Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

প্রণোদনার নামে টাকা আত্মসাৎ

পাঁচ কোটি টাকা তুলে নিলেন ১৩ কর্মকর্তা

Advertisement

হামিদ বিশ্বাস

হামিদ বিশ্বাস

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পাঁচ কোটি টাকা তুলে নিলেন ১৩ কর্মকর্তা

Advertisement

দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে লুটপাট থেমে নেই। প্রণোদনার নামে জুনেই ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ কর্মকর্তা চার কোটি টাকা ভাগ করে নিয়েছেন। বাকিটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পকেটে। ব্যাংকের প্রধান শাখায় ‘উজ্জীবন আমানত ক্যাম্পেইন’ নামে একটি প্রকল্প থেকে এই টাকা নেওয়া হয়। এ কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএস) মো. হামিদুর রহমান ও ট্রেজারি বিভাগের প্রধান মো. দেলোয়ার হোসেন। তবে এ ব্যাপারে এমডির সম্পৃক্ততা রয়েছে। কমার্স ব্যাংক নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এই ঘটনায় ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির সুপারিশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও ব্যাংকিং খাতে এ ধরনের কেলেঙ্কারি গ্রহণযোগ্য নয়। এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাংকিং খাতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। তবে ব্যাংকের এমডি বলছেন, পরিচালনা পর্ষদের মৌখিক অনুমোদন ছিল।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি এখনো চলছে। এটি গ্রহণযোগ্য নয়। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এ ধরনের ঘটনা আর যাতে না ঘটে সে ব্যাপারে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম বন্ধ হবে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘উজ্জীবন আমানত ক্যাম্পেইন-২০২৬’-এর নামে ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তাকে ৪ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। ১৪টি চেকে তারা এই টাকা তুলেছেন। এর মধ্যে চলতি বছরের ৪ জুন ৯টি চেকে ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা এবং ৭ জুন ৫টি চেকে ৯৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কমার্স ব্যাংকের প্রধান শাখায় আনা আরও ৫ কোটি টাকা নিয়েছেন তারা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ৫ কোটি টাকা তিনটি পাটের বস্তায় শাখায় এনে পরে ছয় বস্তায় প্যাকেট করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়-দুই কর্মকর্তা টাকা নিয়ে শাখা ত্যাগ করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সভায় ‘উজ্জীবন’ কর্মসূচির আওতায় ২৭০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা নতুন আমানত সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কর্মসূচির মেয়াদ ছিল চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল থেকে ১৪ মে পর্যন্ত। পরে তা ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হলেও বাড়তি সময়ের ব্যাপারে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছিল না। কিন্তু তা আমলে নেয়নি ব্যাংক। পরে ১৩ কর্মকর্তাকে ১০০ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহের বিপরীতে মোট ৪ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৪ টাকা হারে প্রণোদনা। যে সব কর্মকর্তা এই সুবিধা নিয়েছেন এর মধ্যে রয়েছেন-এমডির পিএস মো. হামিদুর রহমান ৮০ লাখ টাকা, এফএভিপি মোহাম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক উল্লাহ ৮০ লাখ টাকা, এভিপি সালেহ আহমেদ ২০ লাখ টাকা, অফিসার মো. সরোয়ার ৮ লাখ টাকা, এফএভিপি সুজন দাস ৮ লাখ টাকা। এভিপি তাশনুভা মজুমদার, মো. আহসান হাবীব ও পিও মো. আদনান শফিক-প্রত্যেকে ৪০ লাখ টাকা করে পান। আরও রয়েছেন-মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, মো. মনিরুল হক, রিফাতুল মুরসালিন, সাইফুর রহমান ও শাহিনুর রহমান। কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, তাদের স্বাক্ষর করা চেক মার্কেটিং বিভাগে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু টাকা উত্তোলনের সময় তারা শাখায় উপস্থিত ছিলেন না। ‘বেয়ারার’ (বহনকারী) হিসাবে টাকা তোলা হয়েছে। কিন্তু শাখায় সংরক্ষিত চেক পরীক্ষা করে বাংলাদেশ ব্যাংক দেখতে পায়, চেকের পেছনে কারও নাম বা স্বাক্ষর নেই।

জানতে চাইলে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়দুল হক বুধবার টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, ‘যেভাবে আপনারা বলছেন বিষয়টা ওইভাবে না। পরিচালনা পর্ষদের মৌখিক অনুমতি নিয়ে কাজটা করা হয়েছে। পরে তারা লিখিত অনুমোদন দিয়েছেন। সামনাসামনি কথা বললে বিষয়টি বুঝিয়ে বলা যেত।’

সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৪ জুন বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আনা ৫ কোটি টাকা প্রধান শাখার ভল্টে রাখা হয়। পরে ছয়টি পাটের বস্তায় টাকা প্যাকেট করা হয়। এমডির পিএস মো. হামিদুর রহমান এবং ট্রেজারি বিভাগের প্রধান মো. দেলোয়ার হোসেন ছয়টি বস্তা খুলে টাকা গ্রহণ করেন। এরপর ওই দুই কর্মকর্তা ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা নিয়ে কালো রঙের একটি গাড়িতে শাখা ত্যাগ করেন। ৭ জুন ওই দুই কর্মকর্তা আরও ৯৬ লাখ টাকা উত্তোলন করে শাখা থেকে বেরিয়ে যান। অর্থাৎ ২ দিনে তাদের মাধ্যমে মোট ৪ কোটি টাকা শাখা থেকে বের হয়ে যায়। ব্যাংকের গাড়ির লগবুক, সিসিটিভি ফুটেজ ও চালকের বক্তব্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৪ জুন ওই গাড়িতে দেলোয়ার হোসেন ও হামিদুর রহমান উত্তরা ক্লাবে এবং ৭ জুন গুলশান ক্লাবে যান। পরিদর্শনে আরও গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ে। ৪ জুন দুপুর দেড়টায় ৪ কোটি টাকা নগদ লেনদেন করা হয়। ওই সময়ে এই টাকা অগ্রিম ব্যয় দেখিয়ে ১৩ কর্মকর্তার হিসাবে অর্থ দেওয়ার জন্য ইস্যু করা হয়। কিন্তু ব্যাংকের লেজারে ওই লেনদেনের পোস্টিং করা হয় সন্ধ্যা ৭টায়। অর্থাৎ হিসাবের লেনদেন সম্পন্ন করার আগেই নগদ অর্থ তুলে নেওয়া হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আগেও ব্যাংকের প্রধান শাখার সাসপেন্স হিসাব থেকে বিভিন্ন সময়ে ২৯টি এন্ট্রির মাধ্যমে ১১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এসব অর্থ ব্যবসা উন্নয়ন ও আমানত সংগ্রহের ব্যয় হিসাবে দেখানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন বিভাগ বিষয়টি নিয়ে নিরীক্ষা করে।

প্রতিবেদনে ট্রেজারি বিভাগের প্রধান মো. দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আগের বিভিন্ন অনিয়মের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। ব্যাংকের প্রধান শাখায় দায়িত্ব পালনের পর তিনি ব্যবসা উন্নয়নের নামে সাসপেন্স খাত থেকে বিভিন্ন সময়ে ১১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের ঢাকা-১-এর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে দেলোয়ার হোসেনসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। ওই মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, দেলোয়ার হোসেন ব্যাংকের ৭৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়াও তিনি ৭ লাখ ৩ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের সোয়েটার যুক্তরাজ্যে রপ্তানির পর মূল্য দেশে ফেরত আনেননি। ২০২৩ সালের ১১ জুলাই মামলাটি করা হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এর আগে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের দায়ে দেলোয়ার হোসেন এনআরবিসি ব্যাংক থেকে চাকরি হারিয়েছেন। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী কোনো ব্যাংকে চাকরির অযোগ্য হলে তিনি অন্য ব্যাংকে চাকরি করতে পারেন না। কিন্তু এই নিয়ম অমান্য করে তাকে চাকরি দিয়েছে কমার্স ব্যাংক। এ অবস্থায় মো. দেলোয়ার হোসেন ও মো. হামিদুর রহমানকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম