Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

গ্রামের পণ্য যাবে বিশ্ববাজারে

কর্মসংস্থান হবে ৭৫ লাখ

Advertisement

এম শাহজাহান

এম শাহজাহান

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কর্মসংস্থান হবে ৭৫ লাখ

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

গ্রামভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে আধুনিক নকশা ও আন্তর্জাতিক বাজার উপযোগী করে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির নতুন দ্বার খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে শীতলপাটি, শতরঞ্জি, তাঁত, মৃৎশিল্প ও বুনন শিল্পের মতো পাঁচটি পণ্য নিয়ে ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ কর্মসূচির পাইলট প্রকল্প শুরু হচ্ছে। ধাপে ধাপে প্রতিটি গ্রামের সম্ভাবনাময় একটি পণ্যকে ব্র্যান্ডে পরিণত করার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে গ্রামেই তৈরি হবে ৭৫ লাখ কর্মসংস্থান। একই সঙ্গে দেশীয় ডিজাইনারদের নিয়ে গঠন করা হবে ন্যাশনাল পুল অব ডিজাইনার্স। পূর্বাচলে ১৬০ একর জমিতে গড়ে তোলা হবে সেন্ট্রাল ক্রিয়েটিভ হাব। আর এই হাব ঘিরেই ভবিষ্যতে সাংস্কৃতিক জেলা গড়ে তোলা হবে।

জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রথমবারের মতো ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির জন্য সরাসরি ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া দেশি-বিদেশি কিছু ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিতে বিশাল সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। গ্রামের একজন কারুশিল্পীর পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে নিতে হলে শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না। এজন্য প্রয়োজন মানসম্মত কাঁচামাল, আধুনিক ডিজাইন, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং, ই-কমার্স, ব্যাংক ঋণ, কপিরাইট ও জিআই সুরক্ষা, মান সনদ ও আন্তর্জাতিক ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। এসব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না হলে ক্রিয়েটিভ হাব শেষ পর্যন্ত শুধু অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ হতে পারে। সম্প্রতি পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক বৈঠকে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির বিষয়ে আলোচকরা নীতিগত সংস্কার, কর-সহায়তা, কপিরাইট সুরক্ষা, লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং টেকসই সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব¡ দেন। এতে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শুধু অবকাঠামো তৈরি করে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর নীতি ও টেকসই ব্যবস্থাপনার ইকো-সিস্টেম।

অর্থ বিভাগে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিসংক্রান্ত সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে-সরকারের লক্ষ্য ক্রিয়েটিভ শিল্পের অবদান বাংলাদেশের জিডিপিতে ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা। এর অংশ হিসাবে ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ নামে জাতীয় ব্র্যান্ড চালু, আন্তর্জাতিকমানের ফিল্ম স্টুডিও, ওটিটি খাতের উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সৃজনশীল পণ্য তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ওই সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধি ছাড়াও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভায় জানানো হয়, দেশের সৃজনশীল অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পূর্বাচলে ১৬০ একর জমিতে সেন্ট্রাল ক্রিয়েটিভ হাব, দেশীয় ডিজাইনারদের নিয়ে ‘ন্যাশনাল পুল অব ডিজাইনার্স’ এবং বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আঞ্চলিক ক্রিয়েটিভ হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনাও এগিয়ে চলছে।

পাঁচ পণ্য পাইলট প্রকল্পে : অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই আলোচনায় শীতলপাটি, শতরঞ্জি, তাঁতশিল্প, মৃৎশিল্প ও বুনন শিল্পসহ বিভিন্ন পণ্যের কথা উঠে আসে। সভায় প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এসএম জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, গত এক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা যাচাই করা হয়েছে। তিনি বলেন, কোন এলাকার কোন পণ্যকে কীভাবে ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাত করা যায়, সে বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়েই কাজ করতে হবে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজও কর্মসূচির আওতায় কারা এবং কীভাবে সহায়তা পাবেন, তার সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি আঞ্চলিক ভারসাম্য ও সব শ্রেণির মানুষকে কর্মসূচির আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন। সভায় ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ জানান, বাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ করে কোন এলাকায় কোন ধরনের পণ্য তৈরি হচ্ছে, তার ওপর ইতোমধ্যে কাজ করা হয়েছে। ব্র্যাক এ বিষয়ে ৩৩-৩৪টি ওরিয়েন্টেশন কর্মশালা করেছে। তিনি জানান, ‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৭৫ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

নতুন ৭৫ লাখ কর্মসংস্থান : এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে যে ৭৫ লাখ কর্মসংস্থানের কথা বলা হচ্ছে, তা শুধু পণ্য তৈরির কারিগর বা উদ্যোক্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। গ্রামভিত্তিক একটি পণ্যকে উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খলের বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। প্রথমত, উৎপাদন খাতে তাঁতি, কারুশিল্পী, মৃৎশিল্পী, বাঁশ-বেতশিল্পী, কৃষক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী ও অন্যান্য দক্ষ কারিগরের কাজ বাড়বে। দ্বিতীয়ত, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং খাতে মেশিন অপারেটর, প্যাকেজিং কর্মী, লেবেলিং ও সংরক্ষণকর্মীর প্রয়োজন হবে। তৃতীয়ত, মান নিয়ন্ত্রণ ও ডিজাইন খাতে পণ্য ডিজাইনার, মান যাচাইকারী, পণ্য উন্নয়ন কর্মকর্তা ও কারিগরি প্রশিক্ষকের কর্মসংস্থান হবে। চতুর্থত, পরিবহণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সংগ্রহকারী, গুদামকর্মী, চালক ও ডেলিভারিকর্মীর চাহিদা বাড়বে। এছাড়া বিপণন ও বিক্রয় খাতে বিক্রয়কর্মী, বাজারসংযোগ কর্মকর্তা, ই-কমার্স উদ্যোক্তা, ডিজিটাল মার্কেটার ও রপ্তানি সহায়তাকারীর সুযোগ তৈরি হবে। এসব পণ্য ঘিরে গড়ে উঠতে পারে গ্রামীণ পর্যটন, প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্রভিত্তিক কর্মসংস্থানও। এতে সব মিলিয়ে গ্রামেই ৭৫ লাখ মানুষের নতুন কর্মসংস্থান হবে বলে মনে করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক।

বিবি রাসেলের নেতৃত্বে ডিজাইনার পুল : গ্রামীণ পণ্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো আধুনিক নকশা ও আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী উপস্থাপন। এ সমস্যা সমাধানে দেশীয় খ্যাতিমান ডিজাইনারদের সমন্বয়ে ‘ন্যাশনাল পুল অব ডিজাইনার্স’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সভায় ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলকে যুক্ত করে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে এ পুল গঠনের জন্য সভা আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে স্থানীয় কারুশিল্পীদের সঙ্গে পেশাদার ডিজাইনারদের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হবে। এছাড়া আসন্ন শীতে জব্বারের বলীখেলা, বনবিবি উৎসবের মতো স্থানীয় ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, সৃজনশীল অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রয়েছে আত্মকর্মসংস্থানে। কনটেন্ট নির্মাতা ও ফ্রিল্যান্সাররা ইতোমধ্যে স্টার্টআপ ও নতুন উদ্যোগ তৈরি করছেন। তাদের উৎসাহ দেওয়া গেলে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি বড় ধরনের আত্মকর্মসংস্থানের উৎস হতে পারে। সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিতে বরাদ্দের আকারের চেয়ে অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং তার বিপরীতে কতটা উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বাজার তৈরি হচ্ছে-সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম