১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চে শফিকুর রহমান
অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন
সরকার ১৮০ দিনে দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ -নাহিদ ইসলাম
Advertisement
রাজধানীর মতিঝিল থেকে শনিবার চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চের শুরুর প্রাক্কালে হাত উঁচিয়ে ১১ দলীয় নেতাদের ঐক্য প্রকাশ -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার শুরু থেকেই জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে চলছে। জনগণের দেওয়া ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায় তারা বাস্তবায়ন করেনি। এভাবে তারা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করলে এবং গণ-আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করলে মানুষ তাদের ‘লাল কার্ড’ দেখাবে। তিনি বলেন, মানুষ আদালতে গেলে ন্যায়বিচার পাবে, সন্তানরা ভালো শিক্ষা পাবে, কাজ পাবে, তারা দেশ গড়বে; দেশ থেকে চাঁদাবাজি, ঘুস ও দুর্নীতি নির্মূল হবে-তার একটাও হয়নি। শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চে বিভিন্ন স্থানে পথসভা এবং রাতে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির এসব কথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে লংমার্চের বিশাল গাড়িবহর নগরীর লালদীঘির পাড়ে পৌঁছে। এসময় নেতাকর্মীদের স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
এর আগে সকালে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে উদ্বোধনী সমাবেশের পর রওনা দেয় লংমার্চের বিশাল গাড়িবহর। পথে নারায়ণগঞ্জের কাচপুর, কুমিল্লার পদুয়ার বাজার ও চৌদ্দগ্রাম, ফেনীর মহিপাল ও চট্টগ্রামের মীরসরাইসহ ৫টি পথসভায় বক্তব্য রাখেন ১১ দলের নেতৃবৃন্দ। এলডিপির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, জাগপার সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ড. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বিডিপির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুদ্দিন আহমদসহ ১১ দলের শীর্ষ নেতারা সমাবেশে বক্তব্য রাখেন।
পথসভা ছাড়াও পুরো রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ সারিবদ্ধ হয়ে লংমার্চকে স্বাগত জানান। পথে পথে তারা জাতীয় পতাকা এবং কালেমাখচিত পতাকার পাশাপাশি নানা স্লোগান সম্বলিত প্লাকার্ড প্রদর্শন করেন।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।
লালদীঘি ময়দানের সমাবেশে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ জনগণ দুটি ভোট দিয়েছিল। একটি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচনের জন্য, আরেকটি বাংলাদেশের রাজনীতির পরিবর্তনের জন্য সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচনের উদ্দেশ্যে। নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকারি দল এবং আমরা সবাই বলেছিলাম, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলুন। ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে আমরা বদ্ধপরিকর। বিএনপিও এ কথা বলেছে। ছয় মাস চলে গেল, বিএনপি কি তাদের কথা রেখেছে?
জামায়াত আমির বলেন, তারা তখন বলেছিল, অনির্বাচিত সরকার যত দ্রুত বিদায় নেবে, দেশের তত মঙ্গল হবে। আমি জিজ্ঞেস করতে চাই, অনির্বাচিত সরকার আমাদের জান্নাতে পাঠায়নি, এটা ঠিক। কিন্তু অনির্বাচিত সরকারের সময় আপনারা যেমন ছিলেন, এখন কি সেই সুবিধাগুলো পাচ্ছেন?
ঢাকা বিমানবন্দরে এক প্রবাসীর স্বর্ণ ছিনতাইয়ের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, কয়েক দিন আগে তিনজন ছিনতাইকারী একজন প্রবাসীর স্বর্ণ ছিনতাই করেছে। ছিনতাইয়ের সময় তারা নিজেদের আওয়ামী লীগের লোক পরিচয় দিয়ে ভয় দেখিয়েছিল। কিন্তু ধরা পড়ার পর দেখা গেল, তারা বিএনপির লোক। তিনি বলেন, এরা গুপ্ত। যে নিজের পরিচয় গোপন করে অপকর্ম করে, দুর্নীতি করে, সেই হচ্ছে সবচেয়ে বড় গুপ্ত।
সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া সমস্যার সমাধান যদি আপনি করতে না পারেন তাহলে সেটা সবার আগে জনগণের কাছে স্বীকার করুন। স্বীকার করুন এই সমস্যার সমাধান আপনার একার পক্ষে সম্ভব নয়। স্বীকার করুন আপনার কাছে কোনো সঠিক পরিকল্পনা নেই দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার এবং বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় বসুন। বিরোধী দল সমর্থন না দিলে এই দেশ আপনার পক্ষে একা চালানো সম্ভব নয়। এই বাস্তবতা মেনে নিন। আমরা অতীত স্বৈরাচারকে আসার কোনো পথ করে দিচ্ছি না। এই পথ আপনারাই করে দিচ্ছেন। কারণ জনগণকে আপনারা সমস্যার সমাধান দিতে পারছেন না। ফলে জনগণ কিন্তু বিকল্প খুঁজছে। বাংলাদেশের জনগণ দেখেছে বিকল্প শক্তি কারা। পতিত স্বৈরাচার কোনোভাবেই দেশে ফিরে আসতে পারবে না। একইভাবে নতুন কোনো স্বৈরাচার হওয়ার রাস্তাও আমরা এই বাংলাদেশে হতে দেব না, ইনশাআল্লাহ।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, এই সংকট আপনিই তৈরি করেছেন। আপনি সংসদকে কার্যকর করেননি। সংসদ কার্যকর না হওয়ার কারণে আজকে আন্দোলন রাজপথে গড়িয়েছে। আপনি যদি প্রথমেই সংবিধান বাস্তবায়ন পরিষদ করতেন তাহলে সেই সংবিধান পরিষদে আমরা আলোচনা করতে পারতাম।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, গোটা বাংলাদেশ আজ বিস্ফোরণোন্মুখ। সকাল থেকে লালদীঘি পর্যন্ত জনতার ঢল নেমেছে। এই জনগণ যদি রাস্তায় নামে, ১১ দলের ঐক্যেরও প্রয়োজন হবে না। জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারের বিদায় নিশ্চিত করবে।
কুমিল্লার সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সারা দেশের মানুষ গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংকটে ভুগছে। আমরা জনগণের এ সমস্যা সমাধানে রাস্তায় নেমেছি। তিনি বলেন, কুমিল্লা বিভাগের দাবি উঠেছিল ১৯৯৪ সালে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারের উদ্দেশে বলছি, কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করুন। পাশের কোনো জেলার যদি দাবি থাকে, তাদেরও দিয়ে দেন। কুমিল্লা বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন দ্রুত শুরু করুন। তিনি বলেন, কুমিল্লায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী ও দুর্নীতি এখনো রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সেদিকে খেয়াল নেই। তিনি আরও বলেন, দেশ মাদকে ভরে গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজ জেলা ও বাড়ির মাদকের চালান বন্ধ করতে পারছেন না। আমাদের যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যুবসমাজকে বাঁচান, দেশকে বাঁচান।
নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, লংমার্চে আমরা অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি। মানুষ তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করছে। সরকার ১৮০ দিনে দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছে। তারা কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তিনি বলেন, সরকারের মন্ত্রীদের সন্তানরা চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিতে জড়িত। তারা সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। আমরা ঢাকায় লংমার্চের ডাক দেব।
এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, দেশ চাঁদাবাজি, খুন-রাহাজানিতে ভরে গিয়ে জাহান্নামে পরিণত হয়েছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার জনগণের রায়কে উপেক্ষা করলে জনগণ সরকারকে প্রত্যাখ্যান করবে। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করবে জনগণ।
