স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগ
র্যাগিং-মানসিক পীড়নে রুয়েট ছাড়লেন মায়িশা
Advertisement
মায়িশা মোর্শেদ কথা
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্থাপত্যবিদ্যা শিক্ষার ব্রত নিয়ে মাত্র কয়েক মাস আগে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) পা রেখেছিলেন বগুড়ার মেয়ে মায়িশা মোর্শেদ কথা। তীব্র প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে ২০২৫-২৬ শিক্ষা সেশনে আর্কিটেকচার বা স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হন এই শিক্ষার্থী। কিন্তু এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলমান র্যাগিং, মানসিক পীড়ন, হয়রানি ও নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হন। ‘বিষাক্ত র্যাগিং’-প্রথার সঙ্গে নিজেকে কোনোভাবেই মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে
ক্রমাগত মানসিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। শেষে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যান। রুয়েট ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার কথা প্রকাশ করেছেন নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মায়িশা মোর্শেদ কথা রুয়েটের রেজিস্ট্রার বরাবর ভর্তি বাতিলের আবেদন করেছিলেন ৯ আগস্ট। রুয়েট কর্তৃপক্ষ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি তার ভর্তি বাতিল করেছে। রেজিস্ট্রার দপ্তরে জমা দেওয়া বিভিন্ন পরীক্ষার সনদপত্র ও কাগজপত্র তাকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। মায়িশা ইতোমধ্যে রুয়েটের ছাত্রী হল-১ ছেড়ে জিনিসপত্র নিয়ে বাড়িতেও চলে গেছেন।
এদিকে রোববার মায়িশা মোর্শেদ কথা ফেসবুকে নিজের আইডিতে দীর্ঘ এক পোস্টে রুয়েট ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। তার পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এরপর থেকেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে রুয়েটের শিক্ষা প্রশাসনের দায়বদ্ধতা ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মায়িশার ফেসবুক পোস্ট নিয়ে সর্বত্র চলছে আলোচনা-সমালোচনা। তবে একজন শিক্ষার্থী ভর্তির কয়েক মাস পরই কেন এবং কোন পরিস্থিতিতে রুয়েট ছেড়ে গেলেন, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো অনুসন্ধান ও উদ্যোগ নেই।
ভর্তি বাতিল করে মায়িশার রুয়েট ছেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে মঙ্গলবার দুপুরে কথা হয় ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. আরিফ আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, কে কোন পরিস্থিতিতে ফেসবুকে পোস্ট দিল, এ নিয়ে কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিতে পারে তা আমার জানা নেই। তিনি তো কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো কিছু বলেননি। কোনো অভিযোগ করেননি। এছাড়া ভর্তি বাতিলের আবেদনে মায়িশা বলেছেন, রাজশাহীর সামগ্রিক আবহাওয়া ও পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পারায় ভর্তি বাতিল করতে চান। কর্তৃপক্ষ তার আবেদন গ্রহণ করে ভর্তি বাতিল করেছেন। তার সব জমা কাগজপত্র ফেরত দেওয়া হয়েছে।
হয়রানির শিকার মায়িশা মোর্শেদ বিভাগের ‘সিনিয়র-জুনিয়র চেইন সিস্টেম’, মানসিক হয়রানি, প্রকট বৈষম্য ও শিক্ষার অসুস্থ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন। মায়িশা রুয়েটের আর্কিটেকচার বিভাগের ২৫ সিরিজের শিক্ষার্থী ছিলেন। মঙ্গলবার দুপুরে মায়িশার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কল না ধরায় কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ফেসবুক পোস্টে মায়িশা মোর্শেদ আরও বলেন, রুয়েটের আর্কিটেকচার বিভাগের সিস্টেম অন্যান্য বিভাগের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। সেখানে প্রায় সবকিছুই ‘চেইন সিস্টেম’ বা ‘আমলা-কামলা’ প্রথার অধীনে পরিচালিত হয়। তাকে যিনি এই চেইনে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে সেই বিষয়টি নিয়েই তাকে নানা কটূক্তি ও অপমানের শিকার হতে হয়েছে। চেইনের সদস্যদের কাছ থেকে তিনি কোনো ধরনের সাপোর্ট বা স্বাচ্ছন্দ্য পাননি; বরং তাকে প্রায়ই অবহেলা করা হতো। এছাড়া কাজের জন্য চেইনের অন্য সদস্যদের বাসায় রাতে থাকার যে রেওয়াজ বা প্রথা চালু রয়েছে, তা তার পরিবারের কাছে নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য ছিল না। যা তার জন্য একটি বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করে। এটা তিনি কোনোভাবেই গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলেন না।
