হাওড় অঞ্চলে শিক্ষার প্রসারে প্রকল্প
উন্নয়নের দেওয়ালে অনিয়মের ফাটল
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হাওড় অঞ্চলের শিক্ষার চিত্র বদলে দিতে ৪৩০ কোটি টাকায় নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক ২৫টি বহুতল ভবন। কিন্তু উদ্বোধনের আগেই শিক্ষার প্রসারে গড়ে ওঠা ভবনের দেওয়ালে দেখা দিয়েছে ফাটল। কোথাও নতুন ভবনের গাঁথুনিতে চিড়, কোথাও জানালার লিন্টেল বাঁকা, কোথাও ত্রুটিপূর্ণ ছাদ নির্মাণ। অনেক ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হলেও সেখানে বসেনি একটি বেঞ্চও। বিজ্ঞানাগার আছে তো যন্ত্রপাতি নেই। আইসিটি ল্যাবের কক্ষে নেই কোনো কম্পিউটার, কেনার উদ্যোগও নেই। এত অনিয়মের মধ্যেও বিল পরিশোধের কাজ ঠিকঠাক করে ফেলা হয়েছে। অথচ অনুমোদনের আগেই বিল পরিশোধ, ভুয়া টেস্ট রিপোর্ট গ্রহণ, স্পেসিফিকেশন বহির্ভূত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার নিয়ে ৩৪ কোটি ২৩ লাখ টাকার ১৪টি অডিট আপত্তি ঝুলে রয়েছে। একটিরও কোনো নিষ্পত্তি হয়নি।
এই চিত্র ‘কিশোরগঞ্জ জেলার হাওড় অঞ্চলের নির্বাচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্পের। যা উঠে এসেছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) পরিচালিত নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষা প্রতিবেদনে। তথ্য বলছে-ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী উপজেলার ৪৩০ কোটি টাকা ব্যায়ে ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঁচ ও ছয়তলা ভবন, ছাত্রাবাস-ছাত্রীনিবাস, বিজ্ঞানাগার, লাইব্রেরি ও আইসিটি ল্যাব নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। মে ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশ হলেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৫৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ১৪টি ভবন নির্মাণ শেষ হলেও অধিকাংশ ভবনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার শুরু করা যায়নি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে অষ্টগ্রামের আব্দুল ওয়াদুদ উচ্চ বিদ্যালয়ে। নতুন ভবনের দেওয়ালে দৃশ্যমান ফাটল, অসমান প্লাস্টার, বাঁকা লিন্টেল এবং ইটের গাঁথুনির সঙ্গে ফাঁকা অংশও পাওয়া গেছে এবং এসব ফাঁক দিয়ে পানি ঢুকলে অল্প সময়ের মধ্যেই দেওয়ালে লোনা ধরা, প্লাস্টার খসে পড়া এবং গাঁথুনির স্থায়িত্ব কমে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও ভবনের মূল কাঠামো এখনো নিরাপদ রয়েছে।
একই ধরনের ত্রুটি পাওয়া গেছে মিঠামইনের বিরাটী ও কাঞ্চনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবনেও। সেখানে প্লাস্টারে হেয়ারলাইন ক্র্যাক, ছাদে লিকেজের চিহ্ন এবং নিম্নমানের ফিনিশিং ধরা পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও হাওড়ের আর্দ্র পরিবেশে এসব সূক্ষ্ম ফাটল ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অষ্টগ্রাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ছাত্রীনিবাসেও পাওয়া গেছে প্রকৌশলগত ত্রুটি। ছাদের প্রয়োজনীয় ঢাল ঠিকভাবে না থাকায় বর্ষায় পানি জমার ঝুঁকি রয়েছে। টাইলস বসানোর কাজেও নিম্নমানের ফিনিশিং এবং গাঁথুনিতে অতিরিক্ত ফাঁকা অংশ পাওয়া গেছে। সমীক্ষা দল এসব ত্রুটির জন্য অদক্ষ শ্রমিক ও দুর্বল তদারকিকে দায়ী করেছে।
নিকলী মুক্তিযোদ্ধা আদর্শ সরকারি কলেজের ভবনের মূল কাঠামো ভালো হলেও ফিনিশিংয়ে একাধিক দুর্বলতা ধরা পড়ে। গ্রিল ও ওয়েল্ডিংয়ের কাজ মানসম্মত হয়নি। দরজার চৌকাঠে তুলনামূলক নিম্নমানের কাঠ ব্যবহারের কারণে ইতোমধ্যে ফাটল দেখা দিয়েছে।
