সংসদে প্রধানমন্ত্রী
নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও ১৫০ কূপ খননের পরিকল্পনা
ভোলার গ্যাসে হবে সার কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র * ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলবে ইলেকট্রিক ট্রেন * প্রকল্পে দেরি ও ব্যয় বাড়লে ব্যক্তিও দায়ী থাকবেন
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বুধবার বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান -পিআইডি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শিল্পে গ্যাস সংকট ঠেকাতে গভীর সমুদ্রে নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং আগামী ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে দেশে ১৫০টি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার জাতীয় সংসদে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা পূরণে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে দ্রুতগতির ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অকারণে মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের মূল নেটওয়ার্কে আনতে অন্তত সাত বছর লাগবে। ভোলার গ্যাস স্থানীয়ভাবে কাজে লাগিয়ে শিল্পকারখানা গড়ে তোলা, একটি সার কারখানা ও ৫০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার।
এদিন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হলে প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠিত হয়। সংরক্ষিত আসনের সংসদ-সদস্য সুলতানা আহমেদ তার প্রশ্নে গ্যাস সরবরাহের বিকল্প উৎস, এলএনজি রিজার্ভ সক্ষমতা, শিল্পাঞ্চলভিত্তিক অগ্রাধিকার সরবরাহ এবং জরুরি জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে কিনা, সে বিষয়ে জানতে চান।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, আকস্মিক বা সাময়িক সংকটকালে শিল্প খাত যাতে গ্যাস সংকটের সম্মুখীন না হয়, সেজন্য সরকার ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে মোট চার হাজার ৫০০ কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক (২ডি) এবং চার হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ত্রিমাত্রিক (৩ডি) সাইসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে, যার দরপত্র দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত। পাশাপাশি স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’ প্রণয়নের কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়েছে।
ভবিষ্যতের গ্যাস ঘাটতি পূরণ ও এলএনজি অবকাঠামো জোরদার করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে বর্তমানে গড়ে দৈনিক প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়। ভবিষ্যতে আকস্মিক সংকট সামাল দিতে মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কুতুবজোম ভাসমান টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং ল্যান্ড-বেইজড টার্মিনাল থেকে ডিসেম্বর ২০৩০ নাগাদ রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূল বিবেচনায় গভীর সমুদ্রে সুবিধাজনক স্থান নির্বাচন করে জরুরি ভিত্তিতে একটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। একই সঙ্গে ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মেইনল্যান্ডে এনে আগ্রহী শিল্পে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলগুলো অগ্রাধিকার পাবে। অন্য এক প্রশ্নে মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ-সদস্য মো. তাজউদ্দীন খান দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বিকল্প উৎসের সমন্বিত পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চান। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের বিশাল চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জ্বালানি খাতের রূপান্তর নিশ্চিত করতে সরকার ইতোমধ্যে ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল মেয়াদে ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণয়ন করেছে।
সুলতানা আহমেদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে আনতে অন্তত সাত বছর লাগবে। এ কারণে ভোলায়ই গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু বেসরকারি উদ্যোক্তা সেখানে শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। ফলে ভোলায় কর্মসংস্থান বাড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতির আকারও বড় হবে বলে আশা করছি।
ঢাকা-চট্টগ্রাম ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ : চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ-সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হকের লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে যাতায়াতের সময় ও দূরত্ব কমিয়ে আনতে ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর বড় ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এই রুটে পরিবেশবান্ধব ও দ্রুতগতির ইলেকট্রিক ট্রেন পরিচালনার লক্ষ্যে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং বিশদ ডিজাইন প্রণয়নের কাজ ইতোমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এখন কেবল প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষা। কাঙ্ক্ষিত অর্থায়ন মিললেই মেগা প্রকল্পটির বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ও চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারণ করে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন শুরু করা হবে।
প্রকল্পে অনিয়ম ও দেরির দায় : কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ-সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা ঠেকাতে বেশকিছু কঠোর ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়া প্রকল্পগুলোর বিলম্ব, অনিয়ম, ব্যয় বৃদ্ধি ও সংশোধনের কারণ পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিলম্বের জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ দূষণ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর : পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার সচিবালয়ে নিজের দপ্তরে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক এক পর্যালোচনা সভায় তিনি এ নির্দেশ দেন। সভা শেষে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেসসচিব শাহরিয়ার পামির জানান, পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের ব্যবহার বৃদ্ধি, বায়ু-পানি-মাটি-শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পরিবেশ দূষণ বন্ধে মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাকে যথাযথ দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা রাখার আহ্বান : পরিবেশ রক্ষা, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের ইতিবাচক পরিবর্তনে ছোট ছোট ভালো কাজ করার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে সানিডেইল স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি সুজাউদ্দৌলা সুজন মাহমুদ এ তথ্য জানান। শিক্ষার্থীদের জাতীয় সংসদের কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং সংসদ অধিবেশন প্রত্যক্ষ করার সুযোগের অংশ হিসাবে সংসদে যান শিক্ষার্থীরা।
