Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

বড় ঝুঁকিতে জ্বালানি খাত

হরমুজ অচলে চাপ বাড়ছে দেশের অর্থনীতিতে

এম শাহজাহান

এম শাহজাহান

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

হরমুজ অচলে চাপ বাড়ছে দেশের অর্থনীতিতে

হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা ও মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ধাক্কা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে জ্বালানি খাতে। এরই মধ্যে যুদ্ধজনিত সরবরাহ বিঘ্নের কারণে মার্চ থেকে জ্বালানি আমদানি ও বিল পরিশোধে সরকারের অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ও পণ্য সরবরাহে বিঘ্নের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি, নৌপরিবহণ ও প্রবাসী খাতে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে এবং তা মোকাবিলায় করণীয় কী-তা জানতে পাঁচ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ৩ সেপ্টেম্বর জারি করা ওই চিঠিতে বাণিজ্য, অর্থ, নৌপরিবহণ, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও খনিজসম্পদ এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কাছে আগামী ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য ও মতামত পাঠাতে বলা হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

জানা গেছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিম ইউরোপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন শাখা থেকে পাঠানো চিঠিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলমান সংঘাতের কারণে পণ্য পরিবহণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে, তার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর কতটা পড়ছে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কী ব্যবস্থা নিয়েছে-তা জানতে চাওয়া হয়। এরই মধ্যে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়, ভর্তুকি, রপ্তানি পরিবহণ ব্যয়, সার ও নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা-সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে বহুমুখী ঝুঁকি। এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগে স্পষ্ট-সংকটটি এখন আর শুধু জ্বালানি আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর প্রভাব দেশের বাণিজ্য, নৌপরিবহণ, শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে।

এদিকে, যুদ্ধের আর্থিক অভিঘাত বোঝাতে তিনটি বড় অঙ্ক সামনে এসেছে। তবে এগুলো যোগ করে মোট ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা সম্ভব নয়। অর্থমন্ত্রীর দেওয়া হিসাবে ৪-৫ বিলিয়ন ডলার হচ্ছে যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকটের কারণে বাড়তি জ্বালানি আমদানি ব্যয়। এর আগে মার্চ-জুন সময়ে জ্বালানি তেল ও এলএনজির বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। এর মধ্যে ডিজেলে ১৫ হাজার ৪০৯ কোটি, অকটেনে ৬৩৬ কোটি এবং এলএনজিতে ১৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকা প্রয়োজনের হিসাব দেওয়া হয়েছিল। আর ১১ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রকৃত লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৩৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ তিনটি অঙ্ক যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের ওপর তৈরি হওয়া বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বাজেটের ভর্তুকি চাপ এবং বিপিসির সরাসরি লোকসানের আলাদা চিত্র তুলে ধরে। তবে হরমুজ সংকটের শুরু থেকেই সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। কাজাখস্তান থেকে এক লাখ টন ডিজেল এবং সিঙ্গাপুর থেকে এলএনজি আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সরকার তিন মাসের জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাস শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ, মালয়েশিয়া থেকে গ্যাস আনার উদ্যোগ এবং সৌরবিদ্যুৎ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যও জানিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী। এছাড়া জ্বালানি আমদানি ও বাজারে বেসরকারি খাতকে আরও যুক্ত করার নীতিও বিবেচনা করছে সরকার। জ্বালানিমন্ত্রীর ভাষ্য, এতে সরবরাহের উৎস বাড়বে এবং বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়লেও দেশের বাজারে পুরোটা সমন্বয় করা হয়নি। ফলে বিপিসিকে বড় লোকসান গুনতে হয়েছে। মার্চে লোকসান হয়েছে ২ হাজার ২৪৮ কোটি, এপ্রিলে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি, মে মাসে ২ হাজার ৬২৩ কোটি এবং জুনের প্রথম ১১ দিনে ৪ হাজার ৩০১ কোটি টাকা।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও যুদ্ধের শুরুতে বলেছিলেন, হরমুজ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত হলে জাহাজকে বিকল্প দীর্ঘ রুটে যেতে হওয়ায় পরিবহণ ব্যয় বাড়তে পারে এবং তার প্রভাব পণ্যমূল্যে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে হরমুজ অচলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে কী ধরনের প্রভাব পড়েছে তার একটি হিসাব নিরূপণের উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

রপ্তানিতে চারগুণ ফ্রেইট : হরমুজ সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যগামী পণ্য পরিবহণে। যুদ্ধের আগে চট্টগ্রাম থেকে উপসাগরীয় দেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের একটি কনটেইনার পাঠাতে খরচ হতো প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার। বিকল্প রুটে সেই ব্যয় বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ৫০০ ডলার। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশের নতুন অর্ডার প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। পরবর্তী সময়েও মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্রেইট কয়েকগুণ বেড়েছে। জাহাজ ঘুরিয়ে নেওয়ার কারণে জ্বালানি ও বিমা ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে কম মুনাফার পণ্য রপ্তানিকারীদের ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি। একদিকে বেশি জাহাজ ভাড়া, অন্যদিকে অর্ডার কমে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ীকে বাজার ধরে রাখতে গিয়ে লোকসানের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। হরমুজ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া সার বিশ্ববাজারে সরবরাহ হয়। যুদ্ধের প্রথম ধাক্কায় প্রতি টন ইউরিয়ার দাম প্রায় ৪০০ ডলার থেকে বেড়ে ৮৫০ ডলারের উপরে উঠে যায়। পরে জুনে তা আবার প্রায় ৪৫৩ ডলারে নেমে আসে। এ কারণে সরকার বিকল্প উৎস থেকে সার সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। সারের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে; শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব খাদ্যপণ্যের বাজারেও পড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার : সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন মিলিয়ে দেশের মোট রেমিট্যান্সের ৪৬-৫১ শতাংশ আসে। এ প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয়, তার ওপর অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং প্রবাসী আয় কমার ঝুঁকি তৈরি হবে। এ কারণে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রবাসীদের নিরাপত্তা, নতুন কর্মসংস্থান অব্যাহত রাখা এবং সম্ভাব্য শ্রমবাজার সংকট মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়া।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম