কলকাতার হোটেলে আগুনে আট বাংলাদেশির মৃত্যু
স্ত্রী-সন্তানসহ প্রাণ গেল সাংবাদিক দেবাশীষের * বেশির ভাগই গিয়েছিলেন চিকিৎসা করাতে * হোটেলটিতে অগ্নিনিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন, কলকাতা, কুষ্টিয়া ও সাভার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কলকাতায় মির্জা গালিব স্ট্রিটের আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে ছেলে সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ পরিবারের চারজনকে হারিয়ে মা স্বপ্না দত্তসহ স্বজনদের আহাজারি। বুধবার কুষ্টিয়া শহরের বাড়িতে -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সকালের ফ্লাইটে দেশে ফেরার কথা ছিল পরিবারটির। ব্যাগ গোছানো, কেনাকাটা-সব শেষ। শুধু একটি রাতের অপেক্ষা। কিন্তু সেই রাতই কেড়ে নিল সব। বেঙ্গালুরুতে স্ত্রীর চিকিৎসা শেষে কলকাতায় যাত্রাবিরতিতে ওঠা হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারালেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, স্ত্রী, তিন বছরের শিশুসন্তান আর শ্বশুর। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় আবাসিক হোটেলের এই আগুন কেড়ে নিয়েছে ৮ বাংলাদেশির প্রাণ। ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার রাত পৌনে ২টার দিকে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ নামের পাঁচতলা আবাসিক হোটেলটিতে এ আগুন লাগে। তাদের অভিযোগ, ঘুপচি ঘর, সরু একটিমাত্র চলাচলের পথ আর অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থার অভাবেই মৃত্যু এত বেশি। নিহতদের বেশির ভাগই চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন এবং দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, পাঁচতলা ভবনটির মূল প্রবেশপথ প্রায় পাঁচ ফুট চওড়া। ভবনের বিভিন্ন তলায় মোট ছয়টি হোটেল চলছিল। ভেতরে ছিল ঘরের পর ঘর আর সরু, বাঁকানো লোহার সিঁড়ি। সামনের চলাচলের পথও ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ। জরুরি অবস্থায় দ্রুত বের হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ভবনটিতে অগ্নিনিরাপত্তার জন্য আলাদা বের হওয়ার পথও ছিল না। এ ঘটনায় পুলিশ মামলা করেছে। পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। হোটেল মালিকের এখনো খোঁজ মেলেনি। ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ জানায়, অগ্নিকাণ্ডে ৮ বাংলাদেশিসহ ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে পাঁচ বাংলাদেশির পরিচয় মিলেছে। তারা হলেন-কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শিম্মিন, তাদের শিশুসন্তান শর্ণশিষ দত্ত, আফসানার বাবা মো. আকরাম আলী এবং ঢাকার সাভারের বেগুনবাড়ী এলাকার আহমেদ বাবু। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ভারতের ঝাড়খণ্ডের গিরিডি জেলার সন্দীপ পাসওয়ান। এছাড়া আহত অবস্থায় অন্তত ৮ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বুধবার সকালে ঘটনাস্থলে যান পুর ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় ও দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী। অগ্নিমিত্রা পাল প্রশ্ন তোলেন, একটি এসির জন্য অনুমতি নিয়ে কীভাবে হোটেলে ১০টি এসি চালানো হয়েছিল। কারা পারমিশন দিল? কারা ট্রেড লাইসেন্স দিল? একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ১৫ বছর ধরে এই ধরনের হোটেলে কোনো অগ্নিনিরাপত্তা অডিট হয়নি।
দমকল প্রতিমন্ত্রীও সরু সিঁড়ি, জরুরি বহির্গমন পথের অভাব এবং একই ভবনে একাধিক হোটেল চলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এ ঘটনায় গভীর শোক জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি প্রাণহানির ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন এবং নিহতদের স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানান। আরও শোক জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
