Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চে শফিকুর রহমান

অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন

সরকার ১৮০ দিনে দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ -নাহিদ ইসলাম

শহীদুল ইসলাম

শহীদুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন

রাজধানীর মতিঝিল থেকে শনিবার চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চের শুরুর প্রাক্কালে হাত উঁচিয়ে ১১ দলীয় নেতাদের ঐক্য প্রকাশ -যুগান্তর

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার শুরু থেকেই জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে চলছে। জনগণের দেওয়া ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায় তারা বাস্তবায়ন করেনি। এভাবে তারা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করলে এবং গণ-আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করলে মানুষ তাদের ‘লাল কার্ড’ দেখাবে। শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চে বিভিন্ন স্থানে পথসভা ও জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে উদ্বোধনী সমাবেশ এবং সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে জনসভা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জের কাচপুর, কুমিল্লার পদুয়ার বাজার ও চৌদ্দগ্রাম, ফেনীর মহিপাল ও চট্টগ্রামের মীরসরাইসহ ৫টি পথসভায় বক্তব্য রাখেন ১১ দলের নেতৃবৃন্দ।

এলডিপির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, জাগপার সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ড. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বিডিপির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুদ্দিন আহমদসহ ১১ দলের শীর্ষ নেতারা সমাবেশে বক্তব্য রাখেন।

পথসভা ছাড়াও পুরো রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ সারিবদ্ধ হয়ে লংমার্চকে স্বাগত জানান। পথে পথে তারা জাতীয় পতাকা এবং কালেমাখচিত পতাকার পাশাপাশি নানা স্লোগান সম্বলিত প্লাকার্ড প্রদর্শন করেন।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।

কুমিল্লার সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সারা দেশের মানুষ গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংকটে ভুগছে। আমরা জনগণের এ সমস্যা সমাধানে রাস্তায় নেমেছি। তিনি বলেন, কুমিল্লা বিভাগের দাবি উঠেছিল ১৯৯৪ সালে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারের উদ্দেশে বলছি, কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করুন। পাশের কোনো জেলার যদি দাবি থাকে, তাদেরও দিয়ে দেন। কুমিল্লা বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন দ্রুত শুরু করুন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে সরকার অনেক কথা দিয়েছিল। তারা সেসব কথা রাখেনি, প্রতারণা করেছে। কুমিল্লায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী ও দুর্নীতি এখনো রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সেদিকে খেয়াল নেই। তিনি আরও বলেন, দেশ মাদকে ভরে গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজ জেলা ও বাড়ির মাদকের চালান বন্ধ করতে পারছেন না। আমাদের যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যুবসমাজকে বাঁচান, দেশকে বাঁচান। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা আশাবাদী জনতার বিজয় হবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আমরা সব দাবি আদায় করব ইনশাআল্লাহ। জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে, আমরা গন্তব্যে পৌঁছাব। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, লংমার্চে আমরা অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি। মানুষ তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করছে। সরকার ১৮০ দিনে দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছে। তারা কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তিনি বলেন, সরকারের মন্ত্রীদের সন্তানরা চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিতে জড়িত। তারা সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। আমরা ঢাকায় লংমার্চের ডাক দেব। এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, দেশ চাঁদাবাজি, খুন-রাহাজানিতে ভরে গিয়ে জাহান্নামে পরিণত হয়েছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার জনগণের রায়কে উপেক্ষা করলে জনগণ সরকারকে প্রত্যাখ্যান করবে। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করবে জনগণ।

ফেনীর সমাবেশ ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ফেনীতে বিদ্যুৎ না থাকলেও সংসদে আছে। গ্যাস ও পানি আছে বিদ্যুৎমন্ত্রীর বাসায়। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ৬ মাস চলে গেছে কিন্তু গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করেনি। সরকার ক্ষমতা গ্রহণের শুরু থেকে বিশ্বাসঘাতকতা করে আসছে। তিনি বলেন, আমাদের বাংলাদেশ গর্বের বাংলাদেশ। এটি আমাদের ঠিকানা। আমাদের কোনো দাদাবাড়ি নেই। বজ পাত হলেও আমরা জনগণের সঙ্গে থাকব। আমরা কোনো দলীয় দাবি নিয়ে রাস্তায় নামিনি, আমরা রাস্তায় নেমেছি জনগণের দাবি নিয়ে। নতুন ফ্যাসিবাদের কবর দিতে। আমরা কোনো চোখ রাঙানিকে ভয় পাই না।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার নির্লজ্জ দলীয়করণ করবে, আর আমরা চুপ করে বসে থাকব-তা হবে না। আমরা প্রতিবাদ করব, গর্জন করব। আমরা কিছু সময় দিচ্ছি, এ সময় দীর্ঘ হবে না। চূড়ান্ত ডাক এলে জনগণকে নেমে আসার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, জুলাই গণহত্যার বিচার আমরা পাইনি। ফ্যাসিবাদমুক্ত, বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ আমরা গড়তে চাই।

