ইরান-ওমান চুক্তিতেও খুলবে না হরমুজ
‘শুধু বিমান হামলায় ইরানকে হারানো যাবে না’
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে কেবল এ চুক্তির মাধ্যমেই জলপথটি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে না। ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি শনিবার বলেছে, হরমুজ খোলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তাদের শর্ত মানতে হবে। ইরানের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আশাবাদ প্রকাশের মধ্যেই এ খবর এলো। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের প্রধান জেনারেল ড্যান কেইন মনে করছেন, শুধু বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে এ যুদ্ধে লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় তেহরান। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছে। ইরান হরমুজ দিয়ে অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ চলাচল করলে সেগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাত বলেছে-হরমুজ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। তারা এ হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নতুন একটি নৌচলাচল পথ চালুর বিষয়ে ইরান ও ওমান সমঝোতার ‘খুব কাছাকাছি’ পৌঁছেছে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ অন্যান্য শর্তের ওপর নির্ভর করছে। তিনি বলেন, এ প্রণালি দিয়ে নৌচলাচল ব্যবস্থাপনার যে পূর্ববর্তী পদ্ধতি বা ‘ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম’ ছিল, তা তেহরানের কাছে আর গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি জানান, স্থায়ী পথের বিষয়ে কারিগরি ও আইনি বিষয়গুলোর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত ইরান ওমানের সঙ্গে অস্থায়ী পথ চালুর বিষয়ে আলোচনা করছে।
সূত্র জানায়, ওমানের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। ফার্স নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন-নেতৃত্ব যা-ই সিদ্ধান্ত নিক না কেন, ইরানিরা তার পাশে ‘শেষ পর্যন্ত’ অটল থাকবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের যুদ্ধ-কমান্ডাররা আমার বা আপনার চেয়ে ভালো জানেন-আমাদের লড়াই করা উচিত কি না। তারা নিজেদের শক্তির বিষয়টি জানেন। নেতৃত্বই সিদ্ধান্ত নেয় এবং তারা যে সিদ্ধান্তই নিন না কেন, আমরা শেষ পর্যন্ত তার পাশে থাকব।’
চুক্তি হলে ইরানের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া হবে-মার্কিন কর্মকর্তা : সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন বারবার ইঙ্গিত দিয়েছে-প্রণালিটি খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি চুক্তি হয়তো সন্নিকটে। অথচ ইরান বরাবরই এমন কোনো আলোচনা চলার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। তবে আলোচনার এ নতুন তৎপরতা কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি করবে কি না, তা এখনো অস্পষ্ট। শুক্রবার রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমান ও ইরানের মধ্যে অগ্রগতি হয়েছে; আমরা শিগগিরই একটি চুক্তির আশা করছি। কোনো বাধা ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরুর বিষয়টি নিয়ে চুক্তি ঘোষিত হওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেবে।’ তবে শনিবার আইআরজিসি জানায়, হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি ইরানের শর্তাবলি মেনে নেওয়া ও ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল এবং এর সঙ্গে ইরান-ওমান আলোচনার কোনো সম্পর্ক নেই। আইআরজিসি মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি সুনির্দিষ্টভাবে শর্তগুলোর কথা উল্লেখ না করলেও বলেন, আঞ্চলিক আলোচনার প্রক্রিয়ায় ওয়াশিংটনকে অবশ্যই হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।
জ্বালানির দাম বাড়ছে : ইরান হরমুজ প্রণালি খুলবে না-এমন খবরে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। ওয়েলপ্রাইস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেল ৮৩ দশমিক ৫৫ ডলারে বিক্রি হয়, যা আগের দিনের চেয়ে ১ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ বেশি।
শুধু বিমান হামলায় ইরানকে হারানো যাবে না : এদিকে ইরান এ যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খোঁজার কথা বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের প্রধান জেনারেল ড্যান কেইন। তিনি মনে করছেন, যুদ্ধ আরও জোরদার করতে যেসব সামরিক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র বিবেচনায় রেখেছে, সেগুলো উলটো ফল দিতে পারে। আর শুধু বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে এ যুদ্ধে লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা কম। বিষয়টি সম্পর্কে জানাশোনা আছে-এমন তিনটি সূত্র সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছে। ওই সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধ শেষ করতে হামলা চালানোর বাইরে বিকল্প পথ খুঁজতে কয়েক সপ্তাহ ধরেই তৎপরতা চালাচ্ছেন কেইন। এরই মধ্যে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ। কেইনসহ ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা এখন মনে করেন, বিমান হামলা চালিয়ে ইরানকে পরাস্ত করার সম্ভাবনা কম।
সূত্র বলছে, ইরানের হামলা বাড়ানোর নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি কেইন ও অন্য কর্মকর্তারা যুদ্ধ থেকে ‘বের হওয়ার এমন একটি পথ’ খুঁজছেন, যাতে অন্তত ট্রাম্প একটি ‘প্রতীকী বিজয়’ দেখাতে পারেন। এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট জনগণের কাছে নিজের সাফল্য হিসাবে তুলে ধরতে পারবেন, আবার সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার পথও বন্ধ হবে না। এর শুরু হতে পারে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার একটি চুক্তির মাধ্যমে।
