ইতালিতে অভিনেত্রী বাঁধনের ওপর হামলা
জড়িতরা আ.লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত : বাঁধন * নির্মমতার চরম বহিঃপ্রকাশ -ডেপুটি স্পিকার * কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ -পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী * কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না -তথ্য ও সম্প্র্রচার উপদেষ্টা
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন হামলার শিকার হয়েছেন। ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে তিনি হামলা ও হেনস্তার শিকার হন। সোমবার রাতে ভেনিসের মেস্ত্রে এলাকার একটি পার্কে একদল বাংলাদেশি তাকে ঘিরে ধরেন এবং তার দিকে পানি, কোমল পানীয় ও ডিম ছুড়ে মারেন। পাশাপাশি শারীরিকভাবে তাকে লাঞ্ছিত করা হয়। এ সময় তার সঙ্গে ভাই, ভাবি ও চার বছর বয়সি এক শিশু ছিল। এ ঘটনার পর বাঁধন ইতালির পুলিশের দ্বারস্থ হন। বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক পদক্ষেপের কথাও জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বাঁধনের দিকে কয়েকজন ব্যক্তিকে তেড়ে যেতে এবং উত্তেজিতভাবে কথা বলতে দেখা যায়। হামলাকারীদের কয়েকজন নিজেদের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী এবং ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ হিসাবে পরিচয় দেন। ‘জুলাই যোদ্ধা’ বলে আখ্যা দিয়ে বাঁধনকে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলতেও বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় সরকারের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিষয়টি নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে।
আমার কানের কাছে আঘাত করেছে : হামলার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লাইভে এসে বাঁধন ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে পার্কে যাওয়ার পর অনেক বাঙালি তাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করেছেন। তার শরীরে পানি ও কোক ছুড়ে মারা হয়েছে এবং এতে তিনি পুরোপুরি ভিজে যান। একপর্যায়ে তার গায়ে হাত তোলা হয়, ফোন ফেলে দেওয়া হয় এবং কানের কাছে আঘাত করা হয়। সঙ্গে থাকা পরিবারের সদস্যদেরও হেনস্তা করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। বাঁধনের দাবি-২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তার অবস্থানের কারণেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিরা তার ওপর হামলা চালিয়েছে। তিনি আরও জানান, তিনি জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন এবং এ অবস্থানের জন্য তিনি অনুতপ্ত নন।
আরেক দফা বক্তব্যে বাঁধন জানান, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ইতালিতে তিনি মামলা করবেন এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষ না করে দেশে ফিরবেন না। তার কাছে ঘটনার ‘সব এভিডেন্স’ রয়েছে। বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। তিনি জানান, স্থানীয় পুলিশ তাকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাস ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। বাঁধনের অভিযোগ-হামলায় জড়িত ব্যক্তিরা ইতালিপ্রবাসী আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত। তারা নিজেরাও সেই পরিচয়ই দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশিত ভিডিওতে কয়েকজনকে ছাত্রলীগের পরিচয় দিতে দেখা গেছে। বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে এসব দাবি করা হয়। হামলায় সরাসরি জড়িত আটজনের নাম সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট জুলকারনাইন সায়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। জড়িতরা হলেন-হাওলাদার মনিরুল, মাসুম খালাসি, সেপল মাহমুদ বিপ্লব, কাজী লাবু, আলতাব পাহার, প্রেম কুমার হৃদয়, নুর-ই আলম ও মোক্তার মোল্লা। বাঁধনের ওপর হামলার দুই দিন আগে ইতালিতে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে হামলাকারীদের সাক্ষাৎ হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ও ছবি জুলকারনাইন ফেসবুকে নিজের ওয়ালে প্রকাশ করেছেন।
অমার্জনীয় ও নিন্দনীয় অপরাধ : ভেনিসে আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, চিত্রনায়িকা বাঁধনের ওপর যে হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা অমার্জনীয় ও নিন্দনীয় অপরাধ। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে আলোচনার ফাঁকে তিনি বলেন, এ ঘটনায় নির্মমতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
একই দিন জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, এ ঘটনার পর বাঁধনের সঙ্গে রোমে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং মিলানে বাংলাদেশের কনস্যুলার জেনারেল নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। ইতালীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভেনিসের স্থানীয় পুলিশ দ্রুত সাড়া দিয়েছে এবং বাঁধনকে প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা দিতে দূতাবাস ও কনস্যুলেটকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ ও দূতাবাসে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করবেন বাঁধন এবং এরপর বাংলাদেশ দূতাবাস বিষয়টি ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে জোরালোভাবে তুলে ধরবে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, এ হামলার ঘটনায় কঠোর অবস্থান জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। একজন ‘জুলাই যোদ্ধার’ ওপর হামলা দেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ওপর হামলার শামিল। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও বাঁধনের সঙ্গে কথা বলে সরকারের পূর্ণ সমর্থন জানানো হয়েছে।