যুগান্তর ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলে পথসভা : নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলে পথসভায় বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এই সরকার জনগণের সঙ্গে ভাঁওতাবাজি করছে। জনগণ তাদের ক্ষমা করবে না। ১১ দল আপনাদের পাশে আছে, আপনারাও আমাদের সঙ্গে থাকবেন। আমাদের এই লংমার্চ আজকে শুরু হলেও শেষ কিন্তু নয়। আমরা বিজয় নিয়েই ঘরে ফিরব। নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি মাওলানা আবদুল জব্বার পথসভায় সভাপতিত্ব করেন।

ফেনীর মহিপালে পথসভা : বিকালে ফেনীর মহিপালে পথসভায় জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, এখন যারা ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চাইবে, তাদের মোকাবিলায় ইনশাআল্লাহ সাড়ে ১৫ বছর সময় লাগবে না। আমরা তাদের চিনি। আমরা এই মাটির সন্তান। এখানেই একসঙ্গে অনেকের সঙ্গে চলেছি। কার কতটুকু বুকের পাটা, আমরা জানি। আমাদের বিরুদ্ধে এখন নানা ধরনের চক্রান্ত করা হচ্ছে। অথচ সাড়ে ১৫ বছর তারা কোথায় ছিল? সরকারের অনুগ্রহ নিয়ে একটি পারমিশন নিয়ে রাস্তায় দু-চারজন মানুষ নামানোর সাহসও তারা দেখাতে পারেনি। এখন তারাই বড় বড় কথা বলছে।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ১১ দলের নেতাকর্মীদের ওপর সরকারি দলের নেতাকর্মীরা দেশের কোথাও নির্যাতন-নিপীড়ন চালালে আমরা চুপ করে বসে থাকব না। আমরা ছয় মাস সময় দিয়েছি। এরপরও যদি ১১ দলের কোনো নেতাকর্মীর গায়ে হাত তোলা হয়, তাহলে বিএনপির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, আঘাত করলে পালটা আঘাত আসবে-এটা মনে রাখতে হবে। যারা আঘাত করবে, তাদেরও পালটা আঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আজকের লংমার্চ থেকে আমাদের স্পষ্ট বার্তা-গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে এবং তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের সমাধান করতে হবে। অন্যথায় ক্ষমতার গদিতে থাকা যাবে না।

এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেছেন, হাসিনা চলে গেছে, কিন্তু হাসিনার স্টাইলে বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনা করছে। এমন পরিস্থিতি আমরা কোনোভাবেই হতে দেব না।

এ কারণেই জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে আমরা দেশের প্রতিটি জেলায় যাচ্ছি।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক বলেন, সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, গ্যাস কার্ড, বিদ্যুৎ কার্ড ও সার কার্ড দেওয়ার কথা বলেছে। তবে জনগণের হাতে থাকা সবচেয়ে বড় কার্ড হচ্ছে ‘লাল কার্ড’।

কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে পথসভা : দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কুমিল্লা নগরীর পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় পথসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এই রাস্তায় রক্ত ঢেলেছিলেন আপনাদের সঙ্গীরা। তাদের দাবি পূরণ হয়নি। সেই দাবি পূরণ করার জন্য আমরা রাস্তায় নেমেছি। ইনশাআল্লাহ, দাবি পূরণ করে ঘরে ফিরব। এখানে পথসভায় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরও বক্তব্য দেন। পথসভায় সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও কুমিল্লা মহানগরী আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ।

দাউদকান্দি বিশ্বরোডে সংক্ষিপ্ত পথসভা : ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি বিশ্বরোডে সংক্ষিপ্ত পথসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, চাঁদাবাজদের জ্বালায় জনগণ অতিষ্ঠ। দুর্নীতিবাজদের হাতে জনগণের অধিকার লুণ্ঠিত। গ্যাস নেই, পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই, কিন্তু গ্যাসের বিল যথারীতি আছে। বিদ্যুতের ভূতুড়ে বিল আছে। জনগণকে এমন হয়রানি থেকে সরকারকে বিরত থাকতে হবে।

সব মৌলিক অধিকার আমরা আদায় করব-মীরসরাইয়ে নেতারা : ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রায় ৬ মাস হয়ে গেছে, গণহত্যার একটি বিচারেরও অগ্রগতি নেই। প্রথম দিন থেকেই এ সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আমরা আমাদের সব দাবি আদায়ে মাঠে নামার ডাক দেব। আপনারা অপেক্ষা করুন শুধু। সন্ধ্যায় মীরসরাই সদরের ট্রাফিক চত্বরে লংমার্চের পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। মীরসরাই উপজেলা জামায়াতের আমির মাস্টার নুরুল কবিরের সভাপতিত্বে পথসভায় বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমানসহ ১১ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম