Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল

সাশ্রয়ী প্রস্তাবে আগ্রহ নেই

শাহেদ সিদ্দিকী

শাহেদ সিদ্দিকী

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সাশ্রয়ী প্রস্তাবে আগ্রহ নেই

গ্যাস সংকট কাটাতে টেন্ডার ছাড়া সমঝোতার মাধ্যমে আরেকটি ভাসমান মজুত ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) বসাতে চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের (সিএনইই) প্রস্তাব নিয়ে বিপাকে পড়েছে জ্বালানি বিভাগ। বাংলাদেশের তীব্র গ্যাস সংকটের সুযোগে চীনের অপর একটি কোম্পানির চেয়ে ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি দাবি করেছে সিএনইই। এলএনজি টার্মিনাল কোম্পানি সামিটের চেয়ে দৈনিক ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা (৯৩ হাজার ডলার) এবং এক্সিলারেট এনার্জির চেয়ে ১ কোটি ৮ লাখ টাকা (৮৮ হাজার ডলার) বেশি চার্জ দাবি করেছে সিএনইই। অথচ চীনের চায়না মার্চেন্ট ইন্ডাস্ট্রির (সিএমআই) সাশ্রয়ী প্রস্তাবে আগ্রহ দেখাচ্ছে না জ্বালানি বিভাগ। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, দৈনিক ১ লাখ ডলার খরচে এ জোড়া জাহাজের ভাসমান টার্মিনাল রাখা যাবে। এর সঙ্গে বছরে ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার রক্ষণাবেক্ষণ ফি দিতে হবে। ১২ বছর পর ভাসমান টার্মিনালটি পেট্রোবাংলার হয়ে যাবে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, মাতারবাড়ীতে এক জোড়া জাহাজ নিয়ে ভাসমান টার্মিনাল বসাতে চায়না মার্চেন্ট ইন্ডাস্ট্রি (সিএমআই) লিয়ান ডকইয়ার্ড লিমিটেড যৌথভাবে পৃথক আরেকটি প্রস্তাব দিয়েছে। সেই প্রস্তাবের চেয়ে সিএনইই-এর প্রস্তাবে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। তবে এ প্রস্তাব নিয়ে সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ কম। দ্রুত গ্যাস সংকটের কথা বলে উচ্চমূল্যের সিএনইই-এর প্রস্তাব চূড়ান্ত করে শিগ্গিরই ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হতে পারে। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে বৃহস্পতিবার জ্বালানি সচিব মো. জিয়াউল হকের সভাপতিত্বে সরকার টু সরকার (জিটুজি) কমিটির বৈঠক হয়েছে। সেই বৈঠকে বলা হয়েছে, সিএনইই-এর প্রস্তাব অনুমোদন করলে সরকারকে অনেক মূল্য দিতে হবে। তাই এ প্রস্তাবের নানা দিকে তুলে ধরে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হবে। এ ব্যাপারে মন্ত্রিসভা কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। এর আগে সিএনইই-এর প্রস্তাব মূল্যায়ন করে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নানের নেতৃত্বে একটি কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে জ্বালানি বিভাগে। সেখানেও সিএনইই-এর প্রস্তাব মানলে বড় মাশুল দিতে হবে উল্লেখ করা হয়। এ ব্যাপারে মন্তব্য জানতে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি জ্বালানি বিভাগের প্রক্রিয়াধীন। এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করা যাবে না।

দেশের জ্বালানি সংকট কাটাতে দুই বছরের মধ্যে সরকার এক থেকে দুইটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বসানোর ঘোষণা দিয়েছে। এজন্য জুলাইয়ে সিএনইই কোনোরকম টেন্ডার ছাড়া একটি টার্মিনাল বসানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এর স্টোরেজ বা মজুত ক্ষমতা হবে ১ লাখ ৭৪ হাজার ঘনমিটার গ্যাস। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৬০ কোটি ঘনফুট রিগ্যাসিফিকেশন করে জাতীয় গ্রিডে দিতে পারবে। এজন্য সিএনইই-কে দিতে হবে দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার। সিএনইই ২০১৫-২০১৬ সালের একটি পুরোনো জাহাজ কিনে সেটিকে এফএসআরইউতে রূপান্তর করবে। এতে সময় লাগবে ১৮ থেকে ২৪ মাস। তবে এ চুক্তি হবে বিওও পদ্ধতিতে অর্থাৎ এফএসআরইউটি সিএনইই মাতারবাড়ীতে এনে তারা নিজেই অপারেট করবে এবং ১৫ বছর পর তারা সেই জাহাজটি নিয়ে যাবে। এতে বাংলাদেশের লোকসান হবে ১০ কোটি ডলার। কারণ, সামিট এবং এক্সিলারেট এনার্জি বুট বা এফএসআরইউ এনে চুক্তি শেষে সরকারকে হস্তান্তর করবে। এতে সরকার ১৫ বছর পর ১০ কোটি ডলার মূল্যের জাহাজের মালিক হবে।

কমিটির প্রস্তাবে কী বলা আছে : তৃতীয় এফএসআরইউ প্রস্তাব নিয়ে আগস্টে সিএনইই-এর সঙ্গে কমপক্ষে চারটি বৈঠক হয়েছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গঠিত মূল্যায়ন কমিটি ওইসব বৈঠকে প্রস্তাবের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সিএনইই-এর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। মূল্যায়ন কমিটিতে সদস্য হিসাবে জ্বালানি বিভাগ, বুয়েটের শিক্ষক, আইন মন্ত্রণালয়, বিডার কর্মকর্তাসহ কয়েকজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এফএসআরইউ বসানোর ব্যাপারে সিএনইই-এর কোনো অভিজ্ঞতা নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিটির একজন সদস্য যুগান্তরকে বলেন, সিএনইই-এর দৈনিক চার্জ অস্বাভাবিক। দিনে রিগ্যাসিফিকেশনের জন্য ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার দাবি করা হয়েছে। অথচ সামিট নিচ্ছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার এবং এক্সিলারেট নিচ্ছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার। অবশ্য সামিট ও এক্সলারেট এনার্জির মজুত ক্ষমতা সিএনইই-এর চেয়ে কিছুটা কম। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নতুন একটি এফএসআরইউ বসানোর জন্য সামিটের সঙ্গে একটি চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। সেই চুক্তিতে দৈনিক চার্জ ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ডলার। তিনি আরও জানান, এ চার্জ কমানোর জন্য বারবার অনুরাধ করা হলেও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কথা বলে সেই চার্জ কমাতে তারা রাজি হয়নি। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, চীনের সঙ্গে জ্বালানি খাত নিয়ে সরকারের কোনো সমঝোতা চুক্তি নেই। তাহলে কীসের ভিত্তিতে সিএনইই-এর সঙ্গে চুক্তি হবে, তা নিয়ে কিছুটা জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে ২৯ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে সিএনইই-এর সঙ্গে সমঝোতা চালিয়ে নিতে অনুমোদন করা হয়। সেখানে জ্বালানি বিভাগ জানায়, কোনো টেন্ডার নয়, জিটুজি পদ্ধতিতে সিএনইই-এর প্রস্তাব অনুমোদন করা যায়। এর আগের দিন ২৮ জুলাই এ চিঠি চীনের দূতাবাস থেকে পাওয়ার পর ওইদিনই মাতারবাড়ীতে সিএনইই-কে টার্মিনাল বসানোর প্রক্রিয়া চালানোর অনুমোদন চেয়ে মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়।

একাধিক সূত্র জানায়, গত মাসে জ্বালানি বিভাগ জিটুজি পদ্ধতিতে তৃতীয় এফএসআরইউ বসাতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরবসহ ১২টি দেশ ও কোম্পানির কাছে প্রস্তাব চায়। সেই প্রক্রিয়া মাঝপথে আটকে দেওয়া হয়। সরকারের একটি পক্ষের চাপে সেটি বাতিল করা হয়। অভিযোগ-এক সংসদ-সদস্যের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে দেশের জন্য আর্থিকভাবে ক্ষতিকর সিএনইই-এর এ প্রস্তাব অনুমোদন করতে চাপ দিচ্ছে জ্বালানি বিভাগকে।

সিএমআই-ইউ লিয়ান ডকইয়ার্ড লিমিটেডের প্রস্তাবে কী আছে : ১১ আগস্ট জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে সিএমআই-ইউ লিয়ান ডকইয়ার্ড লিমিটেড এক জোড়া জাহাজ দিয়ে এফএসআরইউ মাতারবাড়ীতে বসাতে প্রস্তাব দিয়েছে। সিএমআই বলেছে, এক জোড়া জাহাজে ২ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার মজুত ক্ষমতা আছে (সিএনইই-এর প্রস্তাবে ১ লাখ ৭৪ হাজার ঘনমিটার)। সিএমআই স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৭০ কোটি এবং প্রয়োজনে ৭৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ দিতে পারবে। চাইলে বাংলাদেশ এক দফায় ৩৫ কোটি ডলার দিয়ে কিনে নিতে পারে। তবে সঙ্গে বছরে ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার পরিচালন এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় দিতে হবে। অথবা পেট্রোবাংলা চাইলে দৈনিক ১ লাখ ডলার খরচে এ জোড়া জাহাজের ভাসমান টার্মিনাল রাখতে পারবে। এর সঙ্গে বছরে ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার রক্ষণাবেক্ষণ ফি দিতে হবে। ১২ বছর পর ভাসমান টার্মিনালটি পেট্রোবাংলার হয়ে যাবে। সিএমআই জানায়, সামিট ও এক্সিলারেট দুই টার্মিনাল মিলে এখন বাংলাদেশকে দৈনিক ৪ লাখ ৫৪ হাজার ডলার দিতে হচ্ছে। সেই তুলনায় জোড়া জাহাজের টার্মিনাল বাংলাদেশের জন্য সাশ্রয়ী হবে বলে দাবি করেছে সিএমআই। জ্বালানি বিভাগ জানায়, সিএমআই-এর এ প্রস্তাব নিয়ে সরকারের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। ২১ পৃষ্ঠার এ প্রস্তাব কতটুকু বাস্তবসম্মত, তা যাচাই-বাছাই করতে জ্বালানি বিভাগ কোনো কমিটি গঠন বা কাউকে দায়িত্ব দেয়নি। জ্বালানি বিভাগ মহলবিশেষের আগ্রহ অনুযায়ী সিএনইই নিয়ে ব্যস্ত।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম