গিলে খাচ্ছে গ্রিডের ৫% বিদ্যুৎ
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক-সবখানেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। স্বল্প ভাড়ায় যাতায়াতের সুযোগ থাকায় নিু ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কথিত ‘বাংলার টেসলা’। দিনকে দিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এ বাহনের সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে অবৈধ চার্জিং স্টেশন। ফলে একদিকে বাড়ছে বিদ্যুৎ চুরি, অপরদিকে চাপ পড়ছে জাতীয় গ্রিডে।
ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা কত? এর কোনো সঠিক তথ্য নেই সিটি করপোরেশন কিংবা সরকারের অন্য কোনো সংস্থার কাছে। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক খালেকুজ্জামানের মতে, এ সংখ্যা শুধু ঢাকায় ১২ লাখের বেশি হতে পারে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণার তথ্যানুযায়ী, ব্যাটারিচালিত রিকশার অবৈধ ও অননুমোদিত চার্জিংয়ের কারণে বিদ্যুৎ চুরি ও সিস্টেম লস বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। এসব রিকশা চার্জে প্রতিদিন ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। যেখানে প্রতিদিন দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৭-১৮ হাজার মেগাওয়াট। ফলে মূল গ্রিডের ৫ শতাংশ চলে যাচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশার পেছনে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, রাজধানীতে প্রায় ৫ হাজার ২৩৯টি বৈধ চার্জিং স্টেশনের বিপরীতে ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট শনাক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় দেড় হাজার অবৈধ গ্যারেজ শনাক্ত করা হয়েছে।
গ্যারেজে-গ্যারেজে অবৈধ বিদ্যুতের কারবার : রাজধানীর মিরপুর, বাড্ডা, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, রামপুরা, খিলগাঁও, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচরসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন দেখা যায়, অলিগলিতে গড়ে ওঠা অসংখ্য ব্যাটারিচালিত রিকশার গ্যারেজগুলোয় নেই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা। কোথাও নামমাত্র বৈদ্যুটিক মিটার থাকলেও পাশাপাশি অবৈধ সংযোগও রয়েছে। ৩০ আগস্ট সন্ধ্যায় পশ্চিম কাফরুলের আনন্দবাজার এলাকার একটি গ্যারেজে ৫০টিও বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা দেখা যায়। গ্যারেজটির মেকানিক তসলিম হোসেন জানান, প্রতিদিন এই গ্যারেজের বিদ্যুৎ বিল আসে প্রায় আড়াই হাজার টাকা। পাশেই মোতাহারের আরেকটি গ্যারেজে শতাধিক ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। সেখানে একটি মিটারও দেখা যায়। গ্যারেজ ব্যবস্থাপক আবুল জানান, প্রতিদিন এ গ্যারেজের বিদ্যুতের বিল আসে প্রায় ৪ হাজার টাকা। যেখানে একটি রিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে খরচ হয় ৭০ থেকে ১০০ টাকা। সেখানে ৪ হাজার টাকায় এত রিকশার ব্যাটারি চার্জ হয় কীভাবে! জানতে চাইলে আবুল অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ থাকার কথাও স্বীকার করেন।
খুঁটি থেকে সরাসরি চার্জ : একই দিন রাতে মিরপুর-১৩ নম্বর এলাকায় পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টের (পিএমও) পেছনে খালপাড় সড়কে দেখা যায়, সরাসরি সড়কের বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে অবৈধ সংযোগ দিয়ে অর্ধশতাধিক রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে।
