Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

সামরিক-প্রতিরক্ষা জোটে যোগদান

প্রয়োজন হতে পারে সাংবিধানিক সংস্কারের

বাংলাদেশ কখনো সামরিক প্রতিরক্ষাবিষয়ক আঞ্চলিক জোটে যুক্ত হয়নি * সংবিধানে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের চেষ্টার কথা উল্লেখ আছে * রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া উচিত : এম হুমায়ুন কবির * বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে : মাহফুজুর রহমান

Advertisement

হক ফারুক আহমেদ

হক ফারুক আহমেদ

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রয়োজন হতে পারে সাংবিধানিক সংস্কারের

Advertisement

বাংলাদেশ কখনো আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক কোনো সামরিক প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হলে বা হতে চাইলে নতুন করে সাংবিধানিক সংস্কার ও ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে। সংবিধান অনুসারে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ পরিহার এবং সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের চেষ্টার কথা উল্লেখ আছে। সেদিক থেকে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মতো সামরিক জোটে আগামীতে কখনো যেতে চাইলে সাংবিধানিকভাবে নতুন ব্যাখ্যা প্রয়োজন হতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে যে কোনো সামরিক বা প্রতিরক্ষা জোটে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা সত্যিই তৈরি হলে সংবিধানের সংস্কারও করতে হতে পারে।

পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সই হওয়া মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সদস্য হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলে বাংলাদেশ তা ইতিবাচকভাবে দেখবে বলে ইতোমধ্যে জানিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। কিন্তু বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান জানান, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্প্রসারণের কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, পরবর্তী ধাপে এই চুক্তির পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাজ্জাদ হায়দার খান আরও বলেন, মক্কা চুক্তি প্রাথমিকভাবে একটি প্রতিরক্ষা জোট। এর লক্ষ্য হলো প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তুলে প্রাথমিকভাবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে এই চুক্তির ঘোষণার পর থেকেই বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, মিসর, সিরিয়াসহ ৬-৭টি দেশ এতে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে সরাসরি আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খানের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট হয় যে, বর্তমানে এই জোটের সম্প্রসারণ হচ্ছে না। তবে, ভবিষ্যতের কোনো প্রয়োজনে বাংলাদেশ এ ধরনের জোটে সম্পৃক্ত হতে চাইলে নীতিগত কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, মক্কা চুক্তি বা কোনো সামরিক জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার প্রশ্নে সংবিধানের নীতিগত অবস্থান বিবেচনা করা জরুরি। বাংলাদেশের সংবিধানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ পরিহার এবং সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের প্রচেষ্টার কথা বলা হয়েছে। স্বাধীনতার পর গত ৫৫ বছরে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এলেও বাংলাদেশ মূলত এই নীতিগত অবস্থান অনুসরণ করেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ যদি কোনো সামরিক বা নিরাপত্তা জোটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেটি দেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়ে ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সাংবিধানিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া উচিত।

চলতি বছরের ৭ আগস্ট পবিত্র মক্কা নগরীতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই চুক্তির আওতায় তিন সদস্য দেশের যে কোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসাবে বিবেচনা করা হবে। একই আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান সামরিক ও রাজনৈতিক সমন্বয়ে একটি ব্যবস্থা তৈরি করার পরিকল্পনা করছে।

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি মূলত মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং সদস্য দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতেই গঠিত হয়েছে বলে মনে করে বিভিন্ন দেশ। এর অন্যতম লক্ষ্য সামরিক উৎপাদন বৃদ্ধি, যৌথ সামরিক মহড়া এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করা। এই জোটে যোগ দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে সিরিয়া, আফগানিস্তান ও ইরানের নাম উঠে এসেছে।

গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা জোট হচ্ছে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার একটি ব্যবস্থা এবং এটি মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এই জোটে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়টি সদস্য দেশগুলোর অভিপ্রায়ের ওপর নির্ভর করছে। বাংলাদেশ এটিকে ইতিবাচক হিসাবে দেখছে বলেও জানান তিনি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ২৪ ও ৩০ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই দফায় গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা জানান। তিনি বলেন, মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের কোনো ঝুঁকি নেই। ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে এমন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়টিকে সরকার ইতিবাচকভাবে দেখছে।

অন্যদিকে ১ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সামগ্রিক পরিস্থিতি ও বিষয়গুলো বিবেচনা করে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নেবে বলে গণমাধ্যমকে বেশ কয়েকবার জানান। তবে ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশ তার জন্মলগ্ন থেকে কখনোই কোনো সামরিক বা প্রতিরক্ষাবিষয়ক আঞ্চলিক কোনো জোটে যুক্ত হয়নি।

তাছাড়া বাংলাদেশের সংবিধানের আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সংহতির উন্নয়ন অংশের ২৫ অনুচ্ছেদের (১)-এ স্পষ্ট উল্লেখ আছে-‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা, এসব নীতি হইবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি। একই অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, এই সকল নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ পরিহার এবং সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করিবেন।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ যদি কোনো ধরনের সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সাংবিধানিক নির্দেশনার প্রশ্নটি সামনে আসতে পারে। তিনি বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং বিশ্বশান্তির প্রতি অঙ্গীকার। ফলে যে কোনো ধরনের সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সাংবিধানিক নীতি ও নির্দেশনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সে প্রশ্নের ব্যাখ্যা প্রয়োজন হতে পারে।

তার মতে, বিশ্ব বাস্তবতা পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ধারণা, নিরাপত্তা কৌশল ও পররাষ্ট্রনীতির ধরন এবং অগ্রাধিকার বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে। বাংলাদেশ এখন আগের তুলনায় অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম। একই সঙ্গে ভূরাজনীতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কৌশলগতভাবে ভিন্ন বাস্তবতায় অবস্থান করছে। তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে বর্তমান সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়গুলো নিয়ে জনমানুষের আগ্রহ বাড়ছে। চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, তুরস্কের সঙ্গে ড্রোন শিল্প ও সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক চুক্তির অপ্রকাশ্য ধারা কিংবা বিভিন্ন দেশ ও জোটের সঙ্গে কৌশলগত সংলাপ এ আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে অতীতেও বিভিন্ন ধরনের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা কাঠামো গড়ে ওঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আরব লিগ, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলসহ বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি ‘আরব ন্যাটো’, আর-ফোর বা ইসলামিক সামরিক জোট গঠনের কথা বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে। আবার আব্রাহাম অ্যাকর্ডেও নিরাপত্তা উপাদান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে নতুন উদ্যোগটি শেষ পর্যন্ত কী রূপ নেবে, কতটা সম্প্রসারিত হবে কিংবা কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে তা নিশ্চিত নয়। তাছাড়া এর ধারা ও উপধারা কতটা গভীর, কার্যকর ও অর্থবহ হবে, সদস্য দেশগুলোর দায় ও বন্ধন কতটা দৃঢ় ও বাধ্যতামূলক হবে, যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কীরূপ শর্তাধীন হবে এবং সদস্যদের মধ্যে কতটা ঐকমত্য থাকবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

‘বাংলাদেশ যদি মনে করে, এ ধরনের সহযোগিতার মাধ্যমে সামরিক শিল্পের বিকাশ, প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে, আঞ্চলিক ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতি হতে পারে, তাহলে প্রাথমিক পর্যায়ে পূর্ণ সদস্য না হয়েও জোটের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সীমিত বা শিথিল সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা যেতে পারে’ যোগ করেন তিনি।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম