রূপালী ব্যাংকে ৯৯৩ কোটি টাকা খেলাপি
বেক্সিমকোর সম্পদের ক্রেতা মিলছে না
দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ১৪ সেপ্টেম্বর * কোনো আবেদন জমা পড়েনি
Advertisement
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের বিতর্কিত ব্যবসায়ী গ্রুপ বেক্সিমকো লিমিটেডের বন্ধক রাখা সম্পত্তি নিলামে উঠলেও ক্রেতা মিলছে না। ৯৯৩ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ে ১৪ আগস্ট নিলাম ডাকে সরকারি রূপালী ব্যাংক। এতে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে ২৬ একর জমি ও সম্পত্তি নিলামে ডাকা হয়। সোমবার দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল। কিন্তু কেউ এই সম্পদ কেনায় আগ্রহ দেখাননি। এর আগে জনতা ও সোনালী ব্যাংক নিলাম ডেকেছিল। কিন্তু সেখানেও সাড়া মেলেনি। কোম্পানির মালিক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে এই গ্রুপটির খেলাপি ঋণ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি; যা পুরো পদ্মা সেতুর নির্মাণ ব্যয়ের সমান। ইতোমধ্যে এই গ্রুপের বেশির ভাগ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পথে।
কোম্পানিটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। কিন্তু নিলামের ব্যাপারে স্টক এক্সচেঞ্জ কিংবা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) রূপালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে কিছুই জানানো হয়নি। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেক্সিমকোর সম্পত্তি বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা আটকে যায়। এছাড়াও জিএমজি এয়ারলাইন্সের ঋণের বিপরীতে ২০১৬ সালে সালমান এফ রহমানের বাড়ি নিলাম ডেকেছিল সোনালী ব্যাংক। তবে শেষ পর্যন্ত ক্রেতা মেলেনি।
জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের নিলাম একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। কারণ সাধারণত এমন নিলামে কেউ আসেন না। কিন্তু এর বাইরে ব্যাংকের খুব বেশি কিছু করার নেই।’ তিনি বলেন, ‘বেক্সিমকো গ্রুপ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। এখন পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে ব্যাংক গ্রাহকের সম্পত্তি নিলাম ডেকেছে। এটাই চলমান প্রক্রিয়া। টাকা আদায়ে বেক্সিমকোর সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। তবে এই মুহূর্তে বেক্সিমকোর টাকা পরিশোধের সক্ষমতা নেই।’
এ ব্যাপারে বেক্সিমকো গ্রুপের কোম্পানি সেক্রেটারি আসাদুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও মন্তব্য মেলেনি।
নিলাম বিজ্ঞপ্তি : চলতি বছরের ১৪ আগস্ট বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেয় রূপালী ব্যাংক। এতে কোম্পানির ঠিকানা হিসাবে সালমান এফ রহমানের ১৭নং ধানমন্ডির বাড়ির ঠিকানা উল্লেখ করা হয়। যুগান্তরের অনুসন্ধানের দেখা গেছে-বেক্সিমকো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি। ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কোম্পানিটির মোট ঋণের স্থিতি ৬ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ৩ হাজার ১০৯ কোটি এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ৩ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। আর রূপালী ব্যাংকে ঋণ ৯৯৩ কোটি টাকা। এই টাকার বিপরীতেই নিলাম ডাকা হয়েছে। বেক্সিমকোর দুটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান পদ্মা এবং বেক্সিমকো নিটিংয়ের নামে এই ঋণ নেওয়া হয়। পরে এই দুই কোম্পানি একীভূত হয়ে বেক্সিমকো টেক্সটাইলে (বেক্সটেক্স) রূপ নেয়। এরপর বেক্সটেক্সকে আবার বেক্সিমকো লিমিটেডের সঙ্গে একীভূত করা হয়। রূপালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বেক্সিমকো টেক্সটাইলের কাছে রূপালী ব্যাংকের সর্বশেষ পাওনা ৯৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে অনাদায়ি সুদ অন্তর্ভুক্ত নয়। ব্যাংকের পাওনা, অন্যান্য খরচ এবং আদালতের সুদসহ আদায়ের জন্য তফসিলে বর্ণিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি যে অবস্থায় আছে, সেই অবস্থায় নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তি অনুসারে নারায়ণগঞ্জের তারাব ও যাত্রামুরা মৌজাতেও বেক্সিমকোর বন্ধক রাখা জমি নিলামের তালিকায় রয়েছে। তারাব মৌজার দুটি অংশে মোট ৮ দশমিক ৩৯ একর জমি রয়েছে। এর মধ্যে একটি অংশে ৪ দশমিক ৫২ একর এবং অন্য অংশে ৩ দশমিক ৮৭ একর জমির বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যাত্রামুরা মৌজার আরেক তফসিলে ৯ দশমিক ২ একর জমি রয়েছে। অর্থাৎ শুধু এই তিনটি তফসিলেই নারায়ণগঞ্জে ১৭ দশমিক ৪১ একর জমি রয়েছে। গাজীপুরের ৮ দশমিক ৫৫ একরসহ তফসিলে মোট ২৫ দশমিক ৯৬ একর জমির বিবরণ রয়েছে। এছাড়াও নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে গাজীপুরের জয়দেবপুর, কালিয়াকৈর ও কাপাসিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক তফসিলের জমির বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এসব জমির মধ্যে কোথাও একরের হিসাবে, আবার কোথাও শতাংশের হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। গাজীপুরের একটি তফসিলে ২ দশমিক ১৯ একর, আরেকটিতে ৪৮ শতাংশ এবং অন্য একটি তফসিলে ৩ দশমিক ৬৬ একর জমির কথা উল্লেখ রয়েছে। আরও কয়েকটি তফসিলে দশমিক একর ও শতাংশ হিসাবে জমি রয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে গাজীপুর মৌজা সরাবো এলাকায় ৮ দশমিক ৫৫ একর জমির পৃথক বিবরণও দেওয়া হয়েছে। সেখানে সিএস খতিয়ানের বিভিন্ন দাগে মোট জমির পরিমাণ ৮ দশমিক ৫৫ একর। নিলামে অংশ নেওয়ার সময় সীমা ছিল ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টা পর্যন্ত। ওইদিন দুপুর ২টা ৫ মিনিটে দরপত্র জমা বক্স খোলার পর দেখা যায় কোনো আবেদন জমা পড়েনি।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর বেক্সিমকো টেক্সটাইল বিক্রির উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সময়ে এটি কেনার আগ্রহ দেখায় জাপানভিত্তিক প্রবাসীদের প্রতিষ্ঠান রিভাইভাল গ্রুপ এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রবাসীদের প্রতিষ্ঠান ইকোনোমিল্লি। তখন তারা ২ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল। স্থানীয় মুদ্রায় যা ২৫০ কোটি টাকা। তবে শেষ পর্যন্ত তা আটকে যায়। বেক্সিমকো টেক্সটাইলের নামে জনতা ব্যাংকে ঋণ রয়েছে ৮৬০ কোটি টাকা। এর পুরোটাই খেলাপি। এছাড়াও শুধু জনতা ব্যাংকেই বেক্সিমকো গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠানের ঋণ রয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এছাড়াও জিএমজি এয়ারলাইন্সের নামে নেওয়া ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৬ সালের ১২ জুলাই সালমান এফ রহমানের ধানমন্ডির বাড়ি নিলামে ডাকে সোনালী ব্যাংক। ওই সময়ে কোম্পানির নামে ব্যাংকের পাওনা ছিল ২২৮ কোটি টাকা। তবে নিলামে শেষ পর্যন্ত ক্রেতা পাওয়া যায়নি।
বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক দেশের আর্থিক খাতের অত্যন্ত বিতর্কিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান। ঋণখেলাপি, জমি জালিয়াতি, অর্থ পাচার, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি বললেই তার নাম সবার আগে আসে। তার হাত ধরেই দেশের ঋণখেলাপির সংস্কৃতির বিকাশ হয়। গত বছরের মার্চ পর্যন্ত তার ২৮ প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে ৩ বছরে শেয়ারবাজার থেকে দৃশ্যমান ৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা নিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে বেক্সিমকো সুকুক বন্ড ৩ হাজার কোটি, আইএফআইসি আমার বন্ড ১ হাজার কোটি টাকা এবং বেক্সিমকো জিরো কুপন বন্ড ছেড়ে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা নিয়েছেন। তবে অদৃশ্য ও বেনামি মিলিয়ে ৩ বছরেই ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এদিকে সুকুক বন্ড কেনার জন্য বিভিন্ন ব্যাংককে বাধ্য করা হয়। বেক্সিমকোর শেয়ারে কারসাজির দায়ে গত বছরের ১ অক্টোবর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ৪২৮ কোটি টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে আত্মগোপনে যান সালমান এফ রহমান। তবে কয়েকদিনের মধ্যেই নারায়ণগঞ্জে কোস্ট গার্ডের হাতে গ্রেফতার হন তিনি।