শুধু নির্মাণ ত্রুটিই নয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতাও ধরা পড়েছে। ভবন নির্মাণ শেষ হলেও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, বিজ্ঞানাগারের সরঞ্জাম ও আইসিটি যন্ত্রপাতি না থাকায় অনেক ভবন কার্যত অচল। ৩৬টি আসবাবপত্র প্যাকেজের মধ্যে মে ২০২৬ পর্যন্ত মাত্র ১৩টির কাজ শেষ হয়েছে। বাকি প্যাকেজগুলো দরপত্র পর্যায়ে রয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর চিত্র আইসিটি ল্যাবে। ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ১৫টি প্যাকেজ নির্ধারণ করা হলেও সমীক্ষার সময় পর্যন্ত একটিরও দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। ফলে আইসিটি ল্যাবের কক্ষ তৈরি হলেও সেখানে কম্পিউটার বা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পৌঁছানোর কোনো কার্যক্রমই শুরু হয়নি।
ফলে নতুন ভবন থাকার পরও শিক্ষার্থীরা আধুনিক শিক্ষা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি কিংবা বিজ্ঞান ও আইসিটি শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে পারছে না।
সমীক্ষায় প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ভবন হস্তান্তরের পর রক্ষণাবেক্ষণের কোনো কার্যকর এক্সিট প্ল্যান নেই। ভবিষ্যৎ সংস্কার বা বড় ধরনের মেরামতের জন্যও আলাদা কোনো তহবিল রাখা হয়নি। অথচ হাওড় অঞ্চলে আগাম বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও ঢেউয়ের কারণে ভবনের ভিত্তি ক্ষয়ের ঝুঁকি অনেক বেশি।
এ ছাড়া প্রয়োজনীয় রিটেইনিং ওয়ালও অনেক স্থানে নির্মাণ হয়নি। কোথাও জায়গার সংকটে আংশিক নির্মাণ হয়েছে, কোথাও নির্মিত দেওয়াল পুরো এলাকা সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়।
প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অডিট পর্যবেক্ষণ। ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে প্রকল্পে ১৪টি অডিট আপত্তিতে ৩৪ কোটি ২৩ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। একটিও নিষ্পত্তি হয়নি।
অডিটে অতিরিক্ত পাইল, রড ও কংক্রিট দেখিয়ে বিল পরিশোধ, ব্যবহার না করা রডের মূল্য দেখানো, স্পেসিফিকেশন বহির্ভূত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, চুক্তির আগেই বিল পরিশোধ, টেস্ট রিপোর্ট ছাড়াই অর্থ ছাড়, বিলম্ব জরিমানা আদায় না করা, ভুয়া কারিগরি টেস্ট রিপোর্ট গ্রহণ, পারফরম্যান্স সিকিউরিটির মেয়াদ না বাড়িয়ে বিল দেওয়া এবং সরকারি ভ্যাট-রয়্যালটি আদায়ে ব্যর্থতার মতো অনিয়ম উঠে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে আইএমইডি দ্রুত সব অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি, প্রকল্পের জন্য কার্যকর সাসটেইনেবিলিটি ও এক্সিট প্ল্যান প্রণয়ন, ভবন রক্ষণাবেক্ষণের স্থায়ী তহবিল গঠন, নির্মাণকাজের সঙ্গে আসবাবপত্র ও আইসিটি সরঞ্জাম সরবরাহের সমন্বয় এবং হাওড় অঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় ভবিষ্যৎ প্রকল্পের নকশা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অডিট আপত্তি ঝুলে থাকা এবং একই প্রকল্পে নির্মাণ ত্রুটি, আর্থিক অনিয়ম ও বাস্তবায়ন দুর্বলতা একসঙ্গে পাওয়া যাওয়ায় উচ্চপর্যায়ের একটি টাস্কফোর্স গঠন করে তদন্তেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
আইএমইডি বলছে, প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ইতিবাচক হলেও নির্মাণমানের দুর্বলতা, বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা, রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনার অভাব এবং বিপুল অঙ্কের অডিট আপত্তি প্রকল্পটির কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। সময়মতো এসব দুর্বলতা দূর করা না গেলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোর একটি অংশ অল্প সময়ের মধ্যেই কাঙ্ক্ষিত সুফল হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
প্রকল্পটির পরিচালক মো. শাহজাহান আলীকে গত সপ্তাহে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। অনিয়মের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, প্রকল্পটি ২০১৮-১৯ সালের দিকে শুরু হয়েছে। আমি দায়িত্বে এসেছি ২০২৫ সালে। এর আগের অনিয়মের ব্যাপারে বলতে পারছি না। দু-এক জায়গায় কাজে সমস্যা হয়েছিল সেগুলো ঠিক করা হয়েছে। অডিট আপত্তির জবাব দেওয়া হয়েছে।