লাশ দ্রুত দেশে আনা হবে-পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী : বাংলাদেশিদের লাশ শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। বুধবার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এ কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখন পর্যন্ত জানা গেছে, ওই হোটেলে পাঁচজন বাংলাদেশি ছিলেন এবং স্থানীয় পুলিশ তাদের শনাক্ত করতে পেরেছে। তিনি বলেন, কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার সার্বক্ষণিকভাবে বিষয়টির খোঁজখবর রাখছেন।
শামা ওবায়েদ বলেন, কলকাতায় বাংলাদেশের মিশন ইতোমধ্যে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাংলাদেশে যোগাযোগ করেছে। মৃতদের শনাক্তকরণ এবং প্রয়াজনীয় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব লাশগুলো দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কলকাতার মিশন কাজ করছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, নিহতরা শ্রমিক বা প্রবাসী কল্যাণের আওতাভুক্ত না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যবস্থা হয়তো এখানে সরাসরি প্রযোজ্য নয়। তবে নিহতদের পরিবার যদি লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার খরচ বহন করতে না পারে, তাহলে সরকার অবশ্যই বিষয়টি দেখবে।
কুষ্টিয়ার এক পরিবারের চারজনের মৃত্যু : সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ পরিবারের চারজন নিহত হয়েছেন। অন্যরা হলেন তার স্ত্রী আফশানা শিম্মিন (২৫), তিন বছরের ছেলে শর্ণশীষ দত্ত ও শ্বশুর আকরাম আলী (৬৪)। নিহত দেবাশীষের বাড়ি কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ায় এবং শ্বশুর আকরাম আলীর বাড়ি থানাপাড়া এলাকায়। চিকিৎসা করাতে তারা সপরিবারে ভারতের বেঙ্গালুরে গিয়েছিলেন।
একসঙ্গে পরিবারের চার সদস্যের এমন করুণ মৃত্যু কেউ মানতে পারছেন না। দেবাশীষ দত্ত কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার দিলীপ দত্তের ছেলে। সকালে দিলীপ দত্ত ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতির মৃত্যুর খবর পান। বুধবার দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, দেবাশীষ দত্তের বাড়িতে স্বজনদের কান্নায় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একমাত্র কলিজার টুকরা সন্তানকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা স্বপ্না দত্ত। তাকে আত্মীয়স্বজন সান্ত্বনা দিচ্ছেন। পাশের রুমে বাবা দিলীপ দত্ত নির্বাক বসে আছেন। আরেক রুমে দেবাশীষ দত্তের আট বছরের মেয়ে মহিমা দত্তকে সবাই জড়িয়ে ধরে কান্না করছেন। শিশু মহিমা কিছুই বুঝতে পারছে না। সে জানে না আর কোনোদিন ফিরবে না তার বাবা-মা।
দেবাশীষের মা স্বপ্না দত্ত বলেন, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। কালও তো ভালো মানুষটা আমার সঙ্গে কথা বলল। এখন আমার কী হবে। বাড়িতে আসা সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা বলেন, দেবাশীষ দত্ত শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন সহকর্মীদের আপনজন। তার সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে কুষ্টিয়া প্রেস ক্লাব, কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন।
ফেরা হলো না সাভারের আহমেদ বাবুর : ব্যবসায়িক কাজে কলকাতায় গিয়েছিলেন সাভারের আহমেদ বাবু। কলকাতায় যাওয়া তার নিয়মিত ব্যবসায়িক জীবনেরই অংশ ছিল। এবারও তেমনই স্বাভাবিক একটি সফরে গিয়েছিলেন। কিন্তু এবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। তার মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর সাভারের বেগুনবাড়ী এলাকার বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আহমেদ বাবুর বড় ভাই মনির বলেন, একদিনের জন্যই সে ব্যবসার কাজে ভারতে গিয়েছিল। এর আগেও প্রায়ই কলকাতায় যেত। এবার যে আর জীবিত অবস্থায় ফিরবে না, এটা কেউ ভাবিনি।
