স্পটে হতাশাজনক অংশগ্রহণ
সেপ্টেম্বরেও কঠিন গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের জন্য এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) দিতে রাজি হয়নি কোনো সরবরাহকারী। আর শেষ সপ্তাহের জন্য এলএনজির দাম চাওয়া হয়েছে অস্বাভাবিক। এ কারণে সেপ্টেম্বরজুড়ে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা কঠিন হয়ে পড়েছে। সোমবার বিকালে স্পট মার্কেটে চার কার্গো এলএনজি কেনার আন্তর্জাতিক টেন্ডার দুটিতে (৮-৯ সেপ্টেম্বর এবং ১-২ অক্টোবর) কার্গো সরবরাহ দিতে কেউ অংশ নেয়নি। বাকি দুটি (২৫-২৬ সেপ্টেম্বর এবং ৫-৬ অক্টোবর) কার্গোর দর পড়েছে অস্বাভাবিক। প্রতি ইউনিট ২৫ দশমিক ৯২ ডলার।
এদিকে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বাড়ার কারণে প্রতি মাসে সরকারকে গ্যাস খাতে লোকসান দিতে হয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। গ্যাসের এই উচ্চমূল্য থাকলে চলতি বছর এলএনজি আমদানি করে সরকারকে লোকসান দিতে হবে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই লোকসান ছিল মাত্র ৬ হাজার কোটি টাকা।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সেপ্টেম্বরে গ্যাসের পুরো সরবরাহ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল রোববার। বলা হয়েছিল, যে কোনোভাবে দেশে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে হবে। বাঁচাতে হবে শিল্পকারখানা। সেই হিসাবে রোববার রাতে জরুরি ভিত্তিতে চার কার্গো এলএনজির জন্য স্পট মার্কেটে টেন্ডার আহ্বান করে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি-আরপিজিসিএল। সোমবার বিকাল ৪টার পর সেই টেন্ডার উন্মুক্ত করে হতাশ হন সরকারি কর্মকর্তারা। কারণ, সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সরবরাহ দেওয়ার মতো কোনো কার্গো পাওয়া যায়নি। ৬ সেপ্টেম্বর ব্ল্যাক কিউব ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি কোম্পানি সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় এক কার্গো এলএনজি সরবরাহ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা সেই কার্গো দেওয়ার নিশ্চয়তা এখনো দেয়নি। তাই বিকল্প হিসাবে আরপিজিসিএল স্পটে সেপ্টেম্বরে জন্য এক কার্গো এলএনজি কেনার টেন্ডার দিয়েছিল। সেটি সরবরাহ দিতে কেউ রাজি হয়নি। এর অর্থ হচ্ছে সেপ্টেম্বরের প্রথম এবং দ্বিতীয় সপ্তাহে গ্যাসের রেশনিং থাকতে পারে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সোমবারের স্পট মার্কেটে ৪টির মধ্যে ২টি কার্গো সরবরাহকারীর দর নিয়ে হতাশ সংশ্লিষ্টরা। কারণ যে দুটি কার্গো দিতে দর দিয়েছে, তাও অস্বাভাবিক বলে মনে করেন সরকারি কর্মকর্তারা। ওই ২টিতে দর পড়েছে ২৫ দশমিক ৯২ ডলার। জাপান-কোরিয়া প্রাইজ ইনডেক্স-জেকেএম অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে এলএনজির দাম হচ্ছে প্রতি ইউনিট ২২ দশমিক ৯৫ থেকে ২৩ দশমিক ৫০ ডলার। সেখানে প্রায় ২৬ ডলার সরকারের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, সাধারণ জেকেএম ইনডেক্স ধরে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা হয়। খুব অল্প সময়ে এলএনজি সরবরাহ দিতে হলে দাম কিছুটা বাড়তে পারে। কিন্তু প্রতি ইউনিটে ২/৩ ডলারের ব্যবধান চিন্তার বিষয়। এর আগে আগস্টে এমন এক কার্গো ২৫ ডলারের বেশি প্রস্তাব করায় ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি অনুমোদন করেনি। প্রসঙ্গত, প্রতি কার্গো এলএনজি কিনতে সরকারকে এখন ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ৮০ কোটি টাকা খরচ করতে হয়।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, স্পট মার্কেটে ওই চার কার্গোতে ইতিবাচক সাড়া পাবে বলে মনে করেছিল সরকার। এজন্য সোমবার রাতে জরুরি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক ডাকা হয়েছিল। উচ্চমূল্যের এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব অনুমোদন নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি জ্বালানি বিভাগ। তাই পরে মন্ত্রিসভার ওই বৈঠক স্থগিত করে দেওয়া হয়। সেপ্টেম্বর মাস শুরু। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, আজ সৌদি আরামকোর একটি কার্গো আসার কথা রয়েছে। এরপর ৪ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, ১০ সেপ্টেম্বর সৌদি আরামকোর আরও একটি কার্গো, ১৩ সেপ্টেম্বর পসকো, ১৬ সেপ্টেম্বর গানবোর, ১৮ সেপ্টেম্বর আরামকো, ২৩ সেপ্টেম্বর টোটাল এবং ২৮ সেপ্টেম্বর গানবোর কোম্পানির আরও একটি কার্গো আসার সূচি ঠিক করা হয়েছে।
কিন্তু গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে হলে চলতি মাসে আরও দুটি কার্গোও প্রয়োজন হবে। দেশে এখন দৈনিক গড়ে ২৩৫ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করছে পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে দৈনিক ৭১ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস। যদিও এ দুই টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ দেওয়ার সক্ষমতা আছে ১১০ কোটি ঘনফুট।
ভর্তুকি নিয়ে চিন্তিত সরকার : প্রতি মাসে ১০টি এলএনজি কার্গোর মধ্যে ৭/৮টি কেনা হয় স্পট মার্কেট থেকে। স্পট মার্কেটে প্রতি কার্গো গ্যাস কিনতে বিল দিতে হয় প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। কিন্তু এ গ্যাস বিক্রি করে সরকার পায় মাত্র ৩৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি কার্গোতে লোকসান ৭০০ কোটি টাকার বেশি। এই হিসাবে প্রতি মাসে এখন সরকারকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি কিনে বাড়তি লোকসান দিতে হচ্ছে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
আগস্টের জন্য সরকার এলএনজি আমদানি করতে পেট্রোবাংলাকে ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। সেপ্টেম্বরের ভর্তুকির টাকা আজ-কালের মধ্যে চাওয়া হবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে। এলএনজির দাম বাড়ার কারণে এখন প্রতি ইউনিট মিশ্রিত (দেশি এবং এলএনজি) গ্যাসের দাম গিয়ে ঠেকেছে ৪৫ টাকা। ৬ মাস আগে এই দাম ছিল ৩১ টাকা ৪২ পয়সা। আর সরকার বিক্রি করছে ২৩ টাকা ৯০ পয়সা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত অর্থবছর এলএনজি আমদানি করে সরকারের লোকসান হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। এবার এই লোকসান আরও বাড়বে। এর অন্যতম কারণ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। এই যুদ্ধের কারণে কাতার ও ওমান দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এতে বাংলাদেশকে স্পট মাকের্ট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে অনেক দামে।