তথ্য ও সম্প্র্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, এ হামলার ঘটনায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হক জানান, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ইতালির প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিদেশে কেন জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়াদের হেনস্তা : জাতীয় সংসদে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ-সদস্য আখতার হোসেন বলেন, বিভিন্ন সময়ে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিএনপি, জামায়াত বা অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী বা সাধারণ মানুষ বিদেশে গিয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের হামলা ও হেনন্তার শিকার হয়েছেন। এবার দেশের একজন অভিনেত্রী বিদেশে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আখতার বলেন, জাতিসংঘের একটি কর্মসূচিতে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সময় তিনি এ ধরনের হামলার শিকার হন। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশিদের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনায় জড়িত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আইনের আওতায় আনতে সরকারের পরিকল্পনা কী এবং এ বিষয়ে সরকার দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে কি না, তিনি জানতে চান।
আসিফ মাহমুদ ও সারজিসের নিন্দা-প্রতিবাদ : বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা-প্রতিবাদ জানিয়েছেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। বাঁধনের প্রতি পূর্ণ সংহতি জানান তিনি। এদিকে বাঁধনকে নিয়ে গর্বিত হওয়া, তার পাশে থাকার কথা জানান এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। মঙ্গলবার সকালে আসিফ মাহমুদ এবং সোমবার রাতে সারজিস আলম ফেসবুক পেজে দেওয়া পৃথক পোস্টে এ প্রতিক্রিয়া জানান।
জামায়াতের নিন্দা ও প্রতিবাদ : বাঁধনের ওপর হামলা, হেনস্তা ও কুৎসিত আচরণের তীব্র ক্ষোভ, নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মহিলা বিভাগ। মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে জামায়েতের মহিলা বিভাগের প্রচার বিভাগীয় সেক্রেটারি নাজমুন নাহার বলেন, এ ধরনের সংঘবদ্ধ হামলা, গায়ে ডিম-পানি নিক্ষেপ এবং প্রকাশ্যে হেনস্তা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাজনৈতিক মতপার্থক্য যত গভীরই হোক, তা কাউকে গায়ে হাত তোলার বা প্রকাশ্যে অপমান করার অধিকার দেয় না। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে রাজপথে নেমেছিলেন বাঁধন। ইতালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসকে বাঁধন ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।
কেন ভেনিসে বাঁধন : এবারের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের অরিজন্তি প্রতিযোগিতা বিভাগে রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমা স্থান পেয়েছে। এ সিনেমায় অভিনয় করেছেন আজমেরী হক বাঁধন। ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে তিনি ইতালিতে অবস্থান করছেন। ৬ সেপ্টেম্বর সালা দারসেনা থিয়েটারে সিনেমাটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। সিনেমার চার নারী চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাইনীন করিম, রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ্ বিনতে কামাল ও আজমেরী হক বাঁধন।
ইতালিতে অভিনেত্রী বাঁধনের ওপর হামলাকারী মনিরুলের মা ও ভাই আত্মগোপনে : মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলাকারী মনিরুল হাওলাদারের বাড়ি মাদারীপুরের ধুরাইলের গ্রামে। এ ঘটনা জানাজানি হলে হামলার ভয়ে মনিরুলের মা ও ভাই আত্মগোপনে চলে গেছে। আর হামলার ঘটনার জন্য মনিরুলের শাস্তি দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
জানা গেছে, সদর উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের খালাসীকান্দি এলাকার শাজাহান হাওলাদারের কনিষ্ঠ পুত্র মনিরুল। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের ধুরাইল ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন মনিরুল। এলাকাবাসী জানায়, মঙ্গলবার সকালে জুলাই যোদ্ধাদের পক্ষ থেকে তিনজন মনিরুলের গ্রামের বাড়িতে ঘুরে গেছেন। তবে তারা কারও সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। তাদের পরিচয়ও কেউ দিতে পারেনি।
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কামাল আজাদ বলেন, ঘটনাটি জানার পর মনিরুলের বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। কেউ যেন বাড়ি-ঘরে হামলা করতে না পারে সে ব্যাপারে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যানকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। তিনি সব ধরনের সহযোগিতা করছে।
মনিরুলের সৎ ভাই ওবায়দুল হাওলাদার জানান, সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খান ও তার ছেলে সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আসিবুর রহমান খানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন মনিরুল। গ্রামের বাড়িতে তার মা আলেয়া বেগম ও বড়ভাই বসবাস করেন। তার তিন বোনের বিয়ে হয়ে গেছেন। দেড় বছর আগে ২৮ লাখ টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে লিবিয়া হয়ে ইতালি পাড়ি জমিয়েছে মনিরুল।
ভেনিসে বাঁধনের ওপর হামলা আওয়ামী সন্ত্রাসবাদের বহিঃপ্রকাশ-এবি পার্টি : এক যৌথ বিবৃতিতে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, একজন নারী শিল্পী পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিদেশে বেড়াতে গিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। এ ঘটনা শুধু নিন্দনীয় নয়, এটি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভয়ংকর বহিঃপ্রকাশ।
