স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান আইন সংশোধন প্রস্তাব
অনলাইনে মনোনয়ন জমা বাদ, যুক্ত হয়নি ‘না’ ভোট
হলফনামায় অসত্য তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিল * নির্ধারণ হয়নি ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা * অনিয়ম হলে ভোটগ্রহণ বন্ধে ক্ষমতা ইসির হাতে
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় এড়াতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোনো আসনে একক প্রার্থী থাকলে ‘না’ ভোটের বিধান চালু করে বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংসদ নির্বাচনে এ বিধান থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের আইন ও বিধির সংশোধনীতে তা যুক্ত করেনি ইসি। উপরন্তু সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার যে সুযোগ ছিল, তাও বন্ধের সুপারিশ করেছে। সম্প্রতি ইসি স্থানীয় সরকার আইন ও বিধি সংশোধনের এ প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।
প্রস্তাবে হলফনামায় নতুন তথ্য দেওয়া, অসত্য তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিল, দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণাসহ বেশকিছু প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের প্রমাণ পেলে ওই নির্বাচন বন্ধের ক্ষমতা ইসির হাতে রাখা হয়েছে। তবে প্রার্থীদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেয়নি কমিশন। ইসি ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
নির্বাচনসংশ্লিষ্টদের মতে, ইসির এ সংশোধনী কার্যকর হলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার সুযোগ কিছুটা হলেও তৈরি হবে। অবশ্য ইসি বলছে, পলাতকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ বন্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের সুযোগ বন্ধ করা হয়। এরই অংশ হিসাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তা বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে একাধিক স্থানে মনোনয়নপত্র দাখিলের সুযোগ থাকবে। ফলে নির্বাচনে বাধা দিয়ে কারও প্রার্থী হওয়ার পথ বন্ধ করা কঠিন হবে। পাশাপাশি নির্বাচনি অপরাধে সাজা বাড়ানোরও প্রস্তাব করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘না’ ভোট থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন ও বিধিতে তা যুক্ত না করার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার যুগান্তরকে বলেন, “জাতীয় সংসদে যেসব আসনে একজন প্রার্থী থাকবেন, শুধু সেখানে ‘না’ ভোটের বিধান রয়েছে। নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হওয়ায় সেখানে এর প্রভাব পড়েনি। আমরা মনে করছি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে হওয়ায় সেখানে আরও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে। এসব বিবেচনায় ‘না’ ভোট যুক্ত করা হয়নি।” অনলাইন মনোনয়নপত্র জমার সুযোগ বাদ দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তা অনুসরণ করা হয়েছে। এছাড়া অনেকে তথ্য গোপন করে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন, সেজন্যই তা বাতিল করা হচ্ছে। এছাড়া অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিষয়ে কারও কারও আপত্তি ছিল। সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।’
তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমার বিধান যুক্ত করা হলে তা সবার জন্য ভালো হতো বলে মনে করেন সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘অনলাইনে আয়কর প্রদান, সাধারণ ডায়েরি করাসহ সরকারি অনেক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আমার মতে, স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনে অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের সুযোগ দেওয়া যেত। আইন ও বিধি সংশোধনের ক্ষেত্রে কোনো দল বা ব্যক্তির দিকে তাকানো সঠিক নয়, এগুলো সর্বজনীন হওয়া উচিত।’
নির্বাচনসংশ্লিষ্টরা জানান, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্তরা অন্যদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করেন। ২০১৬ সালে দুই শতাধিক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিধান চালু করে ওই সরকার। এমনকি ২০২৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। ওই বছরের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বর্তমান ইসি অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমার সুযোগ বাতিল করছে।
চলতি মাসে কিছুসংখ্যক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। এবারও ধাপে ধাপে এ ভোট হবে। প্রথম পর্যায়ে উপকূলীয় জেলা বরিশাল, পিরোজপুর, বরগুনা, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ কয়েকটি জেলার ইউনিয়ন পরিষদকে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। শিগ্গিরই কমিশন সভায় কোন কোন ইউনিয়ন পরিষদে কবে ভোট হবে, তা চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসাবে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদ নির্বাচনের আইনের সংশোধনী এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বিধির সংশোধনীর প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
আইনে যেসব সংশোধনী : জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনে প্রায় একই ধরনের সংশোধনীর প্রস্তাব করেছে ইসি। চূড়ান্ত প্রস্তাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী নাম বহাল রাখা হয়েছে। দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে কেউ অন্য দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে তিনি নির্বাচন করতে পারবেন। একইভাবে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বক্ষণিক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাকরিতে থেকে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। যদিও জামায়াতে ইসলামী এ প্রস্তাবের ঘোর বিরোধিতা করেছে। ইসি তাদের চূড়ান্ত প্রস্তাবে ওই বিধান বহাল রেখেছে। ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র জমা হয়েছে, তাদেরও নির্বাচনে অযোগ্য করার কথা বলা হয়েছে। হলফনামায় অসত্য তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে ওই ব্যক্তির প্রার্থিতা বাতিলের বিধান যুক্তের প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও হলফনামা যাচাই করা হবে কোন প্রক্রিয়ায়, তা পুরোপুরি পরিষ্কার করেনি।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনি অপরাধের সাজা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্বাচনি অপরাধে ন্যূনতম ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনের সময়সীমা সম্পর্কেও নতুন বিধান যুক্তের প্রস্তাব করেছে ইসি। এতে পরিষদের মেয়াদ ৫ বছর শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে ভোট করার বিধান আনা হয়েছে। তবে কোনো কারণে ওই সময়ে ভোট করা সম্ভব না হলে ইসি সুবিধাজনক সময়ে ভোট করবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব আইনের সংশোধনী সংসদে পাশ হতে হবে। চলতি অধিবেশনে এসব সংশোধনী সংসদে ওঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে সংশোধনী পাশ না হলে বিদ্যমান আইনে নির্বাচন হবে।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনবিধি : ইসি সূত্র জানায়, ইসি বিধিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে নির্বাচনি হলফনামায় বেশকিছু নতুন তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এতে একক প্রার্থী থাকলে আগের মতোই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী ঘোষণার বিধান বহাল রাখা হয়েছে। তবে বাড়ানো হয়েছে জামানতের পরিমাণ। নির্বাচনে মোট ভোটের ন্যূনতম ১৫ শতাংশ না পেলে প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হবে।
বিধি ৮০তে নতুন বিধান সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে নির্বাচনসংক্রান্ত দায়িত্ব পালনরত কোনো ব্যক্তিকে হুমকি, ভয় দেখানো বা আঘাত করলে অথবা ভোটারকে ভোট দিতে বাধা দিলে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ডের বিধান যুক্তের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিধি ৯০তে ভোট বাতিলের ক্ষমতা ইসির হাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ৯২ বিধিতে নতুন উপবিধি যুক্তের প্রস্তাব করা হয়েছে। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীর এজেন্ট না থাকলেও নির্বাচন বৈধ বলে গণ্য হবে। নির্বাচনি প্রতীকেও পরিবর্তন আনছে নির্বাচন কমিশন।

