মালিকানায় আমলা পুলিশ ব্যবসায়ী রাজনীতিক
রাস্তায় জরিমানা ও শাস্তির মুখে পড়েন চালকরা, ধরাছোঁয়ার বাইরে বিনিয়োগকারী * অটোরিকশা বন্ধের অপেক্ষায় প্যাডেলচালিত রিকশার মালিকরা
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পুরো রাজধানীই যেন অটোরিকশার নেটওয়ার্ক। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি-সব জায়গায় চলছে তাদের দাপট। এতে নষ্ট হচ্ছে সড়কের শৃঙ্খলা। পাশাপাশি যানজট ও ভোগান্তির সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনা। আর এ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে অনেকেরই জীবন চলে গেছে। আবার অনেকেই বরণ করছেন পঙ্গুত্ব। অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব রিকশা রাস্তায় নামিয়ে দিচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ সদস্য, রাজনীতিবিদ, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসা-বাড়ির মালিকরা। অল্প পুঁজিতে দ্বিগুণ লাভের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ এসব রিকশা দিনমজুর ও নিুবিত্ত মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছেন তারা। অটোরিকশার গ্যারেজে সরেজমিন অনুসন্ধান এবং গ্যারেজ মালিক, চালক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে প্রধান সড়কে চলাচল করায় চালকদের আইনের আওতায় নিয়ে আসছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। অনেককে করা হচ্ছে আর্থিক জরিমানা। তবে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন অটোরিকশার পৃষ্ঠপোষক ও বিনিয়োগকারীরা। যা নিয়ে ক্ষুব্ধ চালকরা। তারা বলছেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধ করতে চাইলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, গ্যারেজ মালিক, অটোরিকশার বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু ড্রাইভারদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া অমানবিক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, হঠাৎ বিপুল পরিমাণ অটোরিকশার পেছনে বিনিয়োগকৃত অর্থ প্রান্তিক চালকদের নিজের নয়। বিত্তশালী শ্রেণির বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। অতীতে যেভাবে সিএনজি অটোরিকশা চালু হয়েছিল, ঠিক একইভাবে এখন প্রভাবশালীরা একাধিক অটোরিকশা কিনে ভাড়া দিচ্ছেন। অনেকে অবৈধ কারখানা গড়ে তুলছেন। রাস্তায় অটোচালকদের বেপরোয়া হয়ে ওঠার মূল সাহস আসে এসব প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের কাছ থেকে। যা ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। এসব প্রান্তিক ও নিুআয়ের মানুষের কর্মসংস্থান এবং জীবন-জীবিকার প্রতি আমাদের সবার সমর্থন রয়েছে। তবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে গিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা ও সড়ক নিরাপত্তাকে কোনোভাবেই বলি দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সবশেষ গত বুধবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মুগদা, মান্ডা, মানিকনগর, খিলগাঁও, সবুজবাগ, বনশ্রী ও রামপুরা এলাকায় সরেজমিন অনুসন্ধান করেন এ প্রতিবেদক। অনুসন্ধানে দেখা যায়-এসব এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রায় চার হাজার অটোরিকশা গ্যারেজ। তাদের অধীনে চলাচল করছে ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি অটোরিকশা। রাস্তায় নামা এসব অটোরিকশার মালিক বিত্তশালীরা। বিশেষ করে বাসা-বাড়ির মালিক, আমলা, পুলিশ সদস্য, রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন শ্রেণির ব্যবসায়ী। অল্প পুঁজিতে দ্বিগুণ লাভের আশায় এসব রিকশায় বিনিয়োগ করেছেন তারা। রিকশাপ্রতি চালকদের কাছ থেকে দিনে ভাড়া হিসাবে নিচ্ছেন ৫০০ টাকা। সে হিসাবে রিকশাপ্রতি মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকা। যা বছরে ১ লাখ ৮০ হাজার। অথচ একটি নতুন অটোরিকশা তৈরিতে খরচ হয় ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। ফলে ভালো লাভের জন্য দিনমজুর ও নিুবিত্তের মানুষের হাতে এসব রিকশা তুলে দিচ্ছেন তারা।
