শাহবাগের শহীদ জিয়া শিশুপার্ক
সংস্কারের নামে বন্ধ ৭ বছর
পূর্ত কাজের অগ্রগতি হলেও রাইড কেনার দরপত্রই চূড়ান্ত করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ * বন্ধ পার্কটির দুবার নাম বদল করা হলেও কাজের দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি নেই
সাত বছরেও শেষ হয়নি রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র শাহবাগের শহীদ জিয়া শিশু পার্কের সংস্কার। এতে নির্মল বিনোদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নগরীর শিশুরা -রফিকুল ইসলাম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র শাহবাগের জনপ্রিয় শহীদ জিয়া শিশুপার্কটি সাত বছর ধরে বন্ধ। সংস্কার ও আধুনিকায়নের নামে বছরের পর বছর পার্কটি তালাবদ্ধ থাকায় শিশুরা শৈশবের নির্মল আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফ্যাসিস্ট আমলে শহীদ জিয়ার নাম পরিবর্তন করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে পুনরায় শহীদ জিয়ার নাম ফিরিয়ে আনা হয়। কাজের কাজ কিছু না হলেও এ সময়ের মধ্যে দুবার পার্কের নাম পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে।
বিগত সময়ে মেয়র এসেছেন, মেয়র গেছেন; প্রশাসকদেরও অদলবদল হয়েছে। এভাবে দীর্ঘ সময় পার হলেও শিশুদের বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ পার্কটি চালুর বিষয়ে কারও কার্যকর তৎপরতা দেখা যায়নি। তবে নতুন সরকারের সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত বর্তমান প্রশাসক জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের প্রথমদিকে এটি চালু হতে পারে। এখনো প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ বাকি থাকায় ঘোষিত সময়ে সেটি সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। ওয়াকিবহাল মহল জানায়, একসময় শাহবাগের শিশুপার্ক ছিল ঢাকার সব শ্রেণির শিশুর সাশ্রয়ী ও সর্বজনীন আনন্দকেন্দ্র। খেলনা ট্রেন, নাগরদোলা ও মেরি-গো-রাউন্ড ঘিরে বহু প্রজন্মের স্মৃতি তৈরি হয়েছে। এখন শাহবাগের অন্য সবকিছু সচল থাকলেও হারিয়ে গেছে শিশুদের সম্মিলিত আনন্দের জায়গা। পার্কটি চালু থাকাকালীন প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পার্কে শিশুদের নিয়ে আসতেন। স্বল্প খরচে শিশুরা সেখানে নির্মল আনন্দ উপভোগ করত। উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের নামে দীর্ঘ সময় পার্কটি বন্ধ রাখার কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছেন না তারা। বিষয়টিকে তারা দায়িত্বপ্রাপ্তদের চরম অবহেলা হিসেবে দেখছেন।
সরেজমিন দেখা গেছে, শাহবাগ শিশুপার্কের এখন কোনো প্রবেশদ্বার নেই। নেই খেলনা ট্রেনের বাঁশির শব্দ। রাইডে শিশুদের হইহুল্লোড় নেই। বন্ধ ও নিষ্প্রাণ পরিবেশই দৃশ্যমান। পার্কের জায়গায় কিছুু অবকাঠামো চোখে পড়ছে। তার আশপাশে কিছু শ্রমিককে উন্নয়ন কাজ করতে দেখা যায়। একসময়ের সর্বজনীন ও প্রাণবন্ত শিশু বিনোদনকেন্দ্রটিতে বিরাজ করছে দীর্ঘদিনের শূন্যতা। সবাই চায় দ্রুত ফিরুক শিশুদের কোলাহলমুখর সেই পরিবেশ। এখনো দূর-দূরান্ত থেকে অনেক শিশুপার্কে ঘুরতে এসে বিদ্যমান অবস্থা থেকে হতাশ হয়ে ফিরে যায়।
সরেজমিন আরও দেখা গেছে, শহীদ জিয়া শিশুপার্কটি আগে যেখানে ছিল, সেখানে একটি ভূগর্ভস্থ পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। এ পার্কিংয়ের ছাদ মাটি থেকে প্রায় চার ফুট উঁচু। এছাড়া আগে শিশুপার্কের যে রাইডগুলো ছিল, এখন তার কোনো অস্তিত্ব নেই। পার্কের সামনে কয়েকটি টং দোকান বসেছে। সেসব দোকানে মানুষ চা-বিস্কুট খান।
নগর পরিকল্পনাবিদ এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, শিশুদের মানসিক বিকাশে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু পর্যাপ্ত পার্ক-মাঠ না থাকায় শিশুদের সেই সুযোগ নেই। এ ব্যর্থতার দায় নগর কর্তৃপক্ষের। অবিলম্বে পার্কের আধুনিকায়নের কাজ শেষ করে তা শিশুদের জন্য খুলে দিতে হবে। এছাড়া পার্ককে শুধু বিনোদনের কেন্দ্র্র মনে করলে চলবে না। এটি সামাজিকীকরণেরও বড় জায়গা বা মাধ্যম। এজন্য নগরীর পার্কগুলোকে ব্যবহার উপযোগী রাখা এবং সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ও পরিচর্যা করা দরকার।