নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি নিয়ে ব্যবসায়ীরা
দায়ী চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগী
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। ভোজ্যতেল, চিনির দাম নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর। এক্ষেত্রে মিলমালিকদের দায় আছে। তাই কারসাজির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ রোধে নিয়মিত মনিটরিং অব্যাহত রাখতে হবে। তাহলেই কেবল রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই ভবনে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরা এ অভিমত তুলে ধরেন। গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআই প্রশাসক ফজলুল হক।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বলেন, পণ্য সাপ্লাই চেইনে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য আছে। রাস্তায় চাঁদাবাজিও হয়। এ কারণে ৩০ টাকার সবজি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়। বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারকে এসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। শ্যামবাজার কৃষিপণ্য আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি ফরিদ উদ্দিন বলেন, মুনাফাখোর ব্যবসায়ীর কারণে সব ব্যবসায়ীকে অপবাদ শুনতে হয়। করপোরেট ব্যবসায়ীরা ৫০ টাকার মিনিকেট চাল প্যাকেটজাত করে ৭০ টাকায় বিক্রি করছেন। অথচ মিনিকেট নামে কোনো ধানের জাত নেই। তিনি আরও বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীরা ২৫ শতাংশ নিয়ে যাচ্ছেন। বাজারে চাঁদাবাজি আছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও এ কাজে জড়িত। শ্যামবাজারে পুলিশ চাঁদা তোলে। যখন পুলিশ চাঁদা তোলে, তখন চাঁদাবাজ-টাউটরা তো চাঁদা নেবেই।
খিলগাঁও (তালতলা) সিটি করপোরেশন সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব কাজী আনিসুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে স্বস্তিতে ব্যবসা করতে পারতাম। ফকিরাপুল বাজার সাধারণ ব্যবসায়ী সমিতির শওকত হোসেন বলেন, প্রতিটি বাজারে কন্ট্রোলার আছে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, সেই সরকারের লোক বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।
বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, মনিটরিংয়ের অভাবে বাজার অস্থিতিশীল থাকে। তা না হলে দেশে কী এমন হয়ে গেছে, এক রাতের ব্যবধানে ৫০ টাকার জিনিস ৭০ টাকা হয়ে যায়। এই সিন্ডিকেট দেখাও যায় না, ছোঁয়াও যায় না। কিন্তু গায়ে লাগে।
পালস অ্যান্ড ল্যান্টিল ক্রাশিং মিলমালিক সমিতির বিকাশ চন্দ্র সাহা বলেন, ১০ দিনের ব্যবধানে ডাবলি ও ছোলার দাম কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেড়েছে। কেন বেড়েছে তার সদুত্তর কোথাও নেই। সিটি গ্রুপ সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় কেউ কেউ বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন।
রুটি-বিস্কুট প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, অর্থমন্ত্রী যেদিন বললেন, বাজারে পণ্যের দাম বাড়তে পারে, এর পরদিনই পণ্যের দাম বেড়ে গেল। বেকারিতে ময়দা, তেল ও চিনির দাম এমন বেড়েছে যে, গত তিন মাসে ২০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে এক হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। ময়দা, তেল ও চিনির দাম বাড়ায় আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে রুটি-বিস্কুটের দাম ২০ শতাংশ বাড়বে।
নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের পরিচালক সোহেল আক্তার বলেন, সিটি করপোরেশনকে সম্পৃক্ত করতে না পারলে কার্যকর বাজার মনিটরিং সম্ভব নয়। নারায়ণগঞ্জের একটি বাজারে প্রতিদিন তিন হাজার টাকা চকি (খাট) ভাড়া দিতে হয়। এই টাকা তো ব্যবসায়ীরা ভোক্তার কাছ থেকে নিয়েই দিচ্ছেন।
মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা বলেন, একসময় ২০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা করত। ব্যাংকিং, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও আইন-কানুনের বেড়াজালে পড়ে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এখন হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে বাজার। বন্ধ প্রতিষ্ঠান চালু করতে না পারলে ভোজ্যতেল ও চিনি সংকট অনিবার্য।
মেঘনা গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপমহাব্যবস্থাপনা পরিচালক তসলিম শাহরিয়ার বলেন, ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় চিনি রপ্তানিকারক দেশ হয়েও শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে চিনি আমদানি শুরু করেছে। এ কারণে ব্রাজিলে চিনির দাম বাড়তে শুরু করেছে। যদিও বাংলাদেশে মিলগেটে চিনির দাম স্থিতিশীল আছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা পূর্বাভাস সেলের বাণিজ্য পরামর্শক (যুগ্ম নিয়ন্ত্রক) আবু সালেহ্ মোহাম্মাদ ইমরান বলেন, গণমাধ্যমে ‘পেঁয়াজের ঝাঁজ’, ‘মরিচের ঝাল’ বা ‘চাল নিয়ে চালবাজির’ মতো শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। এসব শব্দ অনেক সময় মানুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক তৈরি করে। অযৌক্তিকভাবে প্যানিক তৈরি হয়। এই প্যানিকের কারণ কিছুটা ট্র্যাডিশনাল। ধ্যান-ধারণা থেকে একটু বের হয়ে আসতে হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর বাজারে পণ্যের দাম বাড়তে পারে-এমন আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন মো. ফজলুল হক। তিনি বলেন, পে-স্কেল ঘোষণার পরে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে একটু শঙ্কা আছে যে, জিনিসপত্রের দামের কী হবে। এ পরিস্থিতিতে বাজারে যেন অযৌক্তিকভাবে দাম না বাড়ে, সে বিষয়ে একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, বাজার পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