এসব চালক দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা। বিনা পুঁজিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অটোরিকশা বেছে নিচ্ছেন তারা। যদিও তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। সঠিক প্রশিক্ষণ নেই। গাড়ির কোনো আইনি নিবন্ধন নেই।
তবুও জীবনের ঝুঁকিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলাচল করছেন নগরের ব্যস্ততম ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে।
মানিকনগর এলাকার গ্যারেজের মালিক মেহেদি যুগান্তরকে বলেন, আগে গ্যারেজ মালিকদের হাতে রিকশার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ছিল। বর্তমানে অল্প পুঁজিতে বেশি লাভের জন্য বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অটোরিকশায় বিনিয়োগ করছেন। আরেক মালিক আব্দুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, রিকশার ব্যবসা এখন আর আমাদের হাতে নেই। এই ব্যবসা চলে গেছে উচ্চবিত্ত মানুষের হাতে। অধিকাংশ বাসা মালিকদের এক-দুটি অটোরিকশা রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যদেরও অটোরিকশা রয়েছে।
সরেজমিন গিয়ে গ্যারেজগুলোতে বন্ধ পাওয়া যায় প্যাডেলচালিত রিকশা। খুলে ফেলা হয়েছে অনেকগুলোর যন্ত্রাংশ। কেউ কেউ বিক্রি করে দিয়েছেন কেজি দরে। অনেকে আবার অটোরিকশা বন্ধের আশায় সংরক্ষণ করছেন। জুয়েলের গ্যারেজের ম্যানেজার জুবায়ের যুগান্তরকে বলেন, আমাদের এখানে ২০০টি প্যাডেলচালিত রিকশা ছিল। এখন একটাও চলে না। অটোরিকশা কেনার এত টাকা মালিকের নেই। এখন শুধু গ্যারেজ ভাড়া দিয়ে চলতে হচ্ছে। আাশপাশের মালিকদের কেনা রিকশা আমাদের গ্যারেজে রাখছে।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে মাঝে মধ্যেই অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান চালায় ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। বিশেষ করে প্রধান সড়কে উঠতে না দিতে মামলা দেওয়া, ডাম্পিং করা, সিট জব্দ করা, কেবল লাইন বিচ্ছিন্ন করাসহ নানাভাবে চালকদের শাস্তির আওতায় আনা হয়। অভিযোগ রয়েছে-অভিযানে সব রিকশা আইনের আওতায় আনা হয় না। বিশেষ করে প্রভাবশালীদের রিকশায় জরিমানা করা হয় না। যা নিয়ে ক্ষুব্ধ সাধারণ চালকরা। তাদের দাবি-ট্রাফিক পুলিশ শুধু অসহায় চালকদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসে। জরিমানা করে। কিন্তু অটোরিকশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, গ্যারেজ মালিক ও বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।
মতিঝিল এলাকার অটোরিকশাচালক আমিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, শুধু আমাদের মতো অসহায় চালকদের রিকশার বিরুদ্ধে মামলা হয়। ডাম্পিং করা হয়। জরিমানা দিতে হলে তা চালকদের পকেট থেকে যায়। মালিকরা শুধু দিন শেষে ভাড়ার টাকা বুঝে নেন। রুবেল হোসেন নামের আরেকজন যুগান্তরকে বলেন, যারা সাধারণ মালিক শুধু তাদের রিকশার বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা দেয়। অনেক সময় ১ হাজার থেকে ১২০০ টাকা ঘুস দিলে পুলিশ মামলা দেয় না। সবাই সুবিধা নেয়। দোষ শুধু আমাদের মতো সাধারণ চালকদের।
সবশেষ বৃহস্পতিবার রাজধানীর শাপলা চত্বর, পল্টন, রাজারবাগ ও মালিবাগ এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, প্রধান সড়কে দাপটের সঙ্গে চলছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অনেকে চলছে উলটোপথে। তাদের অবৈধভাবে স্ট্যান্ড করা, প্রধান সড়কে প্রবেশ, অতিরিক্ত গতি, অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, উলটোপথে চলাচল ও ট্রাফিক সিগন্যাল না মানায় ব্যাপক যানজট তৈরি হতে দেখা যায়। যদিও এসব চালকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ‘চাঁদার জোরে’ চলত অবৈধ অটোরিকশা। টোকেনের মাধ্যমে তোলা হতো এসব চাঁদা। দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা, কাউন্সিলর, সংসদ-সদস্যরা সরাসরি জড়িত ছিলেন এসব চাঁদাবাজির সঙ্গে। এসব চাঁদার ভাগ পেতেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। তবে বর্তমানে রিকশা গ্যারেজ পরিচালনায় কাউকে চাঁদা দিতে হয় না বলে দাবি মালিকদের। তাহলে কেন অটোরিকশা বন্ধ হবে না-তা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।