মায়িশা আরও লিখেছেন, রুয়েট কাগজে-কলমে র্যাগিংমুক্ত প্রতিষ্ঠান হলেও কিছু সিনিয়রের অযাচিত আচরণ একাডেমিক কাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলত। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত একটানা ক্লাস এবং ক্যাম্পাসের ভেতরে খাবার খাওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় তার স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয়। এ নিয়ে তিনি মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
মায়িশা ক্ষোভের সঙ্গে লেখেন, একটি অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানির শিকার হন তিনি। ঘটনাটির পুরো দায়ভার তার ওপরেই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা তিনি করেননি। বিষয়টি নিয়ে তিনি মানসিকভাবে বিভ্রান্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হতে থাকে। পুরো বিভাগে তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় এবং অবহেলার শিকার হন, যেখানে একপর্যায়ে তাকে বয়কট করার চেষ্টা করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে তিনি ইমিডিয়েট বা বিভাগের নিকটবর্তী সিনিয়র বা সরাসরি সিনিয়রদের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাননি। যদিও মায়িশা সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটির বিষয়ে বিস্তারিত কিছু লেখেননি বা প্রকাশ করেননি।
বিভাগের সিনিয়রদের আচরণ ও মন্তব্যের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও লেখেন, ওই সিনিয়রের মতে-আর্কিটেকচারে পড়া অবস্থায় খাওয়াদাওয়া বা অসুস্থতার কথা বলা নিষেধ। এমন বিষাক্ত মানসিকতা ও পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পেরেই শেষ পর্যন্ত নিজের মানসিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সুস্থতার কথা বিবেচনা করে তিনি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মায়িশা তার পোস্টের শেষে উল্লেখ করেছেন, রুয়েটের প্রতি তার কোনো ক্ষোভ, অভিযোগ নেই। তবে নিজের মানসিক শান্তির জন্যই তাকে বাধ্য হয়ে স্বপ্নের বিষয় আর্কিটেকচার পড়া ছেড়ে বিদায় জানাতে হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভর্তির পর থেকেই মায়িশা র্যাগিংয়ের শিকার হচ্ছিলেন। রুয়েট ক্যাম্পাসে নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ ও বৈষম্যের শিকারও হন। তবে তিনি বিভাগের সভাপতি অথবা রুয়েটের ছাত্রকল্যাণ দপ্তরে কোনো অভিযোগ করেননি। ভর্তি বাতিল করে মায়িশার রুয়েট ছেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে আর্কিটেকচার বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. সাব্বির আহসান বলেন, এ বিষয়ে আমিও জেনেছি; কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে বিভাগে এমন কোনো অভিযোগ করেননি। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই তার ভর্তি বাতিল করা হয়েছে বলে শুনেছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি দেখতে পারে। যদি কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হয়, কেউ দোষী হলে কর্তৃপক্ষ সেটি দেখবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মকানুন আছে। অভিযোগ দিলে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারেন। ঘটনার বিষয়ে মঙ্গলবার রুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এসএম আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কল না ধরায় তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কথা হয় শিক্ষার্থী মায়িশা মোর্শেদের সঙ্গে। রুয়েট ত্যাগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি ফেসবুকে যে পোস্ট দিয়েছি সেটাই আমার কথা। তবে আমি ভর্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানালে আমার বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক সাব্বির আহসান স্যার আমাকে সিদ্ধান্ত বদলের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু আমার বাবাসহ পরিবারের সবার মতামতের মাধ্যমে সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়েছিল। শেষে আমি চলে আসি। তবে আসার আগে আমি আর্কিটেকচার বিভাগের সভাপতি স্যারের কাছে লিখিত অভিযোগ করে এসেছি। কোনো অভিযোগ করিনি-কর্তৃপক্ষের সেই দাবি ঠিক নয়।

