লোডশেডিং সমন্বয় ও দিন গোনা ছাড়া উপায় নেই: জ্বালানিমন্ত্রী
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘দেশে গ্যাসের সংকট এতটাই বেড়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার কারখানায় প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য জ্বালানি সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চাহিদার মাত্র ২৯ শতাংশ গ্যাস পাচ্ছে। সার কারখানাগুলোতে সরবরাহ হচ্ছে ৩৮ শতাংশ। এর প্রভাব পড়েছে শিল্প উৎপাদনেও। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের করণীয় সীমিত বলে স্বীকার করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) মেরামত না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং সমন্বয় ও অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘নেভিগেটিং বাংলাদেশ এনার্জি ক্রাইসিস : ইমিডিয়েট প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড দ্য পাথ টু এ সাসটেইনেবল এনার্জি ফিউচার’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এই সংলাপের আয়োজন করে।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার কারণেই চলমান সংকট শুরু হয়েছিল। এই সংকটে সরাসরি কিছু করার সুযোগ সীমাবদ্ধ। কারণ নতুন করে হঠাৎ গ্যাস উত্তোলন করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি এফএসআরইউ সচল না থাকা পর্যন্ত বিদ্যমান গ্যাস খালাস করে জাতীয় গ্রিডে দেওয়াও সম্ভব নয়। বর্তমান ব্যবস্থাপনা কৌশল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী জানান, বিদেশি প্রকৌশলীরা যতক্ষণ পর্যন্ত এফএসআরইউ মেরামত শেষ না করছেন, ততক্ষণ অপেক্ষা ছাড়া গতি নেই।
মন্ত্রী বলেন, ‘এখন কিছু ম্যানেজমেন্ট করা দরকার, যাতে কম লোডশেডিং হয়। যাতে আমি ইন্ডাস্ট্রিতে (শিল্প-কারখানা) গ্যাস দিতে পারি, এই ম্যানেজমেন্ট করা এখন জরুরি। এছাড়া আমার হাতে আর কী থাকতে পারে।’
তিনি বলেন, এলএনজি টার্মিনাল মেরামতে যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। তবে মেরামত শেষে নতুন দুটি বয়লার একসঙ্গে চালু করতে হবে। কারিগরি সমন্বয়ের জন্য তখন পুরো সিস্টেম টানা ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন বন্ধ রাখা লাগবে বলেও সতর্ক করেন মন্ত্রী। মন্ত্রী বলেন, যার প্রভাবে সাময়িকভাবে দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেবে।
গ্যাসের চাহিদা মেটাতে ২০২৯ সালকে লক্ষ্য করে অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার পরিকল্পনা নিয়েছে উল্লেখ করে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ইতোমধ্যে একটি নতুন এফএসআরইউর অর্ডার দেওয়া হয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরও তিনটি এফএসআরইউ বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, শিল্পে গ্যাস সংকট কমাতে বিকল্প নানা উপায় খোঁজা হচ্ছে। এর মধ্যে ভোলা থেকে কনটেইনার ট্রাকে করে গ্যাস কারখানায় পৌঁছে দিতে একটি কোম্পানিকে ৩০টি ট্রাক চলাচলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরাসরি কনটেইনারের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের সুবিধা তৈরি করতে মালয়েশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলছে সরকার।
ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ‘গরিবের টেসলা’ হিসাবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এগুলোর বেশির ভাগই রাত ১২টার পর অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে চার্জ দেওয়া হয়। এর ফলে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহারের সময় (পিক আওয়ার) বদলে রাত ১২টায় গিয়ে ঠেকছে এবং মোট চাহিদা বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাচ্ছে। তবে এসব অবৈধ বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে অনেক জায়গায় সরকারি কর্মচারীরা হামলার শিকার হচ্ছেন।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির সিনিয়র গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবির। তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি খাতে সংকট এখন গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর পেছনে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা ও দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৮৪ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। বিপরীতে নবায়নযোগ্য উৎসের অংশ মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে জ্বালানি আমদানির চাপ বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অস্থায়ী ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। অন্তত ১০ বছরের সমন্বিত নীতি গ্রহণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাজারভিত্তিক মূল্যনীতি এবং লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির ঘাটতিও সংকটকে তীব্র করছে। অতীতের সুশাসনের ঘাটতি ও সংস্কারহীনতা কাটিয়ে শিল্প, কৃষি ও সাধারণ মানুষের স্বস্তির জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
শিল্প খাতে সংকটের প্রভাব তুলে ধরে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ সংকটে কারখানার উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। এতে শিল্প খাত বড় ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়েছে। সংকটের খবর বিদেশে ছড়িয়ে পড়ায় তৈরি পোশাকশিল্পের অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেনের মতে, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে যথাযথ মূল্যনীতি না থাকা এবং সিস্টেম লস দায়ী। তার মতে, বছরের পর বছর সমস্যাকে জমতে দেওয়ার কারণেই সংকট এতটা গভীর হয়েছে। শুধু সরবরাহ বাড়ানোর দিকে না তাকিয়ে জ্বালানির চাহিদা ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
