৩১ হাজার কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন
পুলিশবাহিনীকে ঢেলে সাজানোর ছক
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকার বিশাল বরাদ্দ। লক্ষ্য-পুরোনো কাঠামো ভেঙে পুলিশকে নতুন করে সাজানো। তাগিদ রয়েছে অভ্যন্তরীণ সংস্কারেরও। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের ক্ষত, বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ভূমিকা, মাঠপর্যায়ে পুলিশের ভেঙে পড়া এবং তাদের সক্ষমতার দিকটি সামনে রেখে এবার বাহিনীতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ছক কষা হচ্ছে। থানায় যানবাহন সংকট থেকে শুরু করে আধুনিক সরঞ্জাম, এআই প্রযুক্তির ব্যবহার, বডি ক্যামেরা, জনবল বৃদ্ধি-সবকিছু মিলিয়ে পুলিশবাহিনীকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে বিতর্কিতদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং র্যাবের নাম ও কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়টিও। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ১৩ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে কমিটির সভাপতি ও বরিশাল-৩ আসনের সরকারদলীয় সংসদ-সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সংসদীয় কমিটির মতে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশের ভাবমূর্তির যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে জনগণের আস্থা ফেরানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই আস্থা ফেরাতে একদিকে বিতর্কিত ভূমিকার তদন্ত ও দায় নির্ধারণ, অন্যদিকে সক্ষমতা ও পেশাদারি বাড়ানোর লক্ষ্যে গৃহীত এ উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, সেটও নজরে রাখা হবে।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, মীর শাহে আলম, মিঞা নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপু, মো. কামরুজ্জামান, মোনোয়ার হোসেন, শিরীন সুলতানা, মো. নূরুল ইসলাম ও মো. আব্দুল বাতেন অংশ নেন। এছাড়া স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি), র্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পাসপোর্ট অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে পুলিশকে দলীয় বাহিনীতে পরিণত করা হয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বর্তমান সরকার এ বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, সংস্কারের এই ছকে একদিকে যেমন রয়েছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ, অন্যদিকে রয়েছে পুলিশের ভেঙে পড়া সক্ষমতা পুনর্গঠনের পরিকল্পনা। মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট কাটাতে ১০ হাজার নতুন কনস্টেবল নিয়োগ ও যানবাহনের সংকট মোকাবিলায় ২ হাজার ৫৮৯টি গাড়ি কেনা। দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা বাড়াতে বাহিনীর সদস্যদের বডি ক্যামেরা ব্যবহারেও দেওয়া হচ্ছে বিশেষ গুরুত্ব। এছাড়া জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা যাচাই করে দায় নির্ধারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের গুরুত্ব, সংশ্লিষ্টতার ধরন এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সংসদীয় কমিটির মতে, এর মধ্য দিয়ে পুলিশবাহিনীতে একটি নতুন কাঠামো তৈরি করতে চায় সরকার।
থানায় গাড়ি সংকট : সংস্কারের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো। অনেক থানায় প্রয়োজনীয় যানবাহন নেই। কোথাও পুরোনো গাড়ি দিয়েই চলছে পুলিশের দৈনন্দিন কার্যক্রম। ফলে অপরাধস্থলে দ্রুত পৌঁছানো, আসামি গ্রেফতার কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশের তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে। এ সংকট নিরসনে নতুন করে ২ হাজার ৫৮৯টি গাড়ি ও জরুরি সরঞ্জাম কেনার জন্য বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
১০ হাজার নতুন কনস্টেবল : বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ইতোমধ্যে প্রায় ২৭ হাজার কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছর আরও ১০ হাজার কনস্টেবল নিয়োগের পরিকল্পনাসহ স্থগিত থাকা ২ হাজার এসআই পদে মেধা-স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বিচারব্যবস্থা আধুনিকায়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল কোডিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। কমিটির মতে, মাঠপর্যায়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও পেশাদারি নিশ্চিতের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।
বডি ক্যামেরায় জবাবদিহি : পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের সময় বডি ক্যামেরা ব্যবহারের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। এতে পুলিশের কার্যক্রমের ভিডিও রেকর্ড থাকবে। ফলে কোনো ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে কিংবা পুলিশের ওপর অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া সহজ হবে। সংসদীয় কমিটির মতে, বডি ক্যামেরার ব্যবহার পুলিশের জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সদস্যদের আরও সতর্ক করবে।
নিয়োগসহ কেনাকাটায় অনিয়ম ঠেকাতে নজরদারি : পুলিশের জন্য প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকার বাজেটের আওতায় নতুনভাবে নেওয়া উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। বৈঠকে উপস্থাপন করা তথ্যানুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালন বাজেট রাখা হয়েছে ২৮ হাজার ৬৩৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং উন্নয়ন বাজেট ২ হাজার ৪৬০ কোটি ২১ লাখ টাকা। জনবল, যানবাহন, সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাহিনীর সদস্যদের মনোবল ফেরাতেও নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। তবে এত বড় বাজেটের অর্থব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হবে বড় পরীক্ষা-এমনটা মনে করছে কমিটি। নিয়োগসহ গাড়ি ও সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়ম ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে মত দেন তারা।
র্যাবেও বড় পরিবর্তনের আভাস : পুলিশবাহিনীর পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র্যাব। বাহিনীর নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা হয়েছে। এ সময় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শুধু নাম নয়, র্যাবের কাঠামো, দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়েও পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে নতুন নাম কী হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংসদীয় কমিটির মতে, র্যাবকে ঘিরে অতীতের বিতর্ক এবং মানবাধিকার নিয়ে ওঠা প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে বাহিনীর ভবিষ্যৎ কাঠামো ও কার্যক্রম নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সংসদীয় কমিটির মতে, র্যাবের সংস্কার শুধু নাম, জনবল কিংবা সরঞ্জাম পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। তাদের মতে, এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক বাহিনী। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, র্যাব বিলুপ্ত না করে নাম পরিবর্তন এবং নতুন কাঠামোগত আইনের মাধ্যমে ঢেলে সাজানো হচ্ছে।
মাদক, চাঁদাবাজি, সাইবার অপরাধ বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি : বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের কথা জানানো হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি রোধে পেনাল কোডের আইনি দুর্বলতা দূর করা, ব্যবসায়ীদের সুরক্ষায় পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করা এবং চাঁদাবাজদের চিহ্নিত করতে কার্যকর উদ্যোগের জন্য বলা হয়। পাশাপাশি সাইবার অপরাধ ও জুয়া বন্ধে ১৮৬৭ সালের পুরোনো আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। কমিটি মাদকসংক্রান্ত মামলার এজাহার তৈরিতে শতভাগ নিখুঁত ও সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করার জন্য সুপারিশ করে। যাতে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে অপরাধী বের হয়ে আসতে না পারে।
