রাশিয়া থেকে ক্রয়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
টাকা গেল, এলো না কপ্টার
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পুলিশবাহিনীর জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য রাশিয়া থেকে ৫৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা দুটি হেলিকপ্টারের একটিও পাচ্ছে না বাংলাদেশ সরকার। জি-টু-জি পদ্ধতিতে এই আমদানির মধ্যস্থতাকারীকে ৪ শতাংশ হারে প্রায় ১৭ কোটি টাকা কমিশন দেওয়া হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩ অর্থবছরে হেলিকপ্টারের মূল্য বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৪২৮ কোটি টাকা। সবকিছু সঠিকভাবে পরিশোধ করা সত্ত্বেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে হেলিকপ্টার পাচ্ছে না বাংলাদেশ। কবে নিষেধাজ্ঞা উঠবে আর কবে হেলিকপ্টার পাওয়া যাবে-তা কেউ বলতে পারছেন না। এই অবস্থায় সরকার অর্থ ও পণ্য দুদিকেই ক্ষতির শিকার। ‘আম-ছালা দুটোই গেল’ বলা যায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চুক্তির ২ মাসের মাথায় রাশিয়ান জেএসসি হেলিকপ্টার্সের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জেনেশুনে পর্যায়ক্রমে ৩ অর্থবছরে মূল্য পরিশোধ করেছে সরকার। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮ কর্মকর্তা প্রিশিপমেন্ট ইন্সপেকশনে (চালানের আগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা) রাশিয়াও সফর করেছেন। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার হেলিকপ্টার আপাতত গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সূত্রটি জানায়, ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর ওই রুশ কোম্পানি থেকে ‘এমআই১৭১এ২’ মডেলের দুটি হেলিকপ্টার কেনার জন্য চুক্তি করে বাংলাদেশ সরকার। দরপত্র ছাড়াই জি-টু-জি পদ্ধতিতে চুক্তি হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ৫৫৬ কোটি টাকা। ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩ অর্থবছরে মোট মূল্যের ৭০ শতাংশ হারে প্রায় ৪২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। রুশ কোম্পানিটির ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ২০২২ সালের প্রথমদিকে। বিষয়টি জানার পরও ২০২৪ সাল পর্যন্ত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়। এরপরই সরকারের নড়াচড়া শুরু হয়।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মঞ্জুর মোর্শেদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘রাশিয়া থেকে পুলিশ বাহিনীর জন্য আমি কোনো হেলিকপ্টার কিনিনি। যারা কিনেছে তাদের গিয়ে জিজ্ঞেস করুন। এটা আমার বিষয় নয় এবং এ বিষয়ে আমি কথা বলব না।’ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবু নঈম যুগান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান দায়িত্বে আমি মাত্র ২৪ দিন কাজ করছি। হেলিকপ্টার কেনার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘এই চুক্তি হয়েছে ২০২১ সালে। তখন আমরা কেউ বর্তমান দায়িত্বে ছিলাম না। রাশিয়ার সরকারি যে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে হেলিকপ্টার কেনা হয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকারের নজরে এসেছিল। ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা হয়েছে শুনেছি। বিষয়টি নিয়ে সবাই কেমন যেন লুকোচুরি করছে।’
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া হেলিকপ্টার সরবরাহ করবে বলে জানালেও আপাতত তা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গিয়ে রাশিয়ার হেলিকপ্টার নেওয়া যাবে না। তা নিলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব পড়তে পারে।’
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে দায়িত্ব পালন করা এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে জানান, ‘জি-টু-জি পদ্ধতিতে হেলিকপ্টার কেনা হলেও এর মধ্যস্থতাকারী সৈয়দ আহসান আহমেদ সায়মুমকে ক্রয়মূল্যের ওপর ৪ শতাংশ হারে ১৭ কোটি ১২ লাখ টাকা কমিশন দেওয়া হয়েছে। সাইমুম তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ক্যাশিয়ার ছিলেন। নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানার পরও আট কর্মকর্তা চালান পরীক্ষা (পিএসআই) করতে রাশিয়া যাওয়ার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ওই কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, চুক্তির শর্ত অনুসারে যেতে হয়েছিল, কারণ এটা আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ও ইউক্রেন সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এরপর রাশিয়ার যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদনকারী সব প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এ ঘটনার মাত্র ২ মাস আগে ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে দুটি হেলিকপ্টার কেনার চুক্তি করে বাংলাদেশ। চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ সরকার ২০২৪ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ৩ অর্থবছরে ৪২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করার কথা। শর্তানুযায়ী ওই সময়ের মধ্যেই হেলিকপ্টার দুটি সরবরাহ করার কথা ছিল রাশিয়ার। এমনকি রাশিয়া ২০২৫ সালের ১৭ জানুয়ারি সরবরাহের জন্য একটি হেলিকপ্টার প্রস্তুতও করে। অপরটি ২০২৪ সালের এপ্রিলে দেওয়ার কথা ছিল।
একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরই রাশিয়ার চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি ছিল। কারণ চুক্তির ২ মাসের মধ্যে অর্থকড়িও লেনদেন তেমন হয়নি। সবকিছু জানার পরও অর্থ পরিশোধ করার মধ্যে বড় কোনো দুর্নীতি থাকতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ব্যক্তি স্বার্থের জন্য জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে। কমিশনভোগী রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত ও দুর্নীতিবাজ আমলারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও স্বরাষ্ট্র সচিবকে বিষয়টি জানানো উচিত ছিল। অদৃশ্য কারণে তারা সত্য গোপন করেছেন। নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তা এখনো এ সংক্রান্ত ফাইল চালাচালি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