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) বর্তমানে শাহবাগের শহীদ জিয়া শিশুপার্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। আর এই সংস্থার প্রকৌশল বিভাগ পার্কের সার্বিক দায়িত্বে রয়েছে। পার্কের উন্নয়ন কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে শাহবাগ শিশুপার্কের আধুনিকায়নের প্রস্তাব দেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ওই প্রস্তাবনার আলোকে স্বাধীনতার স্তম্ভ নির্মাণের তৃতীয় পর্যায়ের আওতায় ৭৮ কোটি টাকা দেওয়ার কথা জানায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ওই প্রকল্পের প্রস্তাবনার আলোক শিশুপার্কের নিচে ভূগর্ভস্থ পার্কিং করার বিষয় যুক্ত করা হয়। যার ফলে শিশুপার্কের আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে ওই সময়ে আলোচনা করা হয়। পার্কের আধুনিকায়ন ও রাইড কেনা বাবদ টাকার পরিমাণ কম হওয়ায় ওই প্রস্তাব নাকচ করে দেন ডিএসসিসির তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। এরপরও ২০১৯ সালে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনে পার্কটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর ২০২০ সালে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের পর পার্ক নিয়ে নতুন করে স্বতন্ত্র প্রকল্প গ্রহণ করেন। ২০২৩ সালের আগস্টে যেটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। এ প্রকল্পের আকার ছিল ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা। অনুমোদনের সময় সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল, প্রকল্পের ৪৮৩ কোটি টাকা দেবে সরকার। সরকারের টাকার অর্ধেক হবে অনুদান, বাকি অর্ধেক ঋণ। আর বাকি ১২০ কোটি টাকা সিটি করপোরেশন নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ করবে। এ প্রকল্পের বেশির ভাগ ব্যয় ধরা হয় পার্কের জন্য ১৫টি রাইড কেনা ও স্থাপন বাবদ। এ প্রকল্পের মেয়াদকাল ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ছিল। যেহেতু নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি, এজন্য এর মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি সবমিলিয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ। বর্ধিত সময়েও প্রকল্পের কাজ শেষ হবে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
ডিএসসিসির পরিবেশ, জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং প্রকল্প পরিচালক সাইফুল ইসলাম জয় যুগান্তরকে বলেন, অল্প কিছুদিন হলো তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। পূর্ত কাজের আশানুরূপ অগ্রগতি হলেও ইতোপূর্বে রাইড ক্রয়ের দরপত্র দুবার বাতিল হয়েছে। তৃতীয়বারের মতো দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে। এবার যদি দরপত্র সঠিকভাবে করা সম্ভব হয়, তাহলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হবে বলে আশা করা যায়। নইলে আগামী বছরের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন কারণে শহীদ জিয়া শিশুপার্কের কাজের আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। তবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর জোর তদারকি করছেন। এজন্য তার আশা, আগামী বছরের জুনের মধ্যে পার্কটি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্দেশে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের আওতায় শাহবাগে শিশুপার্কটি স্থাপন করা হয়। প্রায় ১৫ একর জায়গার ওপর পার্কটির অবস্থান। ১৯৮৩ সালে তৎকালীন ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কাছে এ পার্ক হস্তান্তর করা হয়। ওই সময়ে এটি ঢাকা শিশুপার্ক নামে পরিচিত ছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা ঢাকার অবিভক্ত মেয়রের সময়ে এর নামকরণ করা হয় শহীদ জিয়া শিশুপার্ক। পরবর্তীতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস শিশুপার্কটির নাম পরিবর্তন করে রাখেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পার্ক। এটি করা হয় ২০২১ সালের ডিসেম্বরে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুনরায় নাম পরিবর্তন করে শহীদ জিয়া শিশুপার্ক নামকরণ করা হয়েছে।

