গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার রক্ষা
অধ্যাদেশ ছেঁটে দুর্বল আইন
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গুম প্রতিরোধে অন্তর্বর্তী সরকারের করা অধ্যাদেশে স্বাধীন তদন্ত ও বিচারের শক্ত কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এসেছে। সংসদে পাশ করা নতুন আইনে পুলিশই গুমের ঘটনার তদন্ত করবে। এক্ষেত্রে তদন্তের ক্ষমতা হারাল মানবাধিকার কমিশন। বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা দুটি অধ্যাদেশের সঙ্গে রোববার সংসদে পাশ হওয়া আইন দুটির বেশ কয়েকটি পার্থক্য রয়েছে। ফলে গুমের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন। এ নিয়ে ইতোমধ্যে বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলছে, যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ, তারাই তদন্তের ক্ষমতা পেলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পাবে না। কিন্তু সরকার বলছে, অধ্যাদেশের চেয়ে আইন দুটিকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
জানতে চাইলে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, নতুন আইনে যা করা হয়েছে তা সংবিধানপরিপন্থি। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আইনে বলা হয়েছে-সরকারের অন্য সংস্থা মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে তার ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। অথচ সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে সব নাগরিকের সমান অধিকার। ফলে এক্ষেত্রে সমান অধিকার থাকল না। একই দেশে দুই নিয়ম হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, গুমের অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, এক বাহিনী গুম করলে অন্য বাহিনী তদন্ত করবে। এটি যৌক্তিক নয়। কারণ যখন কোনো বাহিনী গুম করে তখন নিজের পরিচয়ে করে না। অন্য বাহিনীর পরিচয় দেয়। ফলে সাধারণ মানুষ কীভাবে বুঝবে কোন বাহিনী গুম করেছে। তিনি বলেন, সরকার চাইছে বলে আইন দুটি এভাবে হয়েছে। এই আইনের এসব ত্রুটি নিয়ে দেশের মানবাধিকারকর্মী, দেশি-বিদেশি সংস্থা, নাগরিক সমাজ সবাই বিরোধিতা করেছে। কিন্তু সরকার আমলে নেয়নি। তার মতে, এটি বাংলাদেশ। এখানকার বাস্তবতা ভিন্ন। ফলে আইন করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো করে চিন্তা করতে হবে। পশ্চিমা দেশের মতো চিন্তা করলে হবে না।
প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে জনগুরুত্বপূর্ণ ২০টি অধ্যাদেশ সরকার গঠনের ৩০ দিনের মধ্যে আইনে রূপ দেয়নি বিএনপি। এর মধ্যে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ অন্যতম। ফলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে ওই সময়ে অধ্যাদেশ দুটি বাতিল হয়ে যায়। এরপর অধ্যাদেশ দুটিতে সংশোধন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ নিয়ে বিরোধী দলের তীব্র আপত্তি ছিল। এ অবস্থায় বিরোধী দলের তীব্র প্রতিবাদ ও ওয়াকআউটের মধ্যেই রোববার জাতীয় সংসদে পাশ হয়েছে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) বিল ২০২৬’। শিগগিরই এ ব্যাপারে গেজেট জারি হবে।
অধ্যাদেশ ও আইনের পার্থক্য : অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ ও পাশ হওয়া নতুন আইনের মধ্যে তিনটি বড় পার্থক্য রয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে গুমের তদন্ত কাঠামোয়। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে গুমের ঘটনা সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে। নতুন আইনে এই মূল দায়িত্ব চলে গেছে পুলিশের হাতে। পুলিশের উপপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন তদন্ত কর্মকর্তা মামলাগুলোর তদন্ত করবেন। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সরাসরি তদন্তের ক্ষেত্রেও মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে। তৃতীয়ত, অধ্যাদেশে উল্লেখ ছিল-গুমের শিকার ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া বা তার পরিণতি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধান অব্যাহত রাখতে হবে। এক্ষেত্রে তার পরিবারকে নিয়মিত অগ্রগতি জানাতে হবে। তবে নতুন আইনে এই বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে।
