Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

ঢাবির হলে দুর্ভোগ

এমন লোডশেডিং আগে দেখেননি শিক্ষার্থীরা

Icon

সাদ আদনান রনি

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

এমন লোডশেডিং আগে দেখেননি শিক্ষার্থীরা

ফাইল ছবি

একসময় যান্ত্রিক ত্রুটি ছাড়া যেখানে লোডশেডিং ছিল বিরল ঘটনা, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কবলে। তীব্র গরমের মধ্যে দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ক্যান্টিনগুলোতে দীর্ঘ সময়ের গ্যাস সংকট। ফলে ব্যাহত হচ্ছে রান্নাবান্না ও শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে এমন লোডশেডিংয়ের অভিজ্ঞতা আগে হয়নি বলে দাবি করছেন শিক্ষার্থীরা। কখনো ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান, রিডিং রুমে পড়াশোনা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, স্যার এ এফ রহমান হল, শেখ মুজিবুর রহমান হল, শামসুন্নাহার হলসহ কয়েকটি আবাসিক হলের শিক্ষার্থী, ক্যান্টিন পরিচালক এবং ডাকসুর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এই সংকটের চিত্র উঠে এসেছে।

এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। প্রায় এক মাস ধরে সারা দেশে চলছে তীব্র লোডশেডিং। শুরুতে লোডশেডিংয়ের পুরোটাই ঢাকার বাইরে লক্ষ করা গেলেও ১২ আগস্ট রাত থেকে ঢাকাতেও লোডশেডিং করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতা জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ঘাটতির প্রভাব এখন সরাসরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পড়েছে।

ক্লাস চলাকালেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট : লোডশেডিংয়ের প্রভাব শুধু আবাসিক হলেই সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক একাডেমিক ভবনেও নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে। ক্লাস চলাকালে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে বন্ধ হয়ে যায় প্রজেক্টর, সাউন্ড সিস্টেম ও স্মার্ট ক্লাসের উপকরণ। গরমে শ্রেণিকক্ষের ফ্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।

কলা অনুষদের শিক্ষার্থী আসিফ মাহমুদ জানান, বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে শিক্ষকরা এখন প্রেজেন্টেশননির্ভর ক্লাস নেন। কিন্তু বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো লেকচার ব্যাহত হয়। বিশেষ করে দুপুরের ক্লাসগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে অসহনীয় হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ শুধু আরাম-আয়েশের বিষয় নয়। শিক্ষার মানসম্মত পরিবেশ ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অন্যতম পূর্বশর্ত।

বুয়েটেও দিনে পাঁচ ঘণ্টার লোডশেডিং : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েও (বুয়েট) বিদ্যুৎ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ঘাটতির কারণে প্রতিদিন পাঁচ দফায় মোট পাঁচ ঘণ্টার নির্ধারিত লোডশেডিং কার্যকর করেছে বুয়েট কর্তৃপক্ষ। প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রতিদিন সকাল ৬টা-৭টা, সকাল ১০টা-১১টা, দুপুর ২টা-৩টা, রাত ১২টা-১টা এবং রাত ৩টা-৪টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম থাকায় বুয়েটের নিজস্ব জেনারেটর দিয়েও পুরো ক্যাম্পাসে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

‘পাঁচ বছরে এমন পরিস্থিতি দেখিনি’ : শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. মাসুদুজ্জামান বলেন, ‘গত পাঁচ বছরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন লোডশেডিং দেখিনি। আগে বিদ্যুৎ গেলে বুঝতাম কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি। এখন প্রতিদিন দিনের মধ্যে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। রিডিং রুমে বসে পড়া যায় না, রাতে পরীক্ষার প্রস্তুতিও ব্যাহত হচ্ছে। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান শামসুন্নাহার হলের তাসফিয়া সুলতানা। তিনি বলেন, ‘আমি প্রায় তিন বছর ধরে হলে আছি। এই সময়ের মধ্যে যান্ত্রিক ত্রুটি ছাড়া পাঁচ মিনিটের জন্যও বিদ্যুৎ যেতে দেখিনি। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিনই একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রিডিং রুমে কোনো বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নেই।’

‘১০-১৫ দিনেও হতো না, এখন প্রতিদিন’ : শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক জহির রায়হান রিপন বলেন, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ১০-১৫ দিনেও লোডশেডিং হতো না, হলেও কয়েক মিনিটের জন্য। সেখানে এখন প্রতিদিন এক ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। কখনো দিনে এবং রাতে দুই-তিনবারও বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রা ও একাডেমিক পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। শেখ মুজিবুর রহমান হলের ক্যান্টিন পরিচালক ডালিম সরকার যুগান্তরকে বলেন, সকালের নাশতা থেকে শুরু করে দুপুরের খাবার সবকিছুই সময়ের মধ্যে প্রস্তুত করতে হয়। কিন্তু গ্যাসের চাপ না থাকলে চুলা জ্বলে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এখন সারা দেশের সমস্যা হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে এর প্রভাব উদ্বেগজনক। আগেও বিদ্যুৎ সংকট ছিল, কিন্তু এত তীব্র ছিল না যে নিয়ম করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে লোডশেডিং হবে। এখন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, রান্নাবান্না, এমনকি ন্যূনতম জীবনযাপনও ব্যাহত হচ্ছে। অনেক হলের ক্যান্টিনে কাঠ দিয়ে রান্না করতে হচ্ছে, ফলে ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। তিনি জানান, এ পরিস্থিতিতে ডাকসুর পক্ষ থেকে উপাচার্যের কাছে ক্যান্টিনগুলোর জন্য বিশেষ ভর্তুকি দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী যুগান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল ভিন্ন ভিন্ন বিদ্যুৎ ফেজের আওতায় থাকায় সব এলাকায় একই ধরনের লোডশেডিং হচ্ছে না। লোডশেডিংয়ের বিষয়টি নিয়ে আমরা ডিপিডিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইতোমধ্যে একাধিকবার যোগাযোগ করেছি। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও চলমান পরীক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যতটা সম্ভব নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছি। আমরা আশা করছি দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গ্যাস সরবরাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে নয়। এটি জাতীয় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ। বর্তমান জ্বালানি সংকটের প্রভাব সারা দেশেই পড়েছে, তার প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়েও এসেছে। তবে সরকার এ সংকট নিরসনে কাজ করছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম