অলিগলি ছাড়িয়ে প্রধান সড়ক, উঠছে উড়ালসড়কেও
ঢাকার বিষফোড়া ই-রিকশা
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রিকশা ঢাকার ঐতিহ্য, বাঙালির গর্ব। কিন্তু সেই রিকশার নতুন সংস্করণ ই-রিকশা (ব্যাটারিচালিত রিকশা) এখন হয়ে উঠেছে নগরের ‘বিষফোড়া’। নিবন্ধন নেই, অনুমোদিত নকশা নেই, অধিকাংশ চালকের প্রশিক্ষণ বা লাইসেন্সও নেই-তবু অলিগলি ছাড়িয়ে প্রধান সড়কে, এমনকি উড়ালসড়কেও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই যান। এতে সড়কে যানজটের পাশাপাশি ঘটছে দুর্ঘটনাও। রাজধানীতে কত ই-রিকশা চলছে, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই সরকারের কোনো সংস্থার কাছেই। তবে সংশ্লিষ্ট মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, বর্তমানে নগরীতে প্রায় ১২ লাখ ই-রিকশা (ইজিবাইকসহ) চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণপরিবহণে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণে বর্তমান সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ও জোরালো ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা’র কোনো বিকল্প নেই; নতুবা হকার উচ্ছেদের মতো এই উদ্যোগও ব্যর্থ হয়ে যাবে। সমস্যা সমাধানে ঢাকাকে আটটি জোনে ভাগ করে রুট নির্ধারণসহ নতুন একটি নীতিমালার কাজ চলছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশন।
দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, ঢাকায় নিবন্ধিত প্যাডেলচালিত রিকশা প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ১ লাখ ৮২ হাজার এবং উত্তরে ৩০-৩১ হাজার। এর বাইরে চলাচলকারী প্রায় সব রিকশাই অনিবন্ধিত। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের ২০১৯ সালের গবেষণায় ঢাকায় রিকশার সংখ্যা ছিল প্রায় ১১ লাখ। বর্তমানে ঢাকায় ই-রিকশার প্রকৃত সংখ্যা কত, তার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে নেই। প্রতিদিন নতুন ই-রিকশা নামছে রাস্তায়। বিভিন্ন সংগঠনের নামে কথিত নম্বরপ্লেট দেওয়া হচ্ছে এবং নিয়মিত চাঁদাবাজিরও অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে বৈধ কর্তৃপক্ষের বাইরে ই-রিকশাকে ঘিরে সমান্তরাল এক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। জানা যায়, গত দেড় দশকে ই-রিকশা নিয়ে নিষেধাজ্ঞা, উচ্ছেদ অভিযান, আদালতের আদেশ ও নতুন নীতিমালার ঘোষণা এলেও কোনো উদ্যোগই স্থায়ী হয়নি। একদিকে স্বল্প দূরত্বে সাশ্রয়ী বাহন হিসাবে মানুষের চাহিদা, অন্যদিকে কয়েক লাখ চালক-মালিকের জীবিকা-এই বাস্তবতা সামনে রেখে সরকার কখনো কঠোর হয়েছে, আবার রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে পিছিয়ে গেছে। ফলে সমস্যাটি এখন শুধু পরিবহণ ব্যবস্থাপনার নয়-এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতা, দুর্বল প্রয়োগ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীনতারও প্রতিচ্ছবি।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, ই-রিকশা আরও আগে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার ছিল। এখনই তা করা উচিত। তবে এজন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে যত উদ্যোগ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক না কেন, তাতে কোনো সুফল মিলবে না। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়ে হকার উচ্ছেদের ঘোষণা দিল। পরে আবার বলল, হকারদের বিকল্প কর্মসংস্থান না করে তাদের উচ্ছেদ নয়। ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এমন দুর্বল উদ্যোগ বরং সমস্যা আরও প্রকট করে তুলবে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহা. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, রিকশা (প্যাডেলচালিত) আমাদের সংস্কৃতির অংশ। এটি আমাদের সংরক্ষণ করতে হবে। আর ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারকে ই-রিকশা বলা হলেও এটাকে আমি ‘রিকশা’ বলতে নারাজ। ওটা ম্যাকানিক্যাল থ্রি-হুইলার যানবাহন। এটার ব্যবস্থাপনা সেভাবেই করতে হবে। এটাকে রিকশা বলে সিম্প্যাথি (সহানুভূতি) নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, হুটহাট কিছু করলে ভালো ফল আসবে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে ফুটপাত হাঁটার উপযোগী করতে হবে এবং বাসে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। তাহলে মানুষ স্বল্প দূরত্বে হেঁটেই চলাচল করবে।
প্যাডেলচালিত রিকশা থেকে যেভাবে ই-রিকশার বিস্তার
দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা সূত্রে জানা যায়, ১৯৩৮ সালে সূত্রাপুরের একজন জমিদার ও ওয়ারীর একজন মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী ছয়টি রিকশা ঢাকায় আনেন। ১৯৪৪ সালে নিবন্ধিত রিকশা ছিল ১০০টি, ১৯৪৮ সালে ৫৭৫টি এবং ১৯৭২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৩ হাজারে। ধীরে ধীরে রিকশা ঢাকার যাতায়াত ও অর্থনীতির অংশ হয়ে ওঠে। ২০১০ সালের পর চীন থেকে আমদানি করা ইজিবাইকের অনুকরণে স্থানীয়ভাবে প্যাডেলচালিত রিকশায় মোটর ও ব্যাটারি সংযোজন শুরু হয়। ২০১১ সালের দিকে ঢাকার সড়কে এ ধরনের যান দৃশ্যমান হয়। প্রথমদিকে এগুলো মূলত প্রান্তিক এলাকা ও অলিগলিতে সীমাবদ্ধ ছিল। মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, ২০১৪ সালে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি।
ই-রিকশার সবচেয়ে বেশি বিস্তার ঘটে ২০২৪ সালে। ওই বছরের ১৫ মে ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর চালকরা বিক্ষোভে নামেন। পরে ১৯ মে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশের কথা উল্লেখ করে ওই সময়ের সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এগুলো চলতে দেওয়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু কোথায়, কতটি এবং কোন মানের রিকশা চলবে, তার কোনো কাঠামো তৈরি হয়নি। জুলাই-আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ট্রাফিক পুলিশের দুর্বল উপস্থিতির সুযোগে ই-রিকশা অলিগলি থেকে প্রধান সড়কে উঠে আসে। এরপর এগুলোর সংখ্যাও দ্রুত বাড়তে থাকে।
আট জোনে ভাগ করার পরিকল্পনা
ই-রিকশার শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সরকার নতুন নীতিমালা করছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, ঢাকাকে আটটি জোনে ভাগ করে ই-রিকশা চালানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রতিটি জোনের রিকশার রং আলাদা থাকবে এবং এক জোনের রিকশা অন্য জোনে যেতে পারবে না। প্রধান সড়কে ই-রিকশা চলবে না; সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে অভ্যন্তরীণ রুট নির্ধারণ করবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটির চারটি অঞ্চলের নির্ধারিত সড়কে শুধু অনুমোদিত রিকশা চলবে। রিকশা ও চালক উভয়ের লাইসেন্স থাকতে হবে। উত্তর সিটির রিকশা দক্ষিণে এবং বাইরের এলাকার রিকশা সিটি এলাকায় প্রবেশ করতে পারবে না। সার্বিক বিষয়ের শৃঙ্খলায় নীতিমালা করছে সরকার। সেই নীতিমালার আলোকে ই-রিকশার নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ঢাকার ই-রিকশার শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সরকার নীতিমালা প্রণয়ন করছে। ওই নীতিমালার আলোকে ই-রিকশায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা হবে। ঢাকার যানজট ও সড়কের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই।