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস সোমবার যুগান্তরকে বলেন, অধ্যাদেশে যেভাবে ছিল, নতুন আইনে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমানো (ম্যাসিভলি কার্টেল) করা হয়েছে। এখানে স্বাধীন তদন্তের কোনো সুযোগই রাখা হয়নি। তিনি বলেন, সরকার মুখে যাই বলুক, বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ এই আইনের পয়েন্ট বাই পয়েন্ট আমরা পর্যালোচনা করেছি। সেখানে দেখা গেছে, তদন্ত করার স্বাধীনতা একেবারে নেই। এ কারণেই আমাদের দুশ্চিন্তা। তিনি বলেন, সরকার তদন্তকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলেছে। ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও বলেছে। বাড়ানো হয়েছে অপরাধীদের সাজা। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এগুলোর শুরুটা কোথায়। শুরুটা হলো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর তার একটি স্বাধীন তদন্ত হবে। এই তদন্তে গুমের বিষয়টি প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু গুমের তদন্ত সঠিকভাবে না হলে বিচার হবে কীভাবে? ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, তদন্তটা ঠিকভাবে না হলে পরিবারটা মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হবে। আর মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হলে বড় ঝুঁকি আছে। কারণ এই আইনেই বলা আছে-মিথ্যা অভিযোগের জন্য পাঁচ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড। ফলে ভুক্তভোগী পরিবারটি বাঁচানোর জন্য আমরা বারবার স্বাধীন তদন্তের কথা বলছি।
সরকার ও বিরোধী দল : বিল উপস্থাপনের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেন, নতুন গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন আগের অধ্যাদেশের তুলনায় আরও শক্তিশালী ও কার্যকর। তিনি জানান, আগের অধ্যাদেশে গুমের শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবারের আদালতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাস্তব জটিলতা ছিল। নতুন আইনে তাদের সরাসরি আদালতে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া গুমের বিভিন্ন ধরনকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসাবে গণ্য করে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান যুক্ত হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পত্তি না থাকলেও ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্ত করা হয়েছে সরকারের দায়বদ্ধতার বিধান। তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিনা নোটিশে সংশ্লিষ্ট স্থানে গিয়ে খোঁজ নিতে পারবে। তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ আদালতে সরাসরি গ্রহণযোগ্য করার বিধান রাখা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, জোরপূর্বক গুমের বিচার আগের মতোই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারে থাকবে। আইন প্রণয়নের আগে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে মতামত নেওয়া হয়েছে।
তবে সরকারের এই দাবি মানতে নারাজ বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে যে ধরনের ক্ষমতা ও স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছিল, নতুন আইনের কিছু বিধানে তার পরিধি সংকুচিত হয়েছে। তিনি বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও তদন্তের ক্ষমতা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু আইনে ক্ষমতা দিলেই হবে না, প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক, প্রশাসনিক ও তদন্তগত স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে। বিরোধী দলের অভিযোগ, আইনে কিছু ক্ষেত্রে ‘দ্বৈত প্রয়োগের’ সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত ও জবাবদিহির কাঠামো প্রশ্নবিদ্ধ। গুমের মতো গুরুতর অপরাধের তদন্তে প্রাতিষ্ঠানিক দ্বৈধতা থাকলে বিচারপ্রক্রিয়া দুর্বল হবে।
দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পর্যালোচনায় বলা হয়েছে-নতুন আইনে গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত তদন্তের ক্ষেত্রে মৌলিক ঘাটতি রয়ে গেছে। সংস্থাটি নির্দিষ্টভাবে আইনের ১৫ ধারার সমালোচনা করে বলেছে, এই ধারায় অধস্তন তদন্তকারীর অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে কার্যধারা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। বাস্তবে এটি কতটা প্রভাবমুক্ত থাকবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। এতে অভিযুক্তদের ঢালাওভাবে দায়মুক্তির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ধারা ১৬ নিয়েও সংস্থাটির আপত্তি রয়েছে। ওই ধারায় গুমের শিকার ব্যক্তির পরিণতি নিয়ে পরিবারকে জানানোর যে বিধান ছিল, আইনে তা রাখা হয়নি।
আওয়ামী লীগের সময়ে গুম করা ব্যক্তিদের লুকিয়ে রাখতে ‘আয়নাঘরের মতো ভয়ংকর আস্তানা তৈরি করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত গুম কমিশনের রিপোর্টের আলোকে গুম থেকে দেশের সব নাগরিককে সুরক্ষা দিতে আইনি কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এতে গুমকে ‘চলমান অপরাধ’ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করে এর সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয় মৃত্যুদণ্ড।