ফেনীর সমাবেশ ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ফেনীতে বিদ্যুৎ না থাকলেও সংসদে আছে। গ্যাস ও পানি আছে বিদ্যুৎমন্ত্রীর বাসায়। তিনি বলেন, সরকার নির্লজ্জ দলীয়করণ করবে, আর আমরা চুপ করে বসে থাকব-তা হবে না। আমরা প্রতিবাদ করব, গর্জন করব। আমরা কিছু সময় দিচ্ছি, এ সময় দীর্ঘ হবে না। চূড়ান্ত ডাক এলে জনগণকে নেমে আসার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, জুলাই গণহত্যার বিচার আমরা পাইনি। ফ্যাসিবাদমুক্ত, বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ আমরা গড়তে চাই।
যুগান্তর ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলে পথসভা : নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলে পথসভায় বক্তব্য রাখেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এই সরকার জনগণের সঙ্গে ভাঁওতাবাজি করছে। জনগণ তাদের ক্ষমা করবে না। ১১ দল আপনাদের পাশে আছে, আপনারাও আমাদের সঙ্গে থাকবেন। আমাদের এই লংমার্চ আজকে শুরু হলেও শেষ কিন্তু নয়। আমরা বিজয় নিয়েই ঘরে ফিরব।
ফেনীর মহিপালে পথসভা : বিকালে ফেনীর মহিপালে পথসভায় শফিকুর রহমান বলেছেন, এখন যারা ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চাইবে, তাদের মোকাবিলায় ইনশাআল্লাহ সাড়ে ১৫ বছর সময় লাগবে না। আমরা তাদের চিনি। আমরা এই মাটির সন্তান। এখানেই একসঙ্গে অনেকের সঙ্গে চলেছি। কার কতটুকু বুকের পাটা, আমরা জানি। আমাদের বিরুদ্ধে এখন নানা ধরনের চক্রান্ত করা হচ্ছে। অথচ সাড়ে ১৫ বছর তারা কোথায় ছিল? সরকারের অনুগ্রহ নিয়ে একটি পারমিশন নিয়ে রাস্তায় দু-চারজন মানুষ নামানোর সাহসও তারা দেখাতে পারেনি। এখন তারাই বড় বড় কথা বলছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ১১ দলের নেতাকর্মীদের ওপর সরকারি দলের নেতাকর্মীরা দেশের কোথাও নির্যাতন-নিপীড়ন চালালে আমরা চুপ করে বসে থাকব না। সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। আঘাত করলে পালটা আঘাত আসবে-এটা মনে রাখতে হবে। কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেছেন, হাসিনা চলে গেছে, কিন্তু হাসিনার স্টাইলে বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনা করছে। এমন পরিস্থিতি আমরা কোনোভাবেই হতে দেব না। এ কারণেই জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে আমরা দেশের প্রতিটি জেলায় যাচ্ছি। আল্লামা মামুনুল হক বলেন, সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, গ্যাস কার্ড, বিদ্যুৎ কার্ড ও সার কার্ড দেওয়ার কথা বলেছে। তবে জনগণের হাতে থাকা সবচেয়ে বড় কার্ড হচ্ছে ‘লাল কার্ড’।
কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে পথসভা : দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কুমিল্লা নগরীর পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় পথসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের দাবি পূরণ করার জন্য আমরা রাস্তায় নেমেছি। ইনশাআল্লাহ, দাবি পূরণ করে ঘরে ফিরব। এখানে পথসভায় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরও বক্তব্য দেন। পথসভায় সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও কুমিল্লা মহানগরী আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ।
সব মৌলিক অধিকার আমরা আদায় করব-মীরসরাইয়ে নেতারা : ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রায় ৬ মাস হয়ে গেছে, গণহত্যার একটি বিচারেরও অগ্রগতি নেই। প্রথম দিন থেকেই এ সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সন্ধ্যায় মীরসরাই সদরের ট্রাফিক চত্বরে আয়োজিত পথসভায় সভাপতিত্ব করেন মীরসরাই উপজেলা জামায়াতের আমির মাস্টার নুরুল কবির। আরও বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমানসহ ১১ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা।