এ যেন প্রকাশ্যে চলছে বিদ্যুৎ চুরির মহাযজ্ঞ। রূপনগর এলাকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গড়ে উঠেছে শতাধিক অনানুষ্ঠানিক গ্যারেজ। বিদ্যুতের খুঁটি থেকে ঝুলন্ত তারের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে চার্জিং অ্যাডাপ্টার। প্রতিটি রিকশা চার্জ বাবদ নেওয়া হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা বিদ্যুৎ চুরির কারবারি করছেন। রূপনগরের আহাদ আলীর গ্যারেজের চালক শাকিল জানান, প্রতিদিন একটি রিকশা চার্জ করতে ১২০ টাকা দিতে হয়। বড় ব্যাটারির গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া হয় ১৫০ টাকা। ৩১ আগস্ট তেজগাঁওয়ের কুনিপাড়া, নাখালপাড়া, রেললাইনকেন্দ্রিক সড়ক ও শিল্পাঞ্চল এলাকায় ঘুরেও একই অবস্থা দেখা গেছে। সড়কের বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে নেওয়া হচ্ছে অবৈধ সংযোগ। তেজকুনীপাড়া এলাকায় রেলওয়ে কলোনিকেন্দ্রিক রয়েছে একাধিক অবৈধ গ্যারেজ। তেজগাঁও মডেল হাইস্কুলের পাশে বাদশার গ্যারেজ, শ্রমিক লীগ নেতা মনির ও শেখ রাসেল স্মৃতি ক্লাবের মাঈনুদ্দিনের গ্যারেজ চালাচ্ছে পানি সুমন। প্রতিটি গ্যারেজে অর্ধশতাধিক ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। এসব রিকশার ব্যাটারি বিদ্যুতের খুঁটি থেকে তারের মাধ্যমে চার্জ দেওয়া হচ্ছে।
১ সেপ্টেম্বর লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, কয়েক শতাধিক গ্যারেজে লক্ষাধিকের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। এসব গ্যারেজে দিনে মিটার থেকে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হলেও রাতের আঁধারে সরাসরি বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে চার্জ দেওয়া হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে বেড়িবাঁধ সেকশন এলাকায় প্রতিটি গ্যারেজে এমন চিত্র দেখা যায়। নবাবগঞ্জ ক্লাববাড়ি মোড়ে নাজির হোসেনের গ্যারেজে এক চালক বলেন, এখানে বেশির ভাগ রিকশায় অবৈধভাবে চার্জ দেওয়া হয়। হাজারীবাগে হালিম ও আলমের গ্যারেজেও একই চিত্র দেখা যায়। তবে এসব গ্যারেজের কেউই কথা বলতে রাজি হয়নি।
বৈধ সংযোগের আড়ালে অবৈধতা : সরকার রাজধানীতে প্রায় ৫ হাজার ২৩৯টি চার্জিং স্টেশন বা মিটারের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ডিপিডিসির আওতায় ২ হাজার ১৪৯টি এবং ডেসকোর আওতায় ৩ হাজার ৯০টি বৈধ চার্জিং স্টেশন থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। বৈদ্যুতিক যান চার্জিংয়ের জন্য প্রতি ইউনিটে ১০ থেকে ১৪ টাকা নেওয়া হয়। তবে বৈধ স্টেশনের তুলনায় অবৈধ পয়েন্ট ৪৮ হাজার ১৩৬টি। ডিএমপির হিসাবে মিরপুর বিভাগে ৭ হাজার ৯৮৩টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট ও ২৫৯টি গ্যারেজ, ওয়ারী বিভাগে ৭ হাজার ৫১৬টি পয়েন্ট ও ১৩৬টি গ্যারেজ, গুলশানে ৩ হাজার ৬৪৩টি পয়েন্ট ও ১২৮টি গ্যারেজ এবং উত্তরা বিভাগে ৭ হাজার ৪৯৩টি পয়েন্ট ও ৭২টি গ্যারেজ, মতিঝিলে ৫ হাজার ৬৮০টি পয়েন্ট ও গ্যারেজ ১২০টি, তেজগাঁওয়ে ৬ হাজার ৭৫২টি পয়েন্ট ও গ্যারেজ ১৬৩টি, লালবাগে ৮ হাজার ৮৬৯টি পয়েন্ট ও গ্যারেজ ৬৫০টি এবং রমনা বিভাগে ১ হাজার ৬২৭টি পয়েন্ট ও গ্যারেজ ৭২টি রয়েছে।
ডেসকোর নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী রশিদুল রহমান যুগান্তরকে বলেন, অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। অবৈধ সংযোগ পাওয়া গেলে জরিমানা ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ডিপিডিসির প্রধান প্রকৌশলী তারেকুল হক জানান, অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। নীতিমালার আওতায় এলে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ হাজার অটোরিকশা আটক করা হয়। কিন্তু ডাম্পিং স্টেশনের স্বল্পতায় নির্দিষ্ট সময় পর সেগুলো ছেড়ে দিতে হয়। ফলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টি মূলত ডিপিডিসি, ডেসকোসহ সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার দায়িত্ব। তাদের সম্পদ চুরি হচ্ছে, অথচ তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। অনেক সময় পুলিশই তাদের (ডিপিডিসি-ডেসকো) সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেয়।

