক সহযোদ্ধা আক্ষেপ করে যুগান্তরকে বলেন, একটি চোখ হারানো মানে শুধু দৃষ্টিশক্তি হারানো নয়। হারিয়ে যায় স্বাভাবিক জীবন, অনেক পেশায় কাজ করার সুযোগ, আত্মবিশ্বাস, স্বপ্ন এবং পরিবারের জন্য কিছু করার সম্ভাবনার বড় একটি অংশ। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের একজন শিক্ষার্থীর জন্য এই ক্ষতি বহুগুণ।

হবিগঞ্জ ও নবীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, আলিফ হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের ফারুক চৌধুরীর ছেলে। নবীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র এবং ২০২৪-এর জুলাই যোদ্ধা। বৃহস্পতিবার দুপুরে আলিফের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সুনসান নীরবতা। তার মা বাড়িতে একা। বাবা চলে গেছেন আলিফের ফুপুর বাড়িতে। ভাই আতিকও নানা কাজে ব্যস্ত। ফুপু সুরেহা বেগম চৌধুরী বলেন, আমার ভাইপোর কী দোষ ছিল? কেন তার চোখ নষ্ট করে দেওয়া হলো? আমরা হামলাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। বাউসা ইউপি চেয়ারম্যান শেখ সাদিকুর রহমান, পাইকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ইউপি সদস্য আবুল কাসেম ও আলিফের প্রতিবেশী সৈয়দ ফাহাদ আহমদও হামলাকারীদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন। জেলা এনসিপির যুগ্ম-আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট ফখরুদ্দিন আহমেদ বলেন, যেটুকু জেনেছি ছেলেটি খুবই দরিদ্র পরিবারের। আমাদের দলের পক্ষ থেকে তার চিকিৎসা করানো হচ্ছে। সে একজন জুলাই যোদ্ধা। তার ওপর এমন ন্যক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা জানাই।

আলিফকে দেখতে হাসপাতালে আখতার : হবিগঞ্জে হামলার পর আজ সিলেটেও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) গাড়িবহরে হামলার কথা উল্লেখ করে দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেছেন, তাদের ওপর ধারাবাহিকভাবে হামলা করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে একটি ভয়াবহ ও বীভৎস পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। হবিগঞ্জে মঙ্গলবারের হামলায় চোখে আঘাত পাওয়া জাতীয় ছাত্রশক্তির স্থানীয় নেতা আলিফ চৌধুরী ঢাকার আগারগাঁওয়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। বৃহস্পতিবার বিকালে তাকে দেখে এসে হাসপাতালের বাইরে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন এনসিপির নেতারা। দেশে গণতন্ত্রকে প্রস্ফুটিত করতে হলে বিরোধী দলের ওপর হামলা-মামলা করা যাবে না উল্লেখ করে সংসদ-সদস্য আখতার হোসেন বলেন, ‘হবিগঞ্জে হামলার প্রতিবাদে কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচিতেও বিএনপি ও ছাত্রদল-যুবদলের গুন্ডারা হামলা করেছে।


Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম